ভারতের করিমগঞ্জের নাম বদলে শ্রীভূমি করতে চায় বিজেপি - খবর তরঙ্গ
শিরোনাম :

ভারতের করিমগঞ্জের নাম বদলে শ্রীভূমি করতে চায় বিজেপি



অনলাইন ডেস্ক, (খবর তরঙ্গ ডটকম)

আসামের বরাক উপত্যকার অন্তর্গত করিমগঞ্জের নাম বদল করে শ্রীভূমি রাখার দাবি নিয়ে সেখানে দানা বাঁধছে নতুন বিতর্ক।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একশো বছর আগে সিলেট সফরের সময়ে করিমগঞ্জেও গিয়েছিলেন। সেই ঘটনার শতবার্ষিকী উৎযাপনের সময়ে দাবি উঠেছে, তিনি সিলেটকে শ্রীভূমি বলে বর্ণনা করেছিলেন, তাই করিমগঞ্জের নতুন নাম হোক শ্রীভূমি। খবর বিবিসি বাংলার

দাবিটা যেহেতু জোরালোভাবে জানিয়েছেন ভারতীয় জনতা পার্টির একজন বিধায়ক তাই বিশ্লেষকদের অনেকেই এতে রাজনীতি দেখছেন।

তারা বলছেন যেভাবে নানা শহরের ইসলামিক নাম যেভাবে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে বদলানো হয়েছে, সেই একই ভাবনা এখানেও কাজ করছে।

১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পা রেখেছিলেন করিমগঞ্জ শহরে। সেখানে একটি সভা করে তারপরে গিয়েছিলেন সিলেটে।

গবেষকরা মনে করেন শ্রীহট্ট বা সিলেট সফরকালেই কাউকে সম্ভবত অটোগ্রাফ দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ওই অঞ্চলকে বর্ণনা করে লিখেছিলেন, মমতাবিহীন কালস্রোতে, বাঙলার রাষ্ট্রসীমা হোতে, নির্বাসিতা তুমি, সুন্দরী শ্রীভূমি।

অবিভক্ত সিলেট জেলার মধ্যে শুধু করিমগঞ্জই দেশভাগের পরে ভারতে যুক্ত হয় — তাই করিমগঞ্জের নাম পাল্টিয়ে রবীন্দ্রনাথের বর্ণনা অনুযায়ী শ্রীভূমি করার দাবি উঠেছে।

মঙ্গলবার একটি সভায় ওই দাবিকে জোরালোভাবে তুলে ধরেন হোজাইয়ের বিজেপি বিধায়ক শিলাদিত্য দেব।

তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম কেন নাম বদলের দাবি তিনি তুললেন।

বিজেপি বিধায়ক শিলাদিত্য দেব বলেন, বরাক উপত্যকার বেশিরভাগ মানুষই সিলেটি। তাই সিলেটের সঙ্গে তাদের একটা আবেগ জড়িয়ে আছে। কিন্তু যখন পুরো সিলেট আর ভারতের থাকল না, শুধু করিমগঞ্জ অঞ্চলটা এদেশে এল, তখন থেকেই বরাকের মানুষের একটা সেন্টিমেন্ট জড়িয়ে রয়েছে সিলেটকে নিয়ে।

তিনি আরো বলেন, আমি ওই অনুষ্ঠানে যখন করিমগঞ্জে গিয়েছিলাম, অনেকেই আমাকে জানিয়েছিলেন যে রবীন্দ্রনাথের করিমগঞ্জ পদার্পনের শতবার্ষিকীতে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানোর সব থেকে ভাল উপায় হবে যদি তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী করিমগঞ্জের নাম যদি শ্রীভূমি রাখা যায়। সেজন্যই তাদের দাবিটিকে আমি পূর্ণ সমর্থন জানানোর কথা বলেছি।

এই দাবি নিয়ে খুব তাড়াতাড়ি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে দরবার করবেন বলেও তিনি জানান।

করিমগঞ্জে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পদার্পণের শতবার্ষিকী উদযাপন কমিটির যে সভা থেকে তিনি এই দাবি তুলেছিলেন, সেখানে হাজির ছিলেন আরেক বিজেপি নেতা মিশনরঞ্জন দাস।

