তরুণ তুর্কিরা কেন ‘শ্বরবাদের’ দিকে ঝুঁকছেন?

১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বরে তুরস্কের সামরিক অভ্যুত্থানের অন্যতম একটি লক্ষ্য ছিল বামপন্থী / সমাজতান্ত্রিক দলগুলোর রাশ টেনে ধরা। তুর্কি নাগরিকদের নমনীয় সংস্কৃতিতে আকৃষ্ট করতে জান্তা সরকার দেশজুড়ে অনেক মসজিদ এবং কোরআন শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপন করেন। কমিউনিজম প্রভাবের বিরুদ্ধে দেশকে রক্ষা করতে তারা ইসলামি শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিল।একটি মধ্যপন্থী ইসলামি রাজনৈতিক দল হিসেবে তুরস্কের ক্ষমতাসীন জাস্টিজ এন্ড ডেভেলপমেন্ট পাটি ২০০২ সালে ক্ষমতায় আসে। গত ১৬ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা দলটি তার নিজস্ব ‘ইসলামিক’ কোডের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ধীরে ধীরে সমাজকে একটি ছাঁচে পরিণত করার চেষ্টা করে।

 

ডুজস বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মশাস্ত্রের অধ্যাপক ড. ফাতমা গুনায়েদিন পরিচালিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে যে তুর্কি যুবকরা ক্রমবর্ধমানভাবে ‘শ্বরবাদ’ এর দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যা ঈশ্বরের অস্তিত্ব থাকলেও সৃষ্টির সঙ্গে স্রষ্টার সরাসরি হস্তক্ষেপকে স্বীকার করা হয় না। এই ধরনের বিশ্বাস যা ইসলামি শিক্ষার বিপরীত।গবেষণার ফলাফল ঘোষণা করা হলে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যপ এরদোগান এটাকে ভালভাবে গ্রহণ করেন নি। তিনি এটাকে ‘অগ্রহণযোগ্য!’ বলে মন্তব্য করেন।শ্বরবাদের প্রতি তরুণদের ধাবিত হওয়ার কারণ অনুসন্ধানে নাস্তিকদের সংগঠনের সদস্য সুলেমান করণ ও জেহারা পালা এবং বিলজি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুরত্ বেলজ সঙ্গে কথা বলেন ‘আহভাল’।

 

অধ্যাপক বেলজ মনে করেন, তুরস্কে শ্বরবাদের খুব সামান্য দার্শনিক গভীরতা রয়েছে। অন্যদিক, করণে মতে, তুরস্কের ৫০ শতাংশ জনগোষ্ঠী এটির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে।অ্যাক্টিভিটিস্ট জেহারা পালা নারীদের দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিষয়ে বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ইসলাম ধর্মের মধ্যে নারীর বিশ্বাসকে খাপ খাওয়ানো কঠিন। এসব মানুষ ধর্মগ্রন্থ পড়েন নি, তাদের ধর্ম সম্পর্কে জানেন না এবং যদিও তারা তা উপলব্ধি করে না, তবে তারা প্রকৃতই ‘শ্বরবাদী’।

 

নাস্তিক সংগঠনের মুখপাত্র সুলেমান করণ তুরস্কের শ্বরবাদের উত্থান প্রসঙ্গে বলেন, ‘ধর্মের বিতরণে তুরস্কের মৌলিক বিষয়গুলোর মধ্যে একটি। ১৯৫০ এর দশকে ধর্মীয় শোষণ শুরু হয় এবং ১৯৮০ সালের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। একে পার্টি ক্ষমতায় আসার পর, তারা সম্পূর্ণরূপে রাজনৈতিক টুলসের মধ্যে এই ধর্মের বিতরণ শুরু করে। মধ্যপন্থী ইসলামের পশ্চিমা প্রকল্প আজকে একে পার্টির মধ্যে বিকশিত হয়েছে।

 

