সাভারের জামতলায় শতাধিক লাশ উদ্ধার, অবরুদ্ধ হাজারো শ্রমিক:আহত ৮০০

সাভারের জামতলায় বুধবার সকাল নয়টার দিকে ধসে পড়া ৮ তলা ভবন রানা প্লাজার নিচ থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শতাধিক পোশাক শ্রমিকের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আহত কমপক্ষে আটশত শ্রমিককে উদ্ধার করে স্থানীয় এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ অন্যান্য চিকিৎসাকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছে।মৃতের সংখ্যা আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধারকাজ এখনো চলছে।

ঢাকা দক্ষিণের গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওয়াহিদুজ্জামান জানিয়েছেন, তিনি এযাবত ১০০’র বেশি মৃতদেহ বুঝে নিয়েছেন। এসব মৃতদেহ স্থানীয় এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ অন্যান্য চিকিৎসাকেন্দ্রে রাখা হয়েছিল। পরে তা স্থানীয় অধরচন্দ্র স্কুলের মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়েছে পরিচয় শনাক্তকরণের জন্য।

মালিকদের হিসাব অনুসারে, কমপক্ষে ২ হাজার ৬৩৮ জন শ্রমিক ওই ভবনটির বিভিন্ন তলায় কাজ করতেন। ধসে পড়া ভবনটির মধ্যে এদের অধিকাংশ এখন অনেক লাশের পাশে অবরুদ্ধ হয়ে আছেন। এদের অনেকের সাথে বাইরে থেকে যোগাযোগ স্থাপন করা গেলেও সরঞ্জামের অভাব ও আরো ধস এড়াতে সতর্কতার কারণে উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না।

এদিকে শ্রমিকরা বলছেন, ভবনটিতে কাজ করা লোকেদের প্রকৃত সংখ্যা বিজিএমইএ’র বলা আড়াই হাজারের চেয়ে অনেক বেশি হবে। তাছাড়া বহুতল ভবনটি ভেঙে পাশের একটি দ্বিতল ভবনের ওপর পড়লে সেখানেও অনেকে হতাহত অবরুদ্ধ হয়েছেন।

উদ্ধার তৎপরতার সমন্বয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী জানিয়েছেন, ধসে পড়া ভবনের ভেতরে অবরুদ্ধ থাকা জীবিতদের প্রাধান্য দিয়ে উদ্ধারকাজ শেষ হতে আরো দুই/তিনদিন লাগবে।

হতাহত স্মরণে বৃহস্পতিবার একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে সরকার। এদিন সব সরকারি-বেসরকারি দফতরে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। এছাড়া উদ্ধার তৎপরতা নির্বিঘ্ন করার জন্য টানা ৩৬ ঘন্টা হরতালের ৪ ঘন্টা বাকি থাকতেই দুপুরে তা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন আঠারো দলীয় জোট।

আশঙ্কা করা হচ্ছে, ধ্বংসস্তুপের নিচে এখনো অনেকেই আটকা পড়ে রয়েছেন। সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ, দমকলবাহিনী, রেডক্রিসেন্টসহ নানা রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনসহ স্বেচ্ছাসেবীরা উদ্ধার কাজ চালাচ্ছে। আহতদের স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে,ঢাকা মেডিকেল ও পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও বিএনপি স্থায়ীকমিটির সদস্য আসম হান্নান শাহ সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া।

তৈরি পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, তিনটি পোশাক কারখানায় মোট ২ হাজার ৬৩৮ জন কর্মকর্তা কর্মচারী ওই ভবনের কাজ করতো। এদের মধ্যে তৃতীয় তলায় ৮৮৫ জন, চতুর্থ তলায় ৪৯৫জন, পঞ্চম তলায় ৪৭৮, ষষ্ঠ তলায় ৩৪০ ও সপ্তম তলায় ৪৫০ জন ছিলেন ।

এর আগে মঙ্গলবার ভবনটির একটি পিলার ও দেয়াল ফাটল ধরলে তিনটি পোশাক কারখানায় কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কারখানাগুলোতে ছুটি ঘোষণা করা হলে তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে অনেক আহত হন।

মঙ্গলবারের ওই ফাটলের পর আতঙ্কে নামতে গিয়ে অনেকে আহতও হয়েছিলেন। তবে ভবন মালিক স্থানীয় যুবলীগ নেতা সোহেল রানা ও সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কবির হোসেন বলেছিলেন, ফাটল অস্বাভাবিক নয়।

পরে সেই ফাটল সংস্কারের উদ্যোগ না নিয়ে বুধবার বহুতল ভবনটিতে কাজ করতে আসতে বলা হয়েছিল তিনটি তৈরি পোশাক কারখানার কয়েক হাজার শ্রমিককে।

মালিক রানাও ভবনটি ধসের সময় বেসমেন্টে গ্যারেজে ছিলেন। ভবনটি ধসে পড়লে তিনি আর বের হননি। পরে সকাল দশটার দিকে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য তৌহিদ জং মুরাদ ঘটনাস্থলে গিয়ে ভবন মালিক রানাকে বের করে নিয়ে যান।

তবে তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে বলে প্রচার করলেও ঘটনাস্থলে রানার সঙ্গে থাকা তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু অ্যাডভোকেট মাসুদ চৌধুরী জানান, তিনি আহত হননি।

এদিকে হাসপাতাল থেকে গা ঢাকা দিয়েছেন মালিক সোহেল রানা। বিকেলে থেকে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

প্রসঙ্গত, ভবনের তৃতীয় তলা থেকে অষ্টম তলা পর্যন্ত নিউ ওয়েব বটম্স লিমিটেড, প্যান্টম টিওসি লিমিটেড ও নিউ ওয়েব স্টাইল লিমিটেড নামে তিনটি তৈরি পোশাক কারখানা ছিল।  এছাড়া দ্বিতীয় তলায় ছিল ব্র্যাক ব্যাংকের সাভার শাখা। গতকাল ফাটল ধরলে ব্যাংকের সব কর্মকাণ্ড বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। এছাড়া ভবনটির প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় ছিল বিপণী বিতান।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।