তিনিও বলেন, যে দাবিটির সঙ্গে তিনি সহমত এবং তারাও এই দাবী জানাবেন সরকারের কাছে।

তবে বিশ্লেষকদের একাংশ আর বরাক উপত্যকার সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলি বলছে করিমগঞ্জের নাম বদলের প্রসঙ্গটি রাজনৈতিক দাবি।

বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের সাধারণ সম্পাদক গৌতম দত্ত বলেন, আসামের বাঙালীরা এখন একটা মহাসঙ্কটের মুখোমুখি। এন আর সির মাধ্যমে ১৯ লক্ষ মানুষ, যাদের মধ্যে সিংহভাগ বাঙালী, তারা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। এই সময়ে একটা প্রান্তিক শহরের নাম বদলের প্রস্তাব দেওয়াটা একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। আসল সমস্যা থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতেই করিমগঞ্জের নাম বদলের প্রস্তাব তোলা হয়েছে। আমরা সংগঠনগতভাবে এর বিরোধিতা করছি।

তিনি বলেন, ডিটেনশান ক্যাম্পগুলোতে কয়েকশো হিন্দু বাঙালী বন্দী রয়েছেন, যারা মারা যাচ্ছেন বন্দীশিবিরে, তাদেরও অনেকে হিন্দু বাঙালী। শিলাদিত্য দেবদের দল বা তিনি নিজে কী করছেন সেই বিষয়ে তারা তো হিন্দুদের কথা বলেন সবসময়ে?

বিশ্লেষক ও দৈনিক যুগশঙ্খ পত্রিকার সম্পাদক অরিজিৎ আদিত্য মনে করছেন যে এর আগেও যেভাবে নানা শহরের ইসলামিক নাম বদল করেছে বিজেপি, এটাও সেরকমই একটা প্রচেষ্টা।

শিলাদিত্যবাবুদের মনে রাখা উচিত যে এই নাম পাল্টানোর যে রাজনীতি তার দল শুরু করেছেন, তার সঙ্গে স্থানীয় আবেগ জড়িয়ে থাকে। এই ক্ষেত্রে কিন্তু আমাদের কারও কাছে কোনও ইঙ্গিত নেই যে করিমগঞ্জের নাম বদলের প্রস্তাব স্থানীয় মানুষদের মধ্যে থেকে এসেছে। তাহলে কেন নাম বদল? একটাই কারণ – করিমগঞ্জ নামটার মধ্যে করিম শব্দটা আছে আর তার সঙ্গে ইসলামের যোগসূত্র। ২০২১ এর নির্বাচনের আগে তারা একটা হাওয়া তৈরি করতে চাইছেন বলে মনে হচ্ছে।

করিমগঞ্জের নাম বদলের দাবীকে সমালোচনা করেছে কংগ্রেস দলও। কিন্তু নাম বদল নিয়ে তিনি রাজনীতি করছেন বলে যে সমালোচনা হচ্ছে শিলাদিত্য দেবের, সেই বিষয়ে তিনি বলেন, এটা নিয়ে যে রাজনীতি দেখছেন, তারা দেখতে পারেন। কিন্তু আমি কোনও রাজনীতি করি নি। আমি একটা দলের বিধায়ক ঠিকই, কিন্তু আমার বাবারও সিলেটে জন্ম। তাই আবেগ আমারও আছে। আর রবীন্দ্রনাথের দেওয়া বর্ণনা অনুযায়ী একটা সুন্দর জেলার সুন্দর নাম হবে – এটাই চেয়েছি।

হোজাইয়ের এই বিজেপি বিধায়কের ভাষণ বা বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। আসামে এন আর সি প্রক্রিয়া চলাকালীন কথিত বাংলাদেশী অবৈধ মুসলমানদের নিয়ে তার মন্তব্যকে ঘিরে বারে বারেই বিতর্ক হয়েছে।

তার ফেসবুকে পেইজ থেকে করা নানা পোস্ট থেকে যে কটূক্তি আর ঘৃণামূলক বক্তব্য ছড়ানো হয়েছিল, তা অতি সম্প্রতি একটি প্রতিবেদনে জানিয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম অনলাইন অ্যাক্টিভিজমের ওয়েবসাইট আওয়াজ।


এ সম্পর্কিত আরো খবর