আরও এক মাস সময় মিলল

পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুই সহ-অর্থায়নকারী এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাপান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (জাইকা) ঋণচুক্তির মেয়াদ আরও এক মাস বাড়ছে। ফলে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ পেতে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় পাচ্ছে সরকার।
সংস্থা দুটিকে গতকাল বৃহস্পতিবার ঋণের কার্যকারিতার মেয়াদ বাড়ানোর অনুরোধ করে চিঠি পাঠিয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। এডিবির একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, গতকাল রাতেই এই চিঠির একটি ইতিবাচক জবাব পাঠিয়েছে এডিবি। এক মাস মেয়াদ বাড়িয়ে দিয়ে সংস্থাটি গতকালই ইআরডিতে চিঠি পাঠিয়েছে।
জাইকা মৌখিক আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত কিছু জানায়নি। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত অবশ্য সচিবালয়ে গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘জাইকার মনোভাব কালই (শুক্রবার) জানা যাবে।’
ইআরডি সূত্র জানায়, সরকারকে মেয়াদ বাড়ানোর কথা জানিয়ে যেকোনো দিন চিঠি পাঠাবে জাইকা। যদিও জাইকার সঙ্গে চুক্তির ধরনটিই এ রকম যে, মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে সংস্থাটি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে এডিবি ও জাইকার অর্থায়নের আশা জিইয়ে রইল। তবে ইআরডি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, মূলত বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতায় আসার চেষ্টা অব্যাহত রাখতেই সংস্থা দুটিকে মেয়াদ বাড়ানোর অনুরোধ করেছে সরকার।
বিশ্বব্যাংককে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো চিঠি না পাঠালেও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংক স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে সব শর্ত পূরণ হলেই কেবল ঋণ দেওয়া হবে। এর আগে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি শর্ত আপাতত পূরণ না করে তদন্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার অনুরোধ করা হয়েছিল। তবে বিশ্বব্যাংক তাতে সম্মতি দেয়নি। তারা বলে দিয়েছে, তদন্ত চলা পর্যন্ত সময়ে চিহ্নিত ব্যক্তিরা দায়িত্বে থাকতে পারবেন না—এই রীতিই বিশ্বব্যাংক মেনে চলে। এ ক্ষেত্রেও ব্যত্যয় হবে না।
বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে অর্থায়নের জন্য চারটি শর্ত দিয়েছিল। সব শর্ত মানা হলেও বাকি রয়েছে কেবল প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা মসিউর রহমানকে ছুটিতে পাঠানো। এ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে এখনো পদ্মা সেতুতে দাতাদের ঋণ সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে গেল। তবে অনিশ্চয়তা কাটাতে এক মাস সময় পেল বাংলাদেশ।
এদিকে, ‘পদ্মা সেতু হবেই হবে’ বলে গতকাল দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি বলেছেন, পদ্মা সেতুর অর্থায়নের বিষয়টি সাময়িক অস্থিরতার ব্যাপার। এর সুরাহার জন্য প্রতিশ্রুত অর্থায়নকারীদের সঙ্গে দর-কষাকষি চলছে। সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেছেন।
এর আগে গতকাল সকালে এডিবির দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের মহাপরিচালক হুয়ান মিরান্ডার সঙ্গেও বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী। মিরান্ডা দুই দিনের জন্য বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। বৈঠকের পর হুয়ান মিরান্ডা পদ্মা সেতু নির্মিত হবে বলে নিজের আত্মবিশ্বাসের কথা সাংবাদিকদের জানান।
এদিকে, ক্রয় কমিটির বৈঠকের পর পদ্মা সেতু নিয়ে প্রথমে কোনো কথা বলতে চাননি মুহিত। তিনি বলেন, ‘পদ্মা নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। প্রতিদিন কী হচ্ছে-না হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা করা আসলে উচিতও না।’ এর পরই অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এডিবি তো সকালেই তাদের সহযোগিতার কথা বলেছে। আশা করি জাইকারটাও শুক্রবার জানতে পারবেন।’
জাইকারটা কীভাবে জানা যাবে—জানতে চাইলে মুহিত বলেন, ‘জাইকা নিজেই বলবে। দর-কষাকষি চলছে পুরো বিষয়টির একটা সুরাহার জন্য। সবাই মিলেই চেষ্টা চলছে।’ অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এডিবি যা বলেছে, সেটাই আমার বক্তব্য। তারা তো ভালো একটা বার্তাই দিয়েছে।’ দর-কষাকষির এই পর্যায়ে কথা বলা উচিত না উল্লেখ করে হাসতে হাসতে মুহিত বলেন, ‘তার পরও তো কথা বলছি। আমি অবশ্য টক শো করি না। আপনাদের সঙ্গে যে কথা বলি, সেটাই এক ধরনের টক শো হয়ে যায়।’ প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘আমার মতো এত কথা কি সরকারের অন্য কেউ বলেন?’
