বাংলাদেশ সীমান্তের নদীনালায় ভারতের বেড়া

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে যেসব জায়গায় নদীনালা বা জলাভূমি থাকার জন্য এতদিন কাঁটাতারের বেড়া বসানো যায়নি, সেখানে সিঙ্গাপুরের আদলে জলের ওপরই বিশেষ ধরনের বেড়া বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে ভারত সরকার।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং সম্প্রতি সংসদে বলেছেন, “এই অসমাপ্ত কাঁটাতারের বেড়ার কাজ সরকার যত শিগগির সম্ভব শেষ করতে চায়– আর তারপরই সিঙ্গাপুরের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে ভারত আলোচনা শুরু করেছে।”

সমুদ্রে এক বিশেষ ধরনের বেড়া দিয়ে সিঙ্গাপুর অবৈধ অভিবাসীদের ঠেকাতে সফল হয়েছে বলে বলা হয়– ভারতে সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, “বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান বন্ধ করতেও তাঁরা অনুরুপ পদ্ধতি প্রয়োগ করতে চান।”

২০০৩ সালে দ্বীপরাষ্ট্র সিঙ্গাপুর তাদের পুলাউ উবিন সমুদ্রসৈকত ঘেঁষে এক লম্বা প্রাচীর বসিয়েছিল, যাতে অবৈধ অভিবাসীদের নৌকা সমুদ্রপথে এসে তাদের তটে ভিড়তে না পারে।

পরে সিঙ্গাপুরের পাসির রিস সৈকতের সমুদ্রে তারা বসায় এক ধরনের ভাসমান ড্রামের দেওয়াল। নান্দনিক দৃষ্টিতে দর্শনীয় না-হলেও অভিবাসীদের ঠেকাতে এই ধরনের বেড়া খুবই কার্যকরী বলে সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষ দাবি করে থাকে।

এখন ভারত সরকারও মনে করছে, বাংলাদেশ সীমান্তের বহু জায়গায় এই ধরনের দেওয়াল বসাতে পারলে তা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সাহায্য করবে।

ভারতীয় সংসদে চলতি বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিনেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং জানিয়েছিলেন, সীমান্তে যেসব জায়গায় কাঁটাতারের বেড়া এখনও বসানো যায়নি, সেখানে সেই কাজ দ্রুত শেষ করাই হবে তাদের লক্ষ্য।

মি. সিং বলেন, ‘ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য ৪,০৯৬.৭ কিলোমিটার, তবে নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি এর মধ্যে ৩,৩২৬ কিলোমিটার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া বসানোর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে ৫০১ কিলোমিটার ছাড়া বাকি পুরো কাজটাই শেষ, আরও ১৩০ কিলোমিটার সীমান্তে বেড়া বসানোর কাজ চলছে দ্রুত গতিতে।’

‘কিন্তু বাকি যে অংশটা, তাতে এত নদীনালা, জলাশয় বা জলাভূমি রয়েছে যে সেখানে বেড়া বসানোর জন্য রীতিমতো সমস্যায় পড়তে হচ্ছে’ সংসদে সরাসরি স্বীকার করেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

আসলে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের প্রকৃতিই এমন যে বহু জায়গায় নদী বা জলাভূমিই দুদেশের সীমানা নির্ধারণ করে দেয়, ফলে সেখানে সাধারণ কাঁটাতারের বেড়া বসানো একরকম অসম্ভব।

তবে বিবিসি জানতে পেরেছে, সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যখন এই বক্তব্য দিচ্ছেন, মোটামুটি সেই সময় থেকেই ভারত সরকার সিঙ্গাপুরের সঙ্গে কথাবার্তা শুরু করেছে, যাতে তাদের বিশেষ ধরনের অভিবাসন-নিরোধী সামুদ্রিক বেড়ার মডেল এই নদীনালার মুলুকেও প্রয়োগ করা যায়।

কয়েক সপ্তাহ আগে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফ-র বার্ষিক অনুষ্ঠানে দেশের উপ-জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা নেহচল সান্ধুও বলেছিলেন, ‘নদীনালার কারণে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ায় যে ফাঁকগুলো তৈরি হচ্ছে, সেটা বোধহয় সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা দিয়েই পূর্ণ করা সম্ভব, যারা সমুদ্রে অভিবাসন-নিরোধী বেড়া বসিয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আসলে আমাদের চাই একটা ইন্টিগ্রেটেড বর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, যার অংশ হিসেবে এই ধরনের বেড়ার পাশাপাশি সীমান্তে সেন্সরও বসাতে হবে। আর সেই সব সেন্সরে কী ধরা পড়ছে সেই তথ্য নিকটতম সীমান্ত চৌকিতে পৌঁছে দিতে হবে।’

সিঙ্গাপুরের আদলে সীমান্তের জলা জায়গায় বেড়া বসানোর কাজ যে বেশ কঠিন ও ব্যয়সাপেক্ষ, তা অবশ্য ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও মানছেন। শুকনো সাধারণ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া বসানোর চেয়ে এই খরচ দ্বিগুণ বা এমন কী তিনগুণও হতে পারে।

কিন্তু তারপরও গোয়েন্দা সূত্রগুলোর দাবি, সীমান্তের নানা ফাঁকফোকর দিয়ে মাদক বা জাল নোটের চালান বা এমন কী জঙ্গী সংগঠনের সদস্যদের যাতায়াত বন্ধ করতে ভারতের কাছে এছাড়া অন্য কোনো রাস্তা নেই!

সূত্র: বিবিসি বাংলা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।