উত্তরের ট্রেনসূচি বিপর্যয়, ৬৭ হাজার যাত্রীর ভোগান্তি

রাজধানী ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন গন্তব্যের মধ্যে চলাচলকারী ট্রেনের সময়সূচি গতকাল বৃহস্পতিবার পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। গত ২৪ ঘণ্টায় এ পথের প্রায় ১২ জোড়া ট্রেন তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা করে দেরিতে ছেড়ে গেছে। ঢাকার কমলাপুর প্লাটফর্ম থেকে শুরু করে এ পথের সংযুক্ত সবগুলো স্টেশনে ৬৭ হাজারের বেশি যাত্রীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে।
গত বুধবার বিকেলে রাজশাহী থেকে ঢাকামুখী পদ্মা এক্সপ্রেস চারঘাট উপজেলার সারদা স্টেশনের কাছে লাইনচ্যুত হয়। ফলে খুলনা ও চিলাহাটি থেকে রাজশাহীমুখী এবং রাজশাহী থেকে চলাচলকারী সব রুটের ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ২১ ঘণ্টা পর গতকাল দুপুর একটায় লাইনচ্যুত বগিগুলো উদ্ধার করে যোগাযোগ পুনঃ স্থাপন করা হলেও এরই মধ্যে রেলের সময়সূচি একেবারে ভেঙে পড়ে। কোনো ট্রেনের কোনো নির্ধারিত সময়সূচি আর না থাকায় যাত্রীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, ঈদ উপলক্ষে প্রতিটি ট্রেনে কমপক্ষে দুই হাজার যাত্রী ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরছে। ফিরতি ট্রেনে ঢাকায় আসছে গড়ে ৮০০ যাত্রী। এই হিসাবে ১২ জোড়া ট্রেনে গতকাল ৬৭ হাজারের বেশি যাত্রী যাতায়াত করেছে। আজও প্রায় একই সংখ্যক যাত্রী এই পথে ট্রেনে যাতায়াত করবে।
বিভাগীয় রেল ব্যবস্থাপক (ঢাকা) সরদার সাহাদাত আলী বলেন, আজ শুক্রবার উত্তরের ট্রেনগুলোর দেরি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে। সময়সূচি পুরো ঠিক হতে শনিবার দিনও লেগে যেতে পারে।
তবে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-নোয়াখালীসহ রাজধানীর আশপাশের রুটগুলোতে বড় ধরনের কোনো সমস্যা হয়নি। কয়েকটি ট্রেনে সর্বোচ্চ আধা ঘণ্টা পর্যন্ত দেরি হয়েছে। ইঞ্জিন পরিচর্যা ও যাত্রী ওঠা-নামার কারণে এটা হয়েছে বলে দাবি করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
গতকাল দিনের বিভিন্ন সময় কমলাপুর স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, প্লাটফর্মজুড়ে যাত্রীরা দাঁড়িয়ে-বসে অপেক্ষা করছেন। যাঁদের ট্রেন বেশি দেরি হচ্ছে এমন একাধিক পরিবারের সদস্যদের প্লাটফর্মে চাদর বিছিয়ে শুয়ে-বসে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। তরুণ যাত্রীদের কোনো কোনো জটলায় লুডু খেলে সময় পার করার দৃশ্যও চোখে পড়ে।
অনেক ট্রেনের যাত্রী একসঙ্গে আটকে পড়ায় স্টেশনের টয়লেটসহ সব ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়। তবে বিশেষ এই পরিস্থিতি সামাল দিতে বাড়তি কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। এতে নারী ও শিশু যাত্রীরা বেশি কষ্ট পেয়েছে।
কমলাপুর প্লাটফর্ম স্টেশন মাস্টার মো. জামিল প্রথম আলোকে বলেন, সারদার দুর্ঘটনার কারণে ঢাকা-রাজশাহী, ঢাকা-খুলনা ও ঢাকা-দিনাজপুর লাইনের সব কটি ট্রেন তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা দেরি হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-নোয়াখালী, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ লাইনের ট্রেনগুলো দেরি হয়েছে আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা করে।
গতকাল সকাল আটটায় কমলাপুর স্টেশনে রাজশাহীগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেসের জন্য অপেক্ষায় থাকা সুমন খন্দকার ক্ষোভের সঙ্গে প্রথম আলোকে বলেন, ‘সকাল ছয়টায় ট্রেন ছাড়ার কথা। কিন্তু স্টেশনের কেউ কিছু বলতে পারছে না। ম্যানেজার বা মাস্টার বলছেন, ট্রেন তিন ঘণ্টা দেরিতে নয়টায় আসবে। আরেকবার বলছেন ১১টায় ট্রেন আসবে। দুই- আড়াই ঘণ্টা ধরে বৃদ্ধ মা-বাবাকে নিয়ে চাদর বিছিয়ে বসে আছি। প্লাটফর্মে বসার জায়গাটুকুও নেই।’
