আজ বিদ্রোহী কবির ১১৪তম জন্মদিন

আজ আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৪তম জন্ম দিন।১৩০৬ বঙ্গাব্দে বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চরুলিয়া গ্রামে তার আবির্ভার ঘটেছিল।দুঃখের ডালি মাথায় নিয়ে কষ্টকে চিরসঙ্গী করে এসেছিলেন তিনি। পরপর চারটি সন্তানকে ‘হারানোর পর নজরুলের ব্যথাতুর মা হাজেরা খাতুন দুঃখের সন্তানটির নাম রেখেছিলেন দুখুমিয়া। এ আশায় যে আল্লাহ নিশ্চয়ই তার এ সন্তানটির হায়াত দারাজ করবেন। কোন অভিধায় ভূষিত করা যায় তাকে!
রবীন্দ্রনাথের পর বাংলাভাষায় তিনিই প্রথম মৌলিক কবি। তিনি একজন মহান সঙ্গীতস ষ্টাও। একাধারে কবি,সাহিত্যিক, সঙ্গীতজ্ঞ,নাট্যকার,সাংবাদিক,রাজনীতিবিদ,দেশপ্রেমিক ও সৈনিক হিসেবে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সদা সোচ্চার। কাব্য ও সাহিত্য সাধনার ক্ষেত্রে তিনি একাধারে সাম্য ও মানবতাবাদী এবং অসম্প্রদায়িক। সর্বোপরি তিনি অন্যায়,অবিচার, শোষণ এবং পীড়নের বিরুদ্ধে যেমন চিরবিদ্রোহী, তেমনি প্রেম, প্রীতি, ভালোবাসা এবং মমতার আধার। তাই তো তিনি বলতে পেরেছেন,‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাশরী আর হাতে রণতূর্য।’
ছেলেবেলায় দুঃসহ দারিদ্র্যে এবং ছন্নছাড়া জীবনধারায় বেড়ে ওঠা ও সীমাবদ্ধ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সত্ত্বেও কবি নজরুল তার বিপ্লবী লেখনীর শক্তিতে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ রাজের ভিত কাঁপিয়ে তুলেছিলেন। ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি কলকাতায় তৎকালীন সাপ্তাহিক ‘বিজলি’তে প্রথম প্রকাশিত হয় তার অসাধারণ কবিতা ‘বিদ্রোহী’, ‘বলবীর, চির উন্নত মম শির ’। কবি তার এই হার না মানা বিদ্রোহ চালিয়ে যেতে চেয়েছেন অনন্তকাল পর্যন্ত। তাই তিনি বলেছেন,‘আমি সেইদিন হব শান্ত/যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবেনা,/অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণভূমে বনিবে না-/বিদ্রোহী রণক্লান্ত/আমি সেইদিন হব শান্ত ঃ।’ বাংলা সাহিত্যের রবি,কবীন্দ্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জোড়াসাকোতে নিজে নজরুলের মুখে তার ‘বিদ্রোহী’কবিতার আবৃত্তি শুনে নিজ আসন থেকে উঠে তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন,হ্যাঁ কাজী,তুমি আমাকে হত্যা করবে। আমি তোমার কবিতা শুনে মুগ্ধ। তোমার কবি প্রতিভায় জগৎ আলোকিত হবে।’
নজরুলের প্রথম কবিতার বই অগ্নিবীণা ও প্রথম প্রবন্ধের বই ‘যুগবাণী’প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালে। ব্রিটিশ সরকার ‘যুগবাণী’গ্রন্থটি বাজেয়াপ্ত করে। অগ্নিবীণা নিষিদ্ধ না হলেও তার কোন কপি কোথাও পাওয়া গেলে আটক করা হতো। একই বছর সেপ্টেম্বর মাসে ধূমকেতু পত্রিকায় ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ও ‘বিদ্রোহীর কৈফিয়ত’ প্রকাশের দায়ে কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘রাজদ্রোহী’হিসেবে অভিযুক্ত হন। ধূমকেতু ও নবযুগ পত্রিকা দুটি জামানতসহ প্রতিটি সংখ্যা বাজেয়াপ্ত হয়। নজরুলের নামে জারি হল গ্রেফতারি পরোয়ানা। গা-ঢাকা দিয়ে কুমিল্লায় অবস্থানকালে তিনি গ্রেফতার হন। ১৯২৩ সালের জানুয়ারি মাসে তাকে জেলে পাঠানো হয়। নজরুল কারারুদ্ধ হলেন বটে, তার স্বাধীনতার অভিযান, সাম্য ও মানবতার অভিযানে কোন বিরতি