ইন্টারনেটে এক শিক্ষকের আইএস বিরোধী লড়াই - খবর তরঙ্গ
শিরোনাম :

ইন্টারনেটে এক শিক্ষকের আইএস বিরোধী লড়াই



অনলাইন ডেস্ক, (খবর তরঙ্গ ডটকম)

ইসলামিক স্টেট ২০১৪ সালে যখন ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় মসুল শহর দখল করে নেয় তখন তারা ইন্টারনেটে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে শুরু করে।

এই প্রচারণায় তাদের মূল কথাই ছিল, আইএসের অধীনে জীবন কতোটা সুন্দর সেটা তুলে ধরা। এরকম কিছু ভিডিও তৈরি করে তারা ইন্টারনেটে পোস্ট করে সেগুলো ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। খবর বিবিসি বাংলার

আইএস এতোটাই চরম ও সন্ত্রাসী একটি গ্রুপ যে আল কায়দাও তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে।

এই গোষ্ঠীটির জিহাদি জঙ্গিরা হঠাৎ করেই অত্যন্ত দ্রুত গতিতে তাদের কালো পতাকা উড়িয়ে গাড়ির দীর্ঘ বহর নিয়ে ঢুকে পড়ে মসুল শহরে।

প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অত্যন্ত নিষ্ঠুর এই জঙ্গিদের ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই শহরটি দখল করে নিতে সময় লাগে এক সপ্তাহেরও কম। তার পরেই তারা সেখানে কঠোর সব ধর্মীয় আইন চালু করতে শুরু করে।

স্থানীয় লোকজন, যারা সেখানে বছরের পর বছর ধরে যুদ্ধ বিগ্রহ দেখে আসছিলেন তাদের কাছে এধরনের সন্ত্রাসের অভিজ্ঞতা এর আগে কখনো ছিলো না।

ওমর মোহাম্মদ বলেন, আইএসের মতো খারাপ আর কিছু ছিলো না। প্রত্যেকটা দিন আমরা একটা ভয়ের মধ্যে বেঁচে থাকতাম। একটা পক্ষ নিতে হতো। সিদ্ধান্ত নিতে হতো আপনি তাদের পক্ষে না বিপক্ষে। আমি তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেই।

আইএস যখন শহরটি দখল করে নেয় তখন তিনি মসুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়াতেন।

আইএসের জঙ্গিরা বিশ্ববিদ্যালয়টিকে দখল করে নিয়ে সেখানে তাদের সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে। রসায়ন বিভাগে যেসব ল্যাবরেটরি ছিল সেগুলোকে তারা বোমা তৈরির কারখানায় পরিণত করে।

তাদের মধ্যযুগীয় উগ্র বিশ্বাস ছাড়া আর সব ধরনের শিক্ষার ওপর তারা আরোপ করে নিষেধাজ্ঞা।

এই লোকগুলো শুধু অস্ত্রশস্ত্র নিয়েই এই শহরে আসেনি। সাথে করে তারা কিছু ইতিহাসও নিয়ে এসেছিলো এই শহরের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার জন্য। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করা।

একজন ঐতিহাসিক হিসেবে ওমর মোহাম্মদ তখন মনে করলেন, এই বিকৃত ইতিহাসের বিরুদ্ধে তার রুখে দাঁড়ানো উচিত।

আইএসের শীর্ষ নেতা আবু বকর আল-বাগদাদি জুলাই মাসের চার তারিখে এই মসুল শহরের আল নূরী মসজিদে দাঁড়িয়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে নতুন এক রাষ্ট্র বা খেলাফত প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করেন। তার এই ভাষণ সারা বিশ্বে সম্প্রচার করা হয়েছিল।

ওমর মোহাম্মদ বলছেন, তখন আমি খুব বিরক্ত হই। কে এই লোক যে আমাদের শহরে এসে নিজেকে খলিফা বলে দাবি করলেন! কে তিনি?

আইএস তখন ইন্টারনেটে তাদের সমস্ত উগ্র বিশ্বাসের পক্ষে প্রচারণা চালাতে শুরু করে। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষক ওমর মোহাম্মদ এসব দেখে এর বিরুদ্ধে পাল্টা প্রচারণা শুরু করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

তিনি একটি ওয়েবসাইট চালু করলেন। এর নাম দিলেন মসুল আই বা মসুলের চোখ। শহরের যেসব জায়গা তখনও আইসিসের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়নি, সেসব এলাকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলো সারা বিশ্বকে জানানোই ছিল এই ওয়েবসাইট প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য।

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই তিনি বাইরে চলে যেতেন তথ্য সংগ্রহের জন্যে। মুদি দোকানদার থেকে শুরু করে আইএস জঙ্গি সবার সাথেই কথা বলতেন তিনি। তারপর তিনি ঘরে ফিরে যেতেন। বাইরে নিজের চোখে যা দেখেছেন, নিজের কানে যা শুনেছেন এসব অভিজ্ঞতার কথা তিনি ওই ওয়েবসাইটে লিখতে শুরু করলেন।