নাস্তিক সংগঠনের মুখপাত্র সুলেমান করণ তিনি বলেন, ‘একে পার্টির রাজনৈতিক নেতারা প্রগতিক্রিয়াশীল হওয়ার ফলে সরকারের নীতি-নৈতিকতা নিয়ে জনগণ প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে।’তিনি আরো বলেন, ‘একে পার্টির পশ্চাপসারণই শ্বরবাদ উত্থানের পিছনে একমাত্র কারণ। ধর্মের নামে তারা যা করছে তা অবশ্যই কিছু গোষ্ঠীকে হতাশ করেছে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় তারা ধর্ম থেকে দূরে সরে গেছে। কিন্তু শ্বরবাদের দিকে ধাবিত হওয়ার প্রকৃত উৎস হল সময়ের গতি। বিশ্ব জুড়ে ধর্মীয় র্যাডিকালিজম জনগণের একটি বড় অংশকে খ্রিষ্টান ধর্ম, ইসলাম ধর্ম, হিন্দুধর্ম এবং ইহুদিবাদ থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। এই পদক্ষেপ কিছু উপায়ে পোস্টমডর্নিজমের প্রতিক্রিয়া।’

 

অধ্যাপক বেলজ ধর্মীয় সংস্কার নিয়ে কথা বলেন। তিনি যুক্তি দেন যে ইসলাম স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক এবং এখনো অন্য একেশ্বরবাদী ধর্মের মত সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।তিনি বলেন, ‘অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর যখন তুর্কি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন ধর্মনিরপেক্ষবাদী সরকার আধুনিকীকরণের মন্ত্রকে গ্রহণ করে। তাদের এই মন্ত্র ছিল, ‘বিজ্ঞান সত্যিকারের গাইড’। এটা এই বার্তা দেয় যে, আলেম শ্রেণি এখন আর সমাজের প্রজ্ঞাময় শ্রেণির অংশ নয় এবং তারা জনসাধারণ থেকে দূরে সরে গেছে। নব প্রতিষ্ঠিত প্রজাতন্ত্রের ৯৯ শতাংশ মানুষের ধর্ম ছিল ইসলাম। কিন্তু তাদেরকে এও বলা হয়েছিল যে তারা আর রাজনৈতিকভাবে নিজেদেরকে মুসলমান হিসাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারবে না। এটা অনেক মুসলমানদের আতঙ্কের মত মনে হয়েছে।’

 

তিনি বলেন, ‘লক্ষ লক্ষ মানুষ আরো মানবিক, আরো প্রেমময় ধর্মের খোঁজ করছেন। ধর্ম ক্রমাগতভাবে তাদের জীবনে হস্তক্ষেপ করায় তারা ক্লান্ত। কিছু প্রতিক্রিয়া বিপর্যয়কর। উদাহরণস্বরূপ, কিছু নারী, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিতে চান, তাদের বাবা-মা তাদের মাথায় হিজাব পরার শর্তে তা মেনে নেয়। প্রথমে দেখে হয়ত মনে হতে পারে যে নারীরা পর্দা করতে চায়। কিন্তু একবার আপনি এই নারীদের সঙ্গে কথা বলার পরে, আপনি বুঝতে পারবেন যে তারা কেবল পরিবারের ইচ্ছায় তা পরতে বাধ্য হয়েছেন।’তিনি আরো বলেন, ‘ইসলাম একটি রাজনৈতিক ধর্ম। ইসলাম পশ্চিমা বা পূর্বের ধর্মের মত নয়, এটি সহজাতভাবে রাজনৈতিক এবং ইসলামি গ্রুপগুলির মধ্যে সর্বদা রাজনৈতিক প্রবণতা থাকবে। কিন্তু একবার এই দলগুলো তাদের বস্তুগত শর্তের সঙ্গে নিজেদের বিশ্বাসকে ব্যালেন্স করতে পারলে এই রাজনৈতিক প্রবণতা নরম হতে পারে, এমনকি সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য হয়ে যাবে।’