প্রধান আসামী দারোয়ান এনামুলের ১০ দিনের রিমান্ড চেয়েছে র‍্যাব: সাগর-রুনি হত্যাকান্ড

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার প্রধান আসামি তাদের বাসার দারোয়ান এনামুল হক ওরফে আমিনুল ওরফে কলিম উদ্দিন ওরফে হুমায়ুনকে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠিয়েছে র‌্যাব। র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, ‘এনামুলকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তাকে ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি চাওয়া হবে।’ এরআগে গতকাল শনিবার ভোর ৫টায় গোপন সংবাদে র‌্যাব-৯ এবং র‌্যাবের একটি গোয়েন্দা দল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রেল স্টেশন থেকে এনামুলকে আটক করে। এ বিষয়ে র‌্যাব মহাপরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান পরে সকাল ১১টায় র‌্যাব সদরদপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে জানান, চাঞ্চল্যকর সাগর-রুনি হত্যা মামলাটি র‌্যাব শুরু থেকেই গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে আসছে।

তিনি বলেন, এ পর্যন্ত সর্বমোট ১২৭ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। মোট আটজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে এবং মোট ১৬ জনের ডিএনএ টেস্টের নমুনা পরীক্ষার জন্য বিদেশ পাঠানো হয়েছে।

র‌্যাব মহাপরিচালক আরও বলেন, তারা এই হত্যা মামলার মূল সন্দেহভাজন আসামি এনামুল ছদ্মবেশে ঢাকায় আত্মগোপন করে আছে বলে জানতে পারে। সে একটি সিকিউরিটি কোম্পানিতে চাকরি করছে জানতে পেরে গোয়েন্দা শাখার নজরে এনে তার গতিবিধির ওপর বিশেষ নজরদারি শুরু করা হয়।

তিনি বলেন, নজরদারির বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে সে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে বার বার জায়গা বদল করে। এরইমধ্যে র‌্যাবের নিকট সংবাদ আসে আসামি এনামুল শুক্রবার রাতে ঢাকা-সিলেটগামী সুরমা মেইল ট্রেনে উঠে শ্রীমঙ্গল যাচ্ছে।

‘ওই তথ্যের ভিত্তিতে র‌্যাবের গোয়েন্দা দল সুরমা মেইল ট্রেনে উঠে এনামুলের খোঁজ করতে থাকে। কিন্তু এনামুল কৌশল পরিবর্তন করে ব্রাণবাড়িয়ার রেল স্টেশনে নেমে পড়ে। পরবর্তীতে র‌্যাব ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রেল স্টেশনে নেমে এনামুলকে আটক করতে সক্ষম হয়’ যোগ করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্তভার পাওয়ার পরপরই র‌্যাব নিহত দম্পতির বাড়ির সিকিউরিটি গার্ড এনামুল ওরফে হুমায়ুনকে খুঁজছিল। হত্যাকাণ্ডের পর গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকার থেকে তার ছবি সংগ্রহ করে।

এক পর্যায়ে গত বছরের ৯ অক্টোবর হুমায়ুন ওরফে এনামুলকে ধরিয়ে দিতে ১০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দীন খান আলমগীর।

অবশ্য এর আগে হুমায়ুন ওরফে এনামুলকে হত্যাকাণ্ডের পরপরই আটক করেছিল পুলিশ। কিন্তু কয়েকদিন জিজ্ঞাসাবাদ করার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তখন পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, বাসার দারোয়ান এনামুলের কাছ থেকে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে নিজেদের ভাড়া বাসার শয়নকক্ষে খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারওয়ার ও তার স্ত্রী এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি।

হত্যাকাণ্ডের পর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করা হবে বলে জানিয়েছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন। তবে কথা রাখতে পারেননি তিনি।

এরপর মহিউদ্দীন খান আলমগীর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর ঘোষণা দিয়েছিলেন ১০ অক্টোবরের মধ্যে সাংবাদিক দম্পতির হত্যাকারীদের ধরা হবে। গত বছরের ৯ অক্টোবরের  তিনি সন্দেহভাজন সাতজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানান।

কিন্তু তারা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কিনা তা নিয়ে জনমনে সন্দেহ সৃষ্টি হওয়ায় এবং আন্দোলনকারী সাংবাদিক সমাজের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হলে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

হত্যাকাণ্ডের শুরুতে প্রাথমিক অবস্থায় দুইমাস তদন্ত করেও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ ব্যতীত হত্যাকাণ্ডের তেমন কোনো ক্লু এবং এর সঙ্গে জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

এক পর্যায়ে ডিবি পুলিশ তদন্তে নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করার পর হত্যারহস্য উদ্ঘাটনে উচ্চ আদালত আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তদন্তের জন্য অভিজাত বাহিনী র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র‌্যাব) দায়িত্ব দেন।

র‌্যাবের এএসপির নেতৃত্বে একটি দল মামলাটির তদন্ত এবং পুরো কার্যক্রম তদারক করছেন প্রায় ১০মাস ধরে। দায়িত্ব নিয়ে র‌্যাব কবর থেকে লাশ তুলে পুনঃময়না তদন্ত এবং নতুন করে তদন্ত শুরু করলে কিছুটা আশার সঞ্চার হলেও এখন পর্যন্ত দারোয়ান এনামুলকে আটক ছাড়া তেমন অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।

যদিও ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বছরজুড়েই দেশ ও দেশের বাইরে তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে নামে সাংবাদিক সংগঠনগুলো।

এদিকে, আগামী সোমবার এই হত্যাকাণ্ডের এক বছর পূর্ণ হবে। এই সাংবাদিক দম্পতি হত্যা মামলার প্রকৃত আসামিদের গ্রেপ্তারের ব্যর্থতায় সাংবাদিক সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছে।

প্রকৃত হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে বারবার সময় বেঁধে দিয়েও কোনো অগ্রগতি না পাওয়ায় আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি সোমবার সাংবাদিক সংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধ মহাসমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

একইসঙ্গে সাংবাদিক নেতারা হুঁশিয়ার করে বলছেন, ব্যর্থতা ঢাকতে নতুন কোনো চালাকি চলবে না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।