কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদন্ড

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে রায় দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে। মঙ্গলবার সকালে এ রায় ঘোষণা করেন বিচারক ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল। আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনা ছয়টি অভিযোগের মধ্যে চতুর্থ অভিযোগটি ছাড়া বাকি পাঁচটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে বলা হয়েছে।

এরআগে বেলা পৌনে ১১টার দিকে এজলাসের কার্যক্রম শুরু হলে আবদুল কাদের মোল্লার উপস্থিতিতে ট্রাইব্যুনাল ১৩২ পৃষ্ঠার রায়ের সংক্ষিপ্তসার পড়ে শোনান ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিরা।

মামলার যুক্তি-তর্ক ও রায়ে দেখা গেছে, আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনীত কোনো অভিযোগেরই প্রত্যক্ষদর্শী কোনো সাক্ষী নেই। এই মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে ১২ জন সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে এসে জবানবন্দি দিলেও সাক্ষীদের কেউই কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে কোনো  অভিযোগের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য দিতে পারেননি।

সাক্ষীরা বলেছেন, তারা অন্যের কাছে  এসব অভিযোগের কথা শুনেছেন।

উল্লেখ্য, বিচারের যথাযথ প্রক্রিয়া ও নিরপেক্ষতা নিয়ে জাতীয়-আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের আপত্তির মধ্যেই দ্বিতীয় একটি রায় দিলো ট্রাইব্যুনাল। এরআগে ধর্মীয় নেতা মাওলানা আবুল কালাম আযাদকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে রায় দেয় ট্রাইব্যুনাল।

ছয় অভিযোগ
১. পল্লব হত্যা: মিরপুর বাঙলা কলেজের ছাত্র পল্লবকে ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয়।

২. কবি মেহেরুননিসা হত্যা: ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ কবি মেহেরুননিসা, তার মা ও দুই ভাইকে মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের বাসায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায়ও কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয়।

৩. সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেব হত্যা: ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ বিকালে আরামবাগ থেকে সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেব মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনের বাসস্ট্যান্ডে গেলে তাকে ধরে জল্লাদখানা পাম্প হাউজে নিয়ে জবাই করে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।

৪. ঘাটার চরে শতাধিক মানুষ হত্যা: ১৯৭১ সালের ২৫ নভেম্বর সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত শতাধিক নিরস্ত্র গ্রামবাসীকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় কাদের মোল্লাকে অভিযুক্ত করা হয়।

৫. মিরপুরে ৩৪৪ জনের বেশি মানুষ হত্যা: ১৯৭১ সালের ২৪ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাদের একটি হেলিকপ্টার মিরপুরের আলুপদি গ্রামের পূর্ব দিকে নামে। সেখানে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে ৩৪৪ জনের বেশি মানুষ হত্যা করা হয়। এ ঘটনায়ও কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয়।

৬. হজরত আলী হত্যা: ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ সন্ধ্যা ৬টায় মিরপুরের ১২ নম্বর সেক্টরের ৫ নম্বর কালাপানি লেনে হজরত আলীর বাসায় ঢুকে হজরত আলীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই সঙ্গে তার স্ত্রী আমিনা ও দুই মেয়ে খাদিজা ও তাহমিনা, দুই বছরের ছেলে বাবুকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায়ও কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয়।

ডিফেন্সের যুক্তি
মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় গ্রামের বাড়িতে ছিলেন কাদের মোল্লা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা গত ১৫ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালে নিজেই ডিফেন্স সাক্ষী হিসেবে নিজের পক্ষে সাক্ষী দিয়েছিলেন। তিনি তার সাক্ষ্যে বলেছিলেন, ১৯৭১ সালের ১২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযয় থেকে গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের আমিরাবাদ চলে যান এবং মুক্তিযদ্ধের পুরো সময়ই গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করেন। গ্রামে অবস্থানকালে আবদুল কাদের মোল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও হাইস্কুলের প্রায় ৩০ জন ছাত্রের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নেন।

২৩ মার্চ থেকে ১ মে ১৯৭১ পাকিস্তান সেনাবাহিনী ফরিদপুরে পৌঁছার দিন পর্যন্ত অন্যদের সঙ্গে তিনি মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং চালিয়ে যান। সেনাবাহিনীর জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার (জেসিও) মফিজুর রহমান কাদের মোল্লা ও অন্যদের ডামি রাইফেল দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং দেন।

কাদের মোল্লা বলেন, গ্রামে অবস্থানকালে মৌলভী মো: ইসহাক ওরফে ধলা মিয়া পীর সাহেবের বাড়িতে যেতাম এবং উনার দুই মেয়েকে পড়াতাম ওই পীর সাহেবের এক জামাতা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিল বলে পরে জানতে পেরেছি এবং পীর সাহেবের ছেলেরা সবাই স্বাধীন বাংলার সমর্থক ছিলেন। পীর সাহেব মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাকে কিছু টাকা দেন তার বাজারের ঘরটি ব্যবসায়-বাণিজ্য করতে চালু করতে। পুরো ১৯৭১ সাল এবং ১৯৭২ সালের প্রায় পুরো সময় আমি প্রতি সপ্তাহে শনি ও মঙ্গলবারে বাজারে যেতাম, বাজারের পীর সাহেবের ঘরে বসতাম এবং ব্যবসায় করতাম।