পদ্মা সেতু প্রকল্পের সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে যে লিখিত বিবৃতি দেওয়ার কথা ছিল সে প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘রোববারের আগে তা সম্ভব নয়। তবে যখনই ভালো কোনো খবর পাব, তখনই তা জানিয়ে দেওয়া হবে।’ নিজের আয়কর বিবরণী তৈরি নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ছুটির দিনে আর কোনো কথা হবে না বলেও জানান মুহিত।
ক্রয় কমিটির বৈঠক শেষে চলে যাওয়ার সময় অর্থ উপদেষ্টা মসিউর রহমান পদ্মা সেতুর জন্য বিশ্বব্যাংকের ঋণ ও এ জন্য তাঁর পদত্যাগের শর্তের বিষয়ে জানতে চাইলে সাংবাদিকদের তিনি ইংরেজিতে শুধু দুটি শব্দ বলেন, ‘নো কমেন্ট।’
সকালে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়নকারী হিসেবে এডিবি কি থাকবে—এমন প্রশ্নের জবাবে হুয়ান মিরান্ডা সাংবাদিকদের বলেন, ‘পদ্মা সেতু প্রকল্পে এডিবি আজ আছে, আগামীকালও থাকবে।’ পদ্মা সেতু নির্মিত হবে—পত্রিকার পাতায় এমন শিরোনাম দেখতে চান বলে জানিয়ে তিন বার তিনি একই কথা বলেন, ‘বাংলাদেশে পদ্মা সেতু নির্মিত হবে’।
এরপর তিনি আগারগাঁওয়ে ইআরডি সচিব ইকবাল মাহমুদের সঙ্গে আরেকটি বৈঠক করেন। এই বৈঠক শেষে হুয়ান মিরান্ডা সাংবাদিকদের বলেন, ‘পদ্মা সেতু হবেই। অর্থের সংস্থান আছে। সেতু নির্মাণে অর্থ চাইতে পারো তোমরা।’
ইআরডি সচিব ইকবাল মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, এডিবি ও জাইকার অর্থায়নের ব্যাপারে তিনি খুবই আশাবাদী।
জানা গেছে, ইআরডি এডিবি ও জাইকাকে যে চিঠি পাঠিয়েছে, তাতে মেয়াদ বাড়ানোর সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি। তবে গত বুধবার রাতেই এডিবির পক্ষ থেকে ঋণের কার্যকারিতার মেয়াদ আরেক দফা বাড়ানোর মৌখিক আশ্বাস পেয়েছে সরকার। হুয়ান মিরান্ডা গতকাল দুপুরে ইআরডি সচিব ইকবাল মাহমুদের সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করেও মেয়াদ আরেক দফা বাড়ানোর আশ্বাস দেন।
উল্লেখ্য, ২৯১ কোটি ডলার বাজেটের পদ্মা সেতুর জন্য প্রধান অর্থায়নকারী বিশ্বব্যাংক ১২০ কোটি ডলার, এডিবি ৬১ কোটি ৫০ লাখ ডলার এবং জাইকা ৪০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার কথা বাংলাদেশকে। দুর্নীতির অভিযোগে গত ২৯ জুন বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিল করেছে। বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিলের পরও এডিবি ও জাইকা ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ঋণচুক্তির কার্যকারিতার মেয়াদ বাড়িয়েছিল, আজ শুক্রবার যার শেষ দিন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।