ঘটেনি। প্রবঞ্চিত, নিপীড়িত, পরাধীন মানুষ তথা তৎতালীন অবিভক্ত ভারতকে উজ্জীবিত করার কারণে ব্রিটিশ রাজের কোপানলে পড়ে নজরুলই প্রথম বাঙালি লেখক ও কবি, যিনি সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করেন। এমনি করে অপঘাত, নির্যাতন ও দুঃখের মধ্য দিয়ে দুখু মিয়ার জীবন অতিবাহিত হতে থাকে। এরই মধ্যে তার দুঃখিনী মায়ের মৃত্যু ঘটে। চার বছরের শিশুপুত্র বুলবুলকে হারান। জীবনসঙ্গিনী প্রমীলা নজরুল পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। পরিবারের বিরহ ব্যথা, সংসারের দুঃসহ অভাব-অনটন এবং রাজনৈতিক নির্যাতন কবিকে দিশেহারা করে ফেলে।
১৯৪২ সালে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে অজানা এক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে কবি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে যান। এরপর অনেকটা আড়ালেই চলে যান তিনি। অনেক চিকিৎসার পরও তার স্মৃতিশক্তি ফিরে পাননি আমাদের প্রিয় কবি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১৪ মে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অনেক চেষ্টা-তদবির করে ভারত সরকারের অনুমোদনক্রমে কবিকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। তাকে দেয়া হয় জাতীয় কবির মর্যাদা। ধানমণ্ডির কবিভবনে বাস করতে থাকেন তিনি। এরপর ১৯৭৬ সালের ২৯ আগষ্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় তৎকালীন পিজি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বিদ্রোহের কবি, প্রেমের কবি, মানবতার মহান কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
নজরুল ছিলেন একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গ্রন্থাকার, সাংবাদিক, পত্রিকা পরিচালক, সম্পাদক, সৈনিক, বিদ্রোহী, ঔপন্যাসিক, শিশুসাহিত্যিক, অভিনেতা ও সঙ্গীতকার। তার একজন ঘনিষ্ঠ সহচর মন্তব্য করেছেন, ‘মাত্র আধ ঘণ্টা, কী আরও কম সময়ের মধ্যে পাঁচ-ছয়খানি গান লিখে পাঁচ-ছয়জনের হাতে বিলি করে দিতেন। যেন মাথার মধ্যে গানগুলি সাজানোই ছিল, কাগজ-কলম নিয়ে সেগুলো লিখে ফেলতেই যা দেরি। সঙ্গে সঙ্গে হারমোনিয়াম টেনে নিয়ে পাঁচ-ছয়জনকে সেই গান শিখিয়ে দিয়ে রেহাই দিতেন তিনি।’
বাংলা কাব্যে নজরুল এক নতুন ধারার জন্ম দেন,সেটি হলো ইসলামী সঙ্গীত,তথা গজল। এর পাশাপাশি তিনি অনেক উৎকৃষ্ট শ্যামাসঙ্গীত ও হিন্দু ভক্তিগীতিও রচনা করেছেন। সুরস ষ্টা নজরুল প্রায় ৪ হাজার গান রচনা এবং অধিকাংশেরই সুরারোপ করেছেন। কোন একক গীতিকার নজরুলের মতো এত অধিক সংখ্যক গান রচনা করতে পারেননি। বাণী,সুর ও রাগবৈচিত্র্যে এ উপমহাদেশের সঙ্গীত জগতে নজরুলসঙ্গীত এক বিচিত্র রত্নভাণ্ডার। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নজরুলের আগে কোন রণসঙ্গীতের খোঁজ পাওয়া যায় না। চল চল চল/ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল/নিম্নে উতলা ধরণী-তল,/অরুণ প্রাতের তরুণ দল/চলরে চলরে চলঃ ।’১৯৯৬ সালের ৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পদাতিক বাহিনীর রণসঙ্গীত হিসেবে প্রচলন করা হয়।
বাংলাদেশে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুল নজরুলের স্মৃতিধন্য,এখানে তিনি এক বছরের মতো লেখাপড়া করেন। এছাড়া নজরুলের স্মৃতি জড়িয়ে আছে কুমিল্লা এবং মানিকগঞ্জের তেওতায়। নজরুল-প্রমীলার স্মৃতিবিজড়িত যমুনা নদীর তীরবর্তী