হাতে লিখতেন তিনি। তারপর স্ক্যান করে সেগুলোর ডিজিটাল কপি তৈরি করতেন। পোস্ট করতেন অনলাইনে।

একেবারে শুরু থেকেই আমি সিদ্ধান্ত নেই যে আমি শুধু প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরবো। যা দেখেছি, যা শুনেছি একজন ইতিহাসবিদ হিসেবে আমি সেসব তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। একজন ইতিহাসবিদ যেভাবে এসব কাজ করেন আমিও সেভাবে করার চেষ্টা করেছি।

কিন্তু এসব করার পেছনে একটা বড় বিপদ ছিল। সাধারণ লোকজন ও আইসিসের জঙ্গিদের সাথে কথা বলে তিনি যেসব পোস্ট করতেন তাতে জিহাদিরা তাকে একজন গুপ্তচর হিসেবে সন্দেহ করতে পারতো।

তিনি বলেন, আমি ঠিক করেই নিয়েছিলাম যে কখনো প্রশ্ন করবো না। কৌশলটা ছিল এরকম যে আলাপ করার মতো করে কথাবার্তা শুরু করবো। তখন তাকে কিছু জিজ্ঞাসা না করলেও সে অনেক কথা বলে ফেলতো।

তার এই কৌশলের একটি উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, এই খাবারটা তেমন ভালো না। তখন আমরা বলাবলি করতাম ওহ, এই খাবারটা আমরা আগে বিক্রি করতাম। কিন্তু এখন বিক্রি করতে পারি না। কারণ কারো হাতে বেশি অর্থ নেই। স্বাভাবিক একটি দিনের মতোই আমরা কথা বলতাম, এই কথাবার্তা থেকেই তিনি আমাকে অনেক তথ্য দিয়ে দিতেন। কিন্তু তিনি সেটা বুঝতে পারতেন না।

তিনি বলে দিতেন যে আইএসের জঙ্গিরা তার কাছ থেকে কর তুলে নিয়ে গেছে। কোন একজনকে আইএস গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে কারণ তিনি তাদেরকে কর দেননি। এ ধরনের তথ্য।

প্রতিদিনই তিনি লিখতেন। লেখার পর সেগুলো তিনি লুকিয়ে রাখতেন বিভিন্ন জায়গায়। প্রায় রাতেই তিনি এক জায়গা ছেড়ে আরেক জায়গায় চলে যেতেন। এই কাজটা তিনি করতেন মধ্য রাতে। তার আশঙ্কা ছিল আইএস জঙ্গিরা তাকে খুঁজে বের করে তাকে ধরে নিয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, ল্যাপটপের সবকিছুই তিনি মুছে দিতেন। কিন্তু যা কিছু লেখা হতো তার সবই তিনি লিখতেন তার নিজের হাতে।

কিন্তু হাতে লিখতেন কেন?

উত্তরে তিনি বলেন, যাতে লোকজন বুঝতে পারেন যে কোন একজন মানুষ এটা লিখেছে।

এর পর আইএস তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা আরো বিস্তৃত করে। ইরাক থেকে সিরিয়ায়। এসব জায়গায় তারা চালু করে কঠোর সব আইন কানুন। কী ধরনের পোশাক পরা যাবে ও যাবে না এসব উল্লেখ করে ড্রেস কোডও চালু করে তারা। সিগারেট খাওয়া, মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর আরোপ করা হয় নিষেধাজ্ঞা। এজন্যে চাবুক মারা ও হাত কেটে ফেলার মতো শাস্তির বিধানও চালু করে তারা।

প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ করে হত্যা করা হয় বহু মানুষ। এসব বর্বর ও নিষ্ঠুর শাস্তির উদ্দেশ্যই ছিলো অন্যদেরকে ভীত সন্ত্রস্ত করা। এরকম বহু খবর ওমর মোহাম্মদ নিজেও মসুল আই ওয়েবসাইটে তুলে ধরেছেন। সেগুলোর বিষয়ে এতো বছর পরেও তিনি কথা বলতে স্বস্তি বোধ করেন না।

তিনি বলেন, প্রকাশ্যে এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে উদ্দেশ্য ছিলো একটাই- ভীতি ছড়ানো। এবিষয়ে আইসিসের দক্ষতা শিল্পের পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। আমি দুঃখিত যে আমাকে শিল্প শব্দটি ব্যবহার করতে হচ্ছে। কিভাবে একজনকে হত্যা করতে হবে তার ওপর তারা খুব জোর দিতো। যেন তারা হলিউডের একটি সিনেমার জন্যে শুটিং করছে। হরর মুভি।

ওমর মোহাম্মদ জানান, সমকামীদের তারা উঁচু ভবন থেকে নিচে ছুঁড়ে ফেলে দিত। নারীদের লক্ষ্য করে পাথর ছুঁড়ে মেরে তাদেরকে শাস্তি দিতো। শিশুদেরকে তারা বেত্রাঘাত করতো, হাত কেটে ফেলতো, বৃদ্ধ লোকেরা নামাজ পড়ার জন্যে মসজিদে যেতে পারতো না বলে তাদেরকে চাবকানো হতো। শিরশ্ছেদ করতো। এমনকি একজন ভাইকে দিয়ে আরেকজন ভাইকে গুলি করিয়ে হত্যা করতো। এসব তো কল্পনারও বাইরে ছিলো।

