রাজনৈতিক সকল হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডকে ছাপিয়েই আজ উৎসবের রঙে সাজবে বাংলাদেশ

কায়মনে বাঙালি হওয়ার প্রেরণা নিয়ে আবার এল বৈশাখ। তবে এবার এক ভিন্ন পরিস্থিতিতে উদ্যাপিত হতে যাচ্ছে বাংলা নববর্ষ। দেশে চলমান হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডের মুখে বাঙালির সব কৃতি, গৌরব নিয়েও কেমন যেন উৎকণ্ঠা চলছে। তবে এসব ছাপিয়েই আজ রোববার উৎসবের রঙে সাজবে বাংলাদেশ। স্বাগত জানাবে ১৪২০ বঙ্গাব্দকে।

শহুরে বাঙালিয়ানার প্রিয় এই উৎসবে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথায় ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা’র চেয়ে কাছের আর সুর কি হতে পারে আজকের বাংলাদেশে! সমাজের এই করুণ-কঠোর বিভাজন ও তীব্র নিপীড়নের রাষ্ট্রে যা কিছু উল্লেখযোগ্য তার সবটাই মানুষের জন্য গ্লানির।
ঢাকায় আজ যখন নববর্ষের ‘উৎসব’ করছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কিছু সংগঠন, তখন দেশজুড়ে যেই পরিস্থিতি, তার বর্ণনা দিতে গেলে ঘুরে ফিরে যে শব্দগুলো আসছে তা এমন; গুম, গ্রেফতার, হরতাল, সহিংসতা, পুলিশ, গুলি, নিহত, আগুন, তাণ্ডব, ঘৃণা। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ কারাগারে রয়েছেন। রাজনৈতিক সহিংসতায় অল্প সময়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ হতাহত হবার রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

স্বাধীনতার চার দশকও পরেও আজ যখন স্বাধীনতার কথিত পক্ষ ও বিপক্ষ শক্তির বিপজ্জনক খেলা চলছে, তখন একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে উঠছে এমন সব গুরুতর বিতর্ক, যা নিরসনের বদলে আরো উসকে দিচ্ছে সরকারের কর্মকাণ্ড। আইনগত বিতর্ক নিরসন ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের কোনো লক্ষণ নেই। বরং একে কেন্দ্র করে আজ দেশজুড়ে প্রতিদিনই চলছে সংঘর্ষ। ঝরছে তাজা প্রাণ। ঘরে জ্বলছে আগুন। সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে আটক করার পর জাতীয় দৈনিক আমার দেশ’র প্রকাশনা বন্ধে সরকারের নানা আইন বহির্ভূত তৎপরতা দেখতে হচ্ছে।

একদিকে ঢাকায় চারুকলা ইনস্টিটিউটের আয়োজেন নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল বক্তব্য গাঁথা একপক্ষের সুরে- ‘‘রাজাকার মুক্ত বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ অনি:শেষ।” যেই মঙ্গল শোভাযাত্রায় থাকছে ৬৫ ফুট দীর্ঘ ভিনদেশি এক সরিসৃপ। অশুভ শক্তিকে তাড়ানোর জন্য দানবীয় এই প্রাণীকে ‘রূপক’ হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে একে।

অন্যদিকে বিপক্ষের অভিযোগ, স্রেফ দলীয় রাজনীতির স্বার্থসিদ্ধির জন্যই ব্যবহার করা হচ্ছে এই রাজাকারির বয়ান। সম্প্রতি একটি ধর্মীয় গোষ্ঠি তো আরো এগিয়ে এসে এর পেছনে আবিস্কার করেছে মুসলমান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে এক নির্মম উদ্যোগ হিসেবে।  দেশজুড়ে স্মরণকালের সব বিশাল বিক্ষোভ করে চলেছেন তারা।

এতো গ্লানি আর শঙ্কার মধ্যে তবু থেমে নেই নিষ্প্রাণ আনুষ্ঠানিকতা। দিবসটিকে কেন্দ্র করে নববর্ষকে স্বাগত এবং দেশবাসিকে শুভেচ্ছা জানিয়ে অস্থায়ি রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ এডভোকেট, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা জাতির উদ্দেশ্যে বাণী দিয়েছেন। এছাড়া, বিভিন্ন রাজনৈতিক,সামাজিক,সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের পক্ষ থেকে পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানো হয়েছে।

