এই নির্বাচনে তুরস্ক গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করছে: রিসেপ তাইয়্যেব এরদোগান

তুরস্কে নির্বাচন ভোটগ্রহণ চলছে। সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়ে দুপুর পর্যন্ত ৫০ শতাংশের বেশি ভোটগ্রহণ করা হয়েছে দেশটির নির্বাচন কমিশন সূত্র দাবি করেছে। আর মাত্র ঘন্টাখানেক বাকী। এরপরই ভোটগ্রহণ শেষে গণনা শুরু হবে। জানা যাবে এই নির্বাচনে ভোটারদের সিদ্ধান্ত- এরদোগান দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট পদে থাকবেন কিনা। নির্বাচনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কেননা, তুরস্কের নতুন শাসনব্যবস্থায় প্রেসিডেন্ট পদটি খুবই ক্ষমতাধর। আগের মতো এটি আর প্রতিকী কোনো পদ নয়।

 

দুপুরে ইস্তাম্বুলের উসকোদার ভোটকেন্দ্রে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেব এরদোগান, ফার্স্টলেডি এমিনি এরদোগান, তাদের মেয়ে ও জামাতা ভোট দিয়েছেন।

ভোট প্রদানের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি ও ভোট প্রদানের হারের বিষয়ে ভূয়সী প্রশংসা করে এরদোগান বলেন, এই নির্বাচন তুরস্কের গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

ভোটারদের উপস্থিতি ও ভোটগ্রহণের হারই প্রমাণ করেছে তুরস্কে গণতন্ত্র কতটা অগ্রগতি এবং উন্নয়ন হয়েছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে তুরস্ক গণতান্ত্রিক বিপ্লবের একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
শান্তিপূর্ণভাবে ভোটপ্রদান ও ভোট গ্রহণের জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানান এরদোগান।

প্রসঙ্গত এই নির্বাচন এরদোগানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কেননা, বিগত ১৫ বছরের কোনো নির্বাচনেই এরদোগান ও তার দল হারেনি।

তুরস্কে আজ এমন এক নির্বাচন হচ্ছে – যার ফলাফল দেশটির ভবিষ্যতকে নাটকীয়ভাবে বদলে দিতে পারে। দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেব এরদোগান এখনো ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়।

তিনি চেয়েছিলেন, তার রাজনৈতিক বিরোধীরা যখন একটু অপ্রস্তুত অবস্থায় আছে তখনই নির্বাচন দিয়ে সহজে জিতে আসতে। কিন্তু হঠাৎ করেই নির্বাচনী প্রচারণার সময় এমন কতগুলো পরিবর্তনের আভাস দেখা দিয়েছে যা এরদোগানের নিশ্চিত বিজয় নিয়ে একটা সংশয় তৈরি করেছে বলেই বিশ্লেষকরা বলছেন।

নির্বাচনী প্রচারের সময় দেখা গেছে, এরদোগানকে ঠেকাতে তার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো একজোট হয়েছে। মধ্য-বাম জোটের প্রার্থী মুহাররম ইঞ্জের জনসভায় এত বিপুল লোকসমাগম হয়েছে – যা আগে কখনো দেখা যায় নি।

তাই মনে করা হচ্ছে, এরদোগান এই প্রথমবারের মতো এবার বেশ শক্ত নির্বাচনী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

তুরস্কের নির্বাচনে একই দিনে প্রেসিডেন্ট এবং পার্লামেন্ট নির্বাচন হচ্ছে। নিয়ম হলো, যদি কোন প্রেসিডেন্ট প্রার্থীই যদি ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পান তাহলে সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া দু’জনের মধ্যে দ্বিতীয় দফা ভোট গ্রহণ হবে ১৫ দিন পরে।