ভোর ছয়টার ধূমকেতু কমলাপুর ছেড়েছে সোয়া চার ঘণ্টা দেরিতে—১০টা ২৫ মিনিটে। নির্ধারিত সময়ের আধা ঘণ্টা পর ছেড়েছে দেওয়ানগঞ্জ স্পেশাল, খুলনা স্পেশাল ও সুন্দরবন এক্সপ্রেস। সাড়ে নয়টার অগ্নিবীণা ছেড়েছে সোয়া ১১টায়। সাড়ে নয়টার রংপুর এক্সপ্রেস ছেড়েছে বেলা একটায়। নয়টা ৫০ মিনিটের একতা এক্সপ্রেস ছেড়েছে প্রায় আড়াই ঘণ্টা দেরিতে। ১০টার তিতাস কমিউটার ট্রেন ছেড়েছে ৪০ মিনিট দেরিতে। এক ঘণ্টা দেরি কমলাপুর ছেড়েছে বলাকা এক্সপ্রেস, চট্টলা মেইল, জয়ন্তিকা, ঈশা খাঁ ও মহুয়া এক্সপ্রেস।
তবে ঠিক সময়ে বিকেল তিনটা ২০ মিনিটে কমলাপুর ছেড়েছে চট্টগ্রামগামী সুবর্ণ এক্সপ্রেস। স্টেশন ম্যানেজার নৃপেন্দ্র সাহা বলেন, চট্টগ্রামের লাইনে এখন কোনো সমস্যা হচ্ছে না। শুধু যাত্রী ওঠা-নামার জন্য গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে আধা ঘণ্টার মতো দেরি হচ্ছে।
স্টেশনের অপরিচ্ছন্ন বসার জায়গা, শৌচাগার ইত্যাদি প্রসঙ্গে নৃপেন্দ্র সাহা বলেন, ঈদের সময় যাত্রীর চাপ অনেক বেশি থাকে। সে অনুযায়ী এগুলো দেখার লোকবল নেই। তার পরও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
রাজশাহীগামী সিল্কসিটির যাত্রী আশিষ চৌধুরী ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘এমনিতেই টিকিট পাওয়া ছিল লটারি জেতার মতো ঘটনা। এখন টিকিট হাতে বসে আছি, ট্রেন পাওয়া এখন লটারির মতো হয়ে গেছে।’ তাঁর প্রশ্ন, রেলে দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে, কিন্তু সরকার বিকল্প লাইন কেন রাখছে না?
লালমনি এক্সপ্রেস বেলা সাড়ে ১১টায় কমলাপুরে আসার কথা থাকলেও পৌঁছেছে বিকেল সাড়ে তিনটায়। সকাল সাড়ে আটটার দিনাজপুরের দ্রুতযান এক্সপ্রেস কমলাপুরে পৌঁছেছে বিকেল তিনটা ২০ মিনিটে। বেলা একটার সিল্কসিটি কমলাপুরে পৌঁছেছে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায়। নির্ধারিত সময় সাড়ে পাঁচটা থাকলেও খুলনার চিত্রা কমলাপুরে পৌঁছেছে সন্ধ্যা পৌনে সাতটায়। কিশোরগঞ্জের বিকেল পাঁচটার এগারসিন্ধুর পৌঁছেছে সন্ধ্যা ছয়টা ১০ মিনিটে। সন্ধ্যা সাতটায় পৌঁছেছে বিকেল পাঁচটার তিতাস এক্সপ্রেস। ঈদের স্পেশাল ট্রেন পার্বতীপুর স্পেশালও দেরি করেছে প্রায় দেড় ঘণ্টা।
ফিরে আসা ট্রেনগুলোকে ফিরতি পথে পাঠানোর জন্য ইঞ্জিন ঠিক করতে অতিরিক্ত ৩০-৪০ মিনিট খরচ হচ্ছে বলে জানান ট্রেন চালক মোশাররফ। তিনি বলেন, এমনিতেই বহু বছরের পুরোনো ইঞ্জিন। তার ওপর প্রায় প্রতিটি লাইনে সমস্যা থাকায় গতিও উঠানো যায় না। ফলে আসা-যাওয়ার পথে দেরি হচ্ছে।
স্বাভাবিক সময়ে বিভিন্ন গন্তব্যে দিনে গড়ে সাড়ে ১৫ হাজার যাত্রী বহন করে রেলওয়ে। ঈদের সময় এ সংখ্যা প্রায় আড়াই গুণ বাড়ে। স্টেশন মাস্টার মো. জামিল জানান, টিকিট কাটা যাত্রীর বাইরে টিকিটবিহীন যাত্রীদের সংখ্যাও কম নয়। ছাদে বা ইঞ্জিনে চড়ে ভ্রমণ করা বিপজ্জনক বলে মাইকিং করাও হচ্ছে। কিন্তু যাত্রীরা তো শুনছেন না।
কর্তৃপক্ষ জানায়, কমলাপুর স্টেশন থেকে ঈদ উপলক্ষে পাঁচ দিনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি করেছে মোট ১২ হাজার ৯৪৯টি। তবে পার্বতীপুর স্পেশাল, দেওয়ানগঞ্জ স্পেশাল ও খুলনা স্পেশালের আসন অগ্রিম টিকিটের হিসাবে ধরা হয়নি। যাত্রীর চাহিদা বুঝে কাউন্টারে দিনের টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে বলে জানান স্টেশন ম্যানেজার নৃপেন্দ্র সাহা।
গতকাল সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত বিভিন্ন গন্তব্যের প্রায় আড়াই শ যাত্রীকে টিকিট না থাকার জন্য প্লাটফর্ম থেকে ধরে বের করে দেওয়া হয়েছে বলে জানান কর্তব্যরত নিরাপত্তাকর্মী মো. সানোয়ার।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।