কাদের মোল্লা আরও বলেন, ১৯৭১ সালে তৎকালীন সদরপুর-ভাঙ্গা নির্বাচনী এলাকা থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন ও সদরপুর থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি শাহজাহান তালুকদারের সঙ্গে আমার নিয়মিত আলাপ-আলোচনা হতো। তখন সদরপুর থানা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার লৎফুল করিমের সঙ্গেও আমার পরিচয় হয় এবং তারপর থেকে তাদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল।

মামলার বিবরণ
মোল্লার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত শুরু হয় ২০১০ সালে। পরে ডিসেম্বর মাসে রাষ্ট্রপক্ষ তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনে। ২০১২ সালের মে মাসে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে তার আনুষ্ঠানিক বিচারকাজ শুরু হয়। শুরুতে এই মামলাটি ট্রাইব্যুনাল-১-এ বিচারাধীন ছিল। পরে তা ট্রাইব্যুনাল-২-এ স্থানান্তর করা হয়।

মামলায় প্রসিকিউশনের তালিকার ৫৬ জন সাক্ষীর মধ্যে এ মামলার দুই তদন্ত কর্মকর্তাসহ ১২ জন ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

অন্যদিকে গত ১৫ নভেম্বর আবদুল কাদের মোল্লার পক্ষে তার নিজের সাক্ষ্য দেয়ার মধ্যদিয়ে ছয়জন ডিফেন্স সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়।

কাদের মোল্লার পক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের ৪০ বছরের ইমাম হাফেজ এ আই এম লোকমান ও ৮২ বছরের বৃদ্ধ সুশীল চন্দ্র মণ্ডল সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় কাদের মোল্লা গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। তিনি একজন ভালো মানুষ। উভয়পক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে গত ১৭ ডিসেম্বর কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী তার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করেন।

তিনি ২৭ ডিসেম্বর তার যুক্তি উপস্থাপন শেষ করলে ট্রাইব্যুনাল ৭ জানুয়ারি থেকে আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপনের দিন ধার্য করে দেন।

গত ৭ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি শুরু হয়। এরপর প্রসিকিউশনের আবেদনে গত ১৬ এপ্রিল মামলা ট্রাইব্যুনাল-২-এ স্থানান্তর করা হয়। ৭ মে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ ও ছয়জন সাক্ষীকে এ মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং ফরমাল চার্জে কিছু শব্দের সংশোধনী চেয়ে আনা আবেদনের ওপর শুনানি হয়। গত ২৮ মে তার বিরুদ্ধে ছয়টি অভিযোগ এনে অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল-২।

একটি রাজনৈতিক মামলায় ২০১০ সালের ১৩ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের প্রধান গেট থেকে কাদের মোল্লাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। ট্রাইব্যুনালে তদন্তকারী সংস্থার এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ২ আগস্ট কাদের মোল্লাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় আটক রাখার আদেশ দেয়া হয়।

আবদুল কাদের মোল্লার পরিচিতি
নাম আবদুল কাদের মোল্লা, বাবার নাম মো: সানাউল্লাহ মোল্লা। জন্ম তারিখ ২ ডিসেম্বর ১৯৪৮। জন্মস্থান জরিপের ডাংগি, ইউনিয়ন চরবিষ্ণুপুর, থানা ও উপজেলা সদরপুর, জেলা ফরিদপুর। বর্তমান স্থায়ী ঠিকানা গ্রাম আমিরাবাদ, ইউপি ভাষানচর, থান ও উপজেলা সদরপুর, জেলা ফরিদপুর।

আবদুল কাদের মোল্লা ১৯৫৮ সালে প্রাথমিক শিক্ষা বৃত্তি পান। তিনি ১৯৬৪ সালে আমিরাবাদ ফজলুল হক ইনস্টিটিউশন থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন। ১৯৬৬ সালে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন। একই কলেজ থেকে ১৯৬৮ সালে বিএসসি পাস করেন। এরপর প্রায় এক বছর চার মাস বাইশরশি শিবসুন্দরী অ্যাকাডেমিতে শিক্ষকতা করেন।

তিনি ১৯৬৯ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে এমএসসি কোর্সে ভর্তি হন এবং ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন।

১৯৭৪ সালে কাদের মোল্লা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর (ইনস্টিটিট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ) এ ডিপ্লোমা ইন এডুকেশনে (সোস্যাল সাইন্স) ভর্তি হন। ১৯৭৫ সালে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন পাস করেন।

কাদের মোল্লা অষ্টম শ্রেণীতে পড়াকালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। এরপর ডিগ্রি প্রথম বর্ষে পড়ার সময় ইসলামি ছাত্রসংঘে যোগ দেন। তিনি ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। পড়াশোনা শেষ করে তিনি ইসলামী ফাউন্ডেশনে চাকরি করেন।

এরপর বিডিআর সেন্ট্রাল পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। উদয়ন বিদ্যালয়ে ১৯৭৪-৭৫ সালে শিক্ষকতা করেন। তিনি ১৯৮২-৮৪ পর্যন্ত ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের দুবার নির্বাচিত সহ-সভাপতি ছিলেন। ১৯৮৩ সালে ঢাকা মহানগর জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক নিয়োজিত হন। ১৯৮৭ সালে তিনি ঢাকা মহানগর জামায়াতের আমির নির্বাচিত হন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।