রাষ্ট্রপিত জিল্লুর রহমান আর নেই

আমরা গভীর দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে, রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।
বুধবার বাংলাদেশ বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে খবর তরঙ্গ পরিবার গভীরভাবে শোকাহত। খবর তরঙ্গ পরিবার তার বিদেহি আত্মার মাগফেরাত কামনা করছে এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছে।
প্রসঙ্গত, অসুস্থ হয়ে পড়লে সম্প্রতি রাষ্ট্রপতিকে সম্মিলত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়। সেখানে তার স্বাস্থ্যের অবনতি হলে ১০ মার্চ রাত ১০ মিনিটে তাকে সিঙ্গাপুর নিয়ে যাওয়া হয়।
রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদের স্পিকার আবদুল হামিদ অ্যাডভোকেট।

জিল্লুর রহমান ১৯২৯ সালের ৯ মার্চ কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব থানার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মরহুম মেহের আলী মিঞা ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী ও তৎকালীন ময়মনসিংহ লোকাল বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং জেলা বোর্ডের সদস্য।

জিল্লুর রহমান ময়মনসিংহ জেলা শহরে তার শিক্ষাজীবন শুরু করেন। ১৯৪৫ সালে ভৈরব কেবি হাই স্কুল থেকে তিনি মেট্রিক, ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে আই. এ. এবং ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে সম্মানসহ এমএ এবং এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে জিল্লুর রহমান সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক আমতলায় ১৯৫২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক ছাত্র সমাবেশে জনাব জিলুর রহমান সভাপতিত্ব করেন। সেখানেই ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।

এরপর ২০ ফেব্রুয়ারিতে ফজলুল হক ও ঢাকা হলের মধ্যবর্তী পুকুর পাড়ে যে ১১ জন ছাত্রনেতার নেতৃত্বে ২১ ফেব্রুয়ারির ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, জিল্লুর রহমান ছিলেন তাদের অন্যতম। ১৯৫৩ সালে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন।

ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার অপরাধে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কৃত হন এবং তার মাস্টার্স ডিগ্রি কেড়ে নেয়া হয়। কিন্তু প্রবল ছাত্র আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার মাস্টার্স ডিগ্রি ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হন।

১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে তিনি বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ভাইস-চেয়ারম্যান ছিলেন এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি কিশোরগঞ্জ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নির্বাচিত হন। ষাটের দশকে তিনি ঢাকা জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৪৭ সালে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের ছাত্র থাকাকালীন সিলেটে গণভোটের কাজ করার সময় তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্যিধ্যে আসেন। ১৯৬২ সালের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, ’৬৬ এর ৬ দফা আন্দোলন, ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানসহ প্রতিটি গণআন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাশে থেকে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭০ সালে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হন।

জিল্লুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। তিনি মুজিবনগর সরকার কর্তৃক পরিচালিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পরিচালনা এবং জয় বাংলা পত্রিকার প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সে সময় তৎকালীন দখলদার পাকিস্তান সরকার তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল করে ২০ বছর কারাদণ্ড প্রদান ও সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে।

১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশ গণপরিষদ সদস্য হিসেবে সংবিধান প্রণয়নে অংশ নেন। ১৯৭৩ ও ১৯৮৬ সালে তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদে তিনি পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি জাতীয় সংসদের উপনেতা হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি আইন জারির পর ওই বছরের ১৬ জুলাই রাতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা গ্রেপ্তার হলে তার অবর্তমানে জিল্লুর রহমান অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে দল পরিচালনা করেন। দীর্ঘ ১১ মাস শেখ হাসিনার জেলজীবন এবং চিকিৎসার জন্য আরও প্রায় ৬ মাস দেশের বাইরে অবস্থানকালে দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখেন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

এরপর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অবিস্মরণীয় বিজয় লাভ করে। এই নির্বাচনে তিনি ষষ্ঠ বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত তিনি নবম জাতীয় সংসদের সংসদ উপনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং জিল্লুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালে তিনি পুনরায় দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠিত হলে তিনি এর প্রথম সম্পাদক নির্বাচিত হন।

এরপর ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার পর তার জীবনের একটানা প্রায় চার বছর কারা অন্তরালে কাটে।

১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর জিল্লুর রহমান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামের সদস্য হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সালে সংসদ সদস্য থাকাকালে জিল্লুর রহমান আবারও কারাবরণ করেন। ১৯৯২ এবং ১৯৯৭ সালে দলীয় কাউন্সিলে তিনি পর পর দু’বার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

জিল্লুর রহমানের সহধর্মীনি বিশিষ্ট নারীনেত্রী বেগম আইভী রহমান বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ছিলেন। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের জনসভা চলাকালে গ্রেনেড হামলায় মারাত্মকভাবে আহত হয়ে দু’দিন পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

পারিবারিক জীবনে জিল্লুর রহমান এক ছেলে এবং দুই কন্যার জনক।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।