কিন্তু হত্যা করার সময় তারা হাসতো, তারা খুশি ছিলো, এসব তারা উপভোগ করতো, লোকজনকে সন্ত্রস্ত করে তারা আনন্দ উপভোগ করতো।

মসুল আই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এসব খবর পৌঁছে যেতে বাকি বিশ্বের কাছে- কতো জনকে হত্যা করা হয়েছে, আইএসের কৌশল, খাদ্য সঙ্কট – এসব খবরাখবর দিয়ে ওমর মোহাম্মদ তার নিজের জীবনেরই ঝুঁকি নিয়েছিলেন। কারণ আইএসের একেবারে নাকের ডগাতেই এসব করে যাচ্ছিলেন তিনি।

একটা সামান্য ভুল থেকেই ওমর মোহাম্মদের মৃত্যু হতে পারতো। সেকারণে কেউ জানতো না যে, মসুল আই এর পেছনে ছিলেন তিনি। তিনিই চালাতেন এই ওয়েবসাইট। এমনকি তার মা-ও এটা জানতেন না।

একবার আমি আমার রুমে ছিলাম। তাদের ও আমার মাঝখানে ছিলো শুধু পাতলা একটি দেয়াল। আমি যখন ওয়েবসাইটে তাদের বিরুদ্ধে যায় এরকম খবরাখবর দিচ্ছিলাম তখন পাশের ঘরেই ছিলো আইএসের একজন সিনিয়র যোদ্ধা। পাশের বাড়িতেও ছিল আইসিস যোদ্ধারা। সামনের বাড়িটাও ছিলো আইসিসের একটি গুদাম ঘর। রাস্তার পেছনেও আইসিসের আরো একটা গুদাম ঘর ছিল। রাস্তায় ছিল বিমানবিধ্বংসী অস্ত্র। আর এসবের মাঝখানে ছিলাম আমি। আর আমি কিনা আইসিসের বিরুদ্ধে রিপোর্ট লিখে যাচ্ছি!

ওমর মোহাম্মদ মনে করেন, তাদের এতো কাছে থেকে এসব করা হচ্ছিল বলেই তিনি বেঁচে গেছেন। কারণ আইসিসের যোদ্ধারা চিন্তাও করতে পারেনি যে তাদের এতো কাছে থেকে কেউ এরকম কিছু করার সাহস পাবে।

মসুল আই ব্লগে যা কিছু প্রকাশিত হতো তার ওপর দৃষ্টি পড়তো আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের। তারপর সেসব মিডিয়াতেও এসব খবর প্রকাশিত হতো। এভাবেই মসুলে আইসিসের বর্বরতার চিত্র সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তো।

মসুল আই সম্পর্কে একসময় জেনে যায় আইসিসও। তার পরই তারা ওই ওয়েবসাইটে হত্যার হুমকি দিয়ে বার্তা পাঠাতে শুরু করে।

কিন্তু ওমর মোহাম্মদ মনে করেন, সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে মসুল শহরের লোকজন মসুল আই সম্পর্কে জানতো। ফলে তারা বিশ্বাস করতো যে শহরের ভেতর থেকেই আইসিসের বিরুদ্ধে একটা প্রতিরোধ গড়ে উঠছে।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই লড়াই ছিলো ইতিহাসের একজন শিক্ষকের একার লড়াই।

এটা ছিলো খুবই হতাশার। কারণ আমি কাউকে বলতে পারছিলাম না। আমার আশেপাশে যারা আছে তাদেরকেও না। এমন যদি একজন থাকতো যার সাথে আমি কথা বলতে পারতাম! অন্তত একজনকে যদি আমার অনুভূতির কথা বলতে পারতাম। যদি বলতে পারতাম আমি ক্লান্ত।

কারো সাথে যদি আলাপ করতে পারতাম যে এসব কাজ কেমন করে আরো একটু ভালোভাবে করা যায়, আমি কোন ভুল করছি না সেটা জিজ্ঞেস করারও কেউ ছিলো না। কিন্তু আমি তো একাই সবকিছু করছিলাম।

তিনি বলেন, আইসিসকে প্রতিরোধের যে সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছিলেন সেটা খুব একটা সহজ ছিলো না।

আমি তো ঘরেই বসে থাকতে পারতাম। বসে বসে অপেক্ষা করতে পারতাম যে কেউ একজন এই শহরকে মুক্ত করবে। কিন্তু আমি মনে করেছি এই কাজটা করা আমারই দায়িত্ব। আর এজন্যে আমার হাতে ছিল শুধু কাগজ আর কলম।

পরে মসুল শহর ছেড়ে অন্যত্র চলে যান ওমর মোহাম্মদ। মসুল আই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে মসুল লাইব্রেরির জন্যে বই সংগ্রহ করা হয়।

আইএস এই পাঠাগারটি ধ্বংস করে ফেলেছিল।