পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে অনিশ্চয়তা:আলোচনা সফল নয়

ঢাকা,০৬ ডিসেম্বর (খবর তরঙ্গ ডটকম)-পদ্মা সেতু প্রকল্পের দুর্নীতি অনুসন্ধান প্রতিবেদন ও মামলায় কাদের আসামি করা হবে তা নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও তদন্ত পর্যবেণে আসা বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেল। তবে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনকে মামলার আসামি করা নিয়ে উভয়ের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয় বলে জানা গেছে। সরকার তাকে আসামি করার বিরোধী। দু’দফা বৈঠক শেষে দুদকের চেয়ারম্যান গোলাম রহমান গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের জানান, আমাদের পুরো বিষয়টি নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনা করতে হবে। তবে বিশ্বব্যাংক প্যানেলের সাথে বৈঠকের ফলাফল সম্পর্কে স্পষ্ট করে তিনি কিছু না বললেও বৈঠক যে ব্যর্থ হয়েছে তার কথায় আভাস পাওয়া যায়। তিনি অবশ্য বলেন, আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে, এ কথা বলা যাবে না। প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর মামলার বিষয় বলা যাবে। দু-এক দিনের মধ্যে মামলার সিদ্ধান্ত হবে বলে জানান তিনি। অপর দিকে সন্ধ্যায় দ্বিতীয় দফা বৈঠক শেষে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রধান লুইস গ্যাব্রিয়েল মেরেনো ওকাম্পো দুদক কার্যালয় ত্যাগের সময় সাংবাদিকদের বলেন, দুদকের সাথে আমাদের খোলামেলা আলোচনা হয়েছে, আমরা আজই চলে যাচ্ছি।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেন, বৈঠকে বিশ্বব্যাংকের প্যানেল আমাদের বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আমরাও তাদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছি। বিশেষ করে আইন নিয়ে পর্যালোচনা হয়েছে। মামলার বিষয় তারা (বিশ্বব্যাংক প্যানেল) নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি বলেছেন, আমরাও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বলেছি। আমাদের সাথে মতবিরোধের কিছু হয়নি।

গতকাল বিকেলে কমিশনের সাথে বৈঠকে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের পর এক রকম সিদ্ধান্ত ছাড়াই তা শেষ হয়েছে। বৈঠক শেষে বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি অ্যালেন গোল্ডস্টেইন সাংবাদিকদের বলেন, আমরা দুদক থেকে যাচ্ছি। আমাদের অভ্যন্তরীণ আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ে যাচ্ছি। বিকেল ৫টায় প্যানেলের সদস্যরা অর্থমন্ত্রীর সাথে তার বাসায় জরুরি বৈঠকে বসেন। তবে বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে তা জানা যায়নি। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় বিশ্বব্যাংকের প্যানেল আবার দুদকে যায় এবং কমিশনের সাথে বৈঠকে বসে। তবে ওই বৈঠকে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর অ্যালেন গোল্ডস্টেইন উপস্থিত ছিলেন না। বৈঠকের ১৫ মিনিট পর সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটে দুদক কার্যালয় ত্যাগ করে লুইস গ্যাব্রিয়েল মেরেনো ওকাম্পোর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের প্যানেল।

বিশ্বব্যাংক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের দ্বিতীয় দফা সফরের তৃতীয় বৈঠকের একটি সূত্র জানায়, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে মামলার আসামি করা নিয়ে বৈঠকে মতবিরোধ দেখা দেয়। বিশ্বব্যাংক প্রতিনিধিদলের দাবির মুখে দুদকের আচরণকে অসহযোগিতামূলক বলে বৈঠকে মন্তব্য করা হয়।

দুদকের আইন ও বাংলাদেশের আইন সম্পর্কে বোঝাতে চাইলে কমিশনার মো: শাহাবুদ্দিনের ওপর প্তি হন প্যানেলের প্রধান ওকাম্পো। টিমথি ও ওকাম্পো উভয়েই বাংলাদেশী আইন সম্পর্কে উল্টো দুদক কর্তৃপকে বুঝিয়ে দেন যে, প্রচলিত আইনেই তার (সৈয়দ আবুল হোসেন) বিরুদ্ধে মামলা করা সম্ভব।

এ ছাড়াও এসএনসি লাভালিনের কানাডিয়ান তিন নাগরিককে আসামি করা নিয়েও প্যানেল ও কমিশনের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। প্যানেলের বক্তব্য হচ্ছে তাদের আসামি করা হলে বাংলাদেশের আদালতে তাদের বিচারের নিশ্চয়তা কিভাবে হবে।

এ দিকে অনুসন্ধান প্রতিবেদনে সুপারিশ করা আসামির নামের তালিকা থেকে সৈয়দ আবুল হোসেনের নাম বাদ দিয়ে এজাহার তৈরি করে দুদক। এই এজাহার গতকালই থানায় দায়েরের উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু প্যানেলের আপত্তিতে এই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়।

গতকাল দুদক কার্যালয়ে বিশ্বব্যাংক প্যানেলের সাথে প্রথম বৈঠক শুরু হয় ৩টা ৪০ মিনিটে। আধাঘণ্টা বৈঠক শেষে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে না পারায় দুদক কার্যালয় ত্যাগ করেন বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্যসহ বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিরা। যাওয়ার সময় বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর অ্যালান গোল্ডস্টেইন সাংবাদিকদের বলেন, এখনো সমাধানে পৌঁছতে পারিনি। আরো অভ্যন্তরীণ আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। কিছুটা আলোচনার জন্য বাইরে যাচ্ছি। আবার কিছুণ পর ফিরে এসে দুদকের সাথে আলোচনায় বসব।

সূত্র জানায়, সৈয়দ আবুল হোসেনকে আসামি না করায় পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিলো।

প্রসঙ্গত পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক গত ২৯ জুন ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি বাতিল করে। সরকার অভিযোগ তদন্তে বিশ্বব্যাংকের সাথে সমঝোতা চুক্তি সই করার পর ২০ সেপ্টেম্বর আবার অর্থায়নে ফিরে আসার ঘোষণা দেয় বিশ্বব্যাংক। এ দিকে বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ দলটি ফিরে গিয়ে বিশ্বব্যাংকের সদর দফতরে প্রতিবেদন দেবে। দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং গৃহীত আইনি পদেেপ সন্তুষ্ট হয়ে ইতিবাচক প্রতিবেদন দিলে, বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে অর্থসহায়তা দেয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দ্রুততম সময়ে ঘোষণা দিতে পারে। তা না হলে আবারো সঙ্কটে পড়বে পদ্মা সেতু প্রকল্প।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।