রিসেপ তাইয়েব এরদোগানের প্রধান সমর্থক হচ্ছেন রক্ষণশীল এবং ধার্মিক অপেক্ষাকৃত বয়স্ক তুর্কিরা। তিনি তুরস্কের এতকাল ধরে চলে আসা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থায় ইসলামী মূল্যবোধকে শক্তিশালী করেছেন এবং তার সময়ে দেশের অর্থনীতি ও অবকাঠামোতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে।

এরদোগানের হাতে ইতিমধ্যেই বিপুল ক্ষমতা এবং এ নির্বাচনে জয়ী হলে তিনি আরো ক্ষমতাধর হবেন। কারণ তিনি সংবিধানে যে সংস্কারের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন – তাতে প্রেসিডেন্ট পদটি আরো ক্ষমতাশালী হবে, প্রধানমন্ত্রী পদ তুলে দেয়া হবে, প্রেসিডেন্ট নিজে ডিক্রি জারি করতে পারবেন, মন্ত্রী ও বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা পাবেন। এই এজেন্ডার ওপরই এরদোগান ভোটারদের সমর্থন চাইছেন।

কিন্তু তার বিপক্ষের মত হলো, এরদোগান একজন একনায়ক হয়ে উঠেছেন, বিচারবিভাগকে হাইজ্যাক করেছেন এবং পশ্চিমের সাথে তুরস্কের সম্পর্ককে ধ্বংস করেছেন। তাই এরদোগানকে ঠেকাতে বিরোধীদলগুলো নতুন করে একজোট হয়েছে এবার।

তারা মনে করছেন, এ নির্বাচনে তাদের হাতে পরিবর্তনের সুযোগ এসেছে।

ইস্তাম্বুল থেকে সাংবাদিক সরোয়ার আলম বলছিলেন, জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে মুহাররম ইঞ্জের জোটের প্রতি সমর্থন ২৯-৩০ শতাংশ। এরদোগানের একে পার্টির সমর্থন ৪৮-৪৯ শতাংশের মতো। তাই নির্বাচনে কি ফল হবে তা নিয়ে বেশ কিছুটা জল্পনা-কল্পনা তৈরি হয়েছে। সব বিরোধী দল যদি এক হয়ে ভোট দেয় তাহলে দ্বিতীয় দফা ভোট হতে পারে।

তিনি বলেন, মনে করা হচ্ছে প্রথম দফা ভোটে যারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে তারাই দ্বিতীয় দফা ভোটে ভালো করবে।
তুরস্কের নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ?

তুরস্কের অবস্থান এমন এক জায়গায় যে এর নেতা কে হচ্ছেন তার বৈশ্বিক গুরুত্ব আছে। কারণ তার একদিকে ইউরোপ, অন্য দিকে ইরাক আর সিরিয়ার সীমান্ত। এর মধ্যে বৃহৎ মুসলিম বিশ্বের এক নেতৃস্থানীয় দেশ তুরস্ক পশ্চিমা বিশ্বেরও এক গুরুত্বপূর্ণ মিত্র, নেটো জোটের সদস্য।

তুরস্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও সদস্য পদপ্রার্থী। তুরস্কের সেনাবাহিনী নেটো জোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাহিনী। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ, কুর্দি সমস্যা, ইরাক-সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই, অভিবাসী সংকট – ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে তুরস্কের ভুমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এ নির্বাচনে জয়ী হলে এরদোগান আরো ক্ষমতাধর হয়ে উঠবেন। আর যদি তা না হয় তাহলে তুরস্ক রাষ্ট্রের গতিপথই বদলে যেতে পারে। এরদোগান এখনো বিপুলভাবে জনপ্রিয়। তাই নির্বাচনের ফল যখন আসতে শুরু করবে, তখন সংশয়বাদীরা ভুল প্রমাণিত হতে পারেন। কিন্তু একটা আভাস স্পষ্ট হচ্ছে যে রাজনীতিবিদ হিসেবে তার সম্মোহনী ক্ষমতা হয়তো কমতে শুরু করেছে।