যে কারণে সংলাপই বেছে নিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

সাভার ট্রাজেডি এখন রাজনৈতিক সংলাপ ইস্যুতে মোড় নিয়েছে। নানা জল্পনা। আশাবাদী না হলেও আলোচনা গড়াচ্ছে, হঠাৎ করেই সংলাপের পথ বেছে নিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চাউর আছে, এছাড়া আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। শেষ পর্যন্ত তিনি সংলাপের গুটি বিরোধীদলীয় নেতার কোর্টেই ঠেলে দেন। এখন দেখার বিষয় খালেদা জিয়া সেটি কিভাবে নেন।

তবে সেগুন বাগিচা থেকে সফলভাবে প্রধানমন্ত্রীকে সঠিক আগাম বার্তা দেয়া হয়। বার্তা পেয়েই তৎপর হয়ে ওঠেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে। আলোচিত ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে পরীক্ষায় পাস করা কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে নিয়ে তিনি আলাপ করেন। আলাপে উঠে আসে আপাতত এই সংকট সমাধানের একটিই পথ সংলাপ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আলোচনায় বর্তমান সরকারের একাধিক বিষয় উঠে আসে। যুদ্ধাপরাধের বিচার, শাহবাগ আন্দোলন, জামায়াতকে প্রতিরোধ, হেফাজতের দাবি নিয়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিরি মধ্যেই সাভার ট্রাজেডির মতো ভয়াবহ ঘটনা ছাড়াও দল ও সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে মৃদু অস্থিরতার বিষয়ে বিস্তর আলোচনা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর কাছের এসব নেতারা একমত হন যে, সরকারের সামনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্ট ওপেন হয়ে গেছে। খুব সাবধানে পা ফেলতে হবে। তৃণমূণে জনমত সরকারের পক্ষে নেই, যার প্রমাণ ফটিকছড়ি। দল দিয়ে এসব মোকাবেলা করা এখন আর সরকারের পক্ষে সম্ভব না। প্রশাসনও শেষ সময়ে খুব একটা মুভ করতে চাচ্ছেন না। অনেক এলাকাতে প্রশাসনের সঙ্গে বিরোধী জোটের সমঝোতা এখন প্রকাশ্য।

আর এসব বিবেচনায় নিয়ে সরকার আপাতত সিদ্ধান্ত নেন হেফাজতকে ঠেকানোর। এজন্য হেফাজতের ১৩ দফার নারী ইস্যু নিয়ে সরব হয় সরকার সমর্থকরা। তবে এর মধ্যেই সরকার পতনে বিরোধী জোটের নতুন পরিকল্পনা পৌঁছে যায় প্রধানমন্ত্রীর কানে। এরপর প্রধানমন্ত্রী আর সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হননি।

এরপর গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী সাভারে স্মরণকালের ভবনধসে মহামারীর ঘটনা পরিদর্শনে গিয়ে বিরোধী দলের প্রতি মানবিক দিক বিবেচনায় ২ মে’র হরতাল প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। রাজনৈতিক শিষ্টাচারের অংশ হিসেবে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াও তার প্রস্তাবে সাড়া দেন এবং এক ধাপ এগিয়ে জনগণের দাবির প্রতি প্রধানমন্ত্রীকে সাড়া দিতে আহ্বান জানান।

এই বক্তব্যই প্রধানমন্ত্রী লুফে নেন। তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় নেতার এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে প্রশংসা করেন। পরে গতকাল বৃহস্পতিবার ঝালকাঠী জেলার তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি বিরোধী দলকে সংলাপ শুরুর আহ্বান জানান।

মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলীয় নেতার উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আসুন আমরা বসি। বসে আলাপ-আলোচনা করি।’ তিনি আরও বলেন, ‘যেখানে খুশি বসি। আমি মনে করি, পার্লামেন্ট সবচেয়ে ভালো জায়গা, নিরপেক্ষ জায়গা। আসুন বসি। আপনাদের দাবি-দাওয়া শুনি।’

এরপরই বিএনপির শীর্ষমহলে সংলাপ নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত দলটির দাবি, আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংবিধানে পুনর্বহাল। এরপরই সংলাপ। তবে সবকিছুর আগে দলটি চান সরকারের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিএনপি তাদের ৪ মে’র সমাবেশ ঘোষণা করে হেফাজতের সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতার পর। এদিন সারা দেশ থেকে সমাবেশে আসা বিরোধী জোটের নেতাকর্মীরা বিভিন্নভাবে ঢাকায় অবস্থান করবে। আর এর ঠিক পরের দিন হেফাজতের ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি।

হেফাজতের নেতাকর্মীদের সরকার ঢাকা আসা ঠেকালেও সমস্যা নেই। যারা আসতে পারবে তারা সমাবেশের পর অবস্থান নেবে। এর বাইরে রাজধানীর আশপাশের অন্তত ৮টি স্পটে বসে যাবে হেফাজতের নেতাকর্মীরা। এরই মধ্যেই শুরু হবে অস্থিরতা। সরকার ঢাকাকে সামাল দিতে গেলে তা বাইরে ছড়িয়ে পড়বে। এরই সুযোগ নিবে ১৮ দলীয় জোটের ঢাকায় অবস্থান নেয়া নেতাকর্মীরা। আর এ তথ্যই পৌঁছে যায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি সংলাপের পথ বেছে নেন।

আপাত দৃষ্টিতে সংলাপ নিয়ে বিরোধী দলের দাবির প্রতি সর্বোচ্চ ছাড় দিবে সরকার। গ্রেপ্তার বিএনপির শীর্ষ নেতারা ছাড়া পেয়েও যেতে পারেন। তত্ত্বাবধায়ক দাবিতেও চমক আসতে পারে।

প্রয়োজনে জামায়াত ইস্যুতেও নমনীয় হবে সরকার। যার ইঙ্গিত ইতোমধ্যে দেখা গেছে, ১৪ দলের নেতারা শুক্রবার এক বৈঠক শেষে বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে সংলাপে বসার আহ্বান ইতিবাচক। আমরা আশা করি বিরোধীদলীয় নেতাও এতে ইতিবাচক সাড়া দেবেন।’

বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গ না ছাড়লে আলোচনা হবে কিনা এমন এক প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে আহ্বান জানিয়েছেন। এখন তারা জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে আলোচনা করবে, না তাদের বাদ দিয়ে করবে সেটি তাদের ব্যাপার।’

এই যখন অবস্থা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুক্রবার সন্ধ্যায় গণভবনে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সেখানে তিনি সাভার ভবন ধসের ঘটনা তুলে ধরে বিএনপি ও হেফাজতকে তাদের কর্মসূচি স্থগিতের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে লিখিত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী সংলাপ নিয়ে একটি কথাও বলেননি। পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, বিচার মানি, তালগাছ আমার জেদ ধরে সংলাপে আসলে তা সফল হবে না। খোলা মন নিয়ে আসতে হবে।

অথচ কিছু দিন আগেও দেশে বিরাজমান বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে বৈঠকে বসার প্রয়োজনীয়তা নাকচ করে প্রধানমন্ত্রী সংলাপ ইস্যুতে কঠোর অবস্থানে ছিলেন। নিউ ইয়র্কে গিয়ে বলেছিলেন, ‘চোর-বাটপারদের সঙ্গে বসে কি হবে? যারা অরফানেজের টাকা মেরে খায়, তাদের সঙ্গে বসে কী লাভ। বসলেই তো বলবে দুর্নীতিবাজ ছেলেকে ছেড়ে দাও। যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দাও।’

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।