আজ সরকারি ছুটির দিন। রাজধানীর রমনার বিভিন্ন বৈশাখি মেলার খাবার স্টলে ইলিশ পান্তা খেতে যাচ্ছেন অনেকে। নগরীর অভিজাত রেস্টুরেন্টগুলো থেকে শুরু করে রমনা ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আশেপাশে ভ্রাম্যমাণ রেস্টুরেন্টে রয়েছে ইলিশ-পান্তার আয়োজন। বিভিন্ন এতিমখানা, কারাগার, সংশোধন কেন্দ্র, হোষ্টেল এবং হাসপাতালে উন্নত খাবার পরিবেশন ছাড়াও রেডিও টিভিতে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা, সংবাদপত্রে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ হয়েছে নববর্ষ ঘিরে।

রাজধানীর রমনা বটমূলে ছায়ানটের আয়োজনে আড়াই ঘণ্টার বর্ষবরণ আয়োজন শুরু হয়েছে সকাল সোয়া ছয়টায়। অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করছে বিটিভি, মাছরাঙা টেলিভিশন, দেশ টিভি ও বৈশাখী টিভি।

অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আরো পনের মিনিট আগে থেকে ভোর ছয়টায় শুরু হয়েছে চ্যানেল আইয়ের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। এই আয়োজনের শিরোনাম ‘হাজারও কণ্ঠে কোটি বাঙালির বর্ষবরণ ১৪২০’। সরাসরি সম্প্রচার করছে চ্যানেল আই। ঢাকা শিশুপার্কের সামনে ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে সকাল থেকেই। সকাল সাড়ে ছয়টা থেকে ধানমন্ডি ২ নম্বর সড়কে সীমান্ত স্কয়ারের বিপরীতে লেকের ধারে গান ধরেছে রবিরাগ। আড়াই ঘণ্টার এই আয়োজন সরাসরি দেখাচ্ছে একুশে টিভি।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মূল দল, বিভিন্ন শাখা ও সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে বৈশাখি মেলা, র্যা লি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে রাজধানীতে ও বাইরে।

চট্টগ্রামে দুই দিনব্যাপী বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে আজ। চট্টগ্রাম ডিসি হিলে তা আয়োজন করেছে সম্মিলিত পয়লা বৈশাখ উদযাপন পরিষদ। খুলনায় নগর সামাজিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র আয়োজন করেছে তিন দিনের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। শুরু হয়েছে লবণছড়ায় রূপসা ব্রিজের নিচে। বগুড়ায় দিনবদলের মঞ্চ আজ থেকে আয়োজন করেছে দুই দিনের অনুষ্ঠান। সিলেটের সুবিদ বাজারের ব্লু-বার্ড স্কুলে কাল বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে শ্রুতি সিলেট। আজ ময়মনসিংহ ক্লাবে হচ্ছে দিনব্যাপী বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। যশোর পুলিশ লাইন মাঠে দিনব্যাপী বর্ষবরণ অনুষ্ঠান হচ্ছে। আয়োজন করেছে চাঁদের হাট।

এদিকে আজ পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে রমনার বটমূলে আগতদের নিরাপত্তার স্বার্থে বিকাল ৫টার মধ্যে বাড়ি ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন মহানগর পুলিশ কমিশনার।

পুলিশের মহাপরিদর্শক জানিয়েছেন, বাংলা নতুন বর্ষকে বরণ করতে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। নববর্ষ ঘিরে রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ রাজধানীকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেয়া হয়েছে।

নববর্ষের অনুষ্ঠানের শুরু থেকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পাশাপাশি র্যাব, গোয়েন্দা পুলিশ এবং ডিএমপির সোয়াট টিমের সদস্যরা এসব এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলবে।


সম্পাদনা: শামীম ইবনে মাজহার,নিউজরুম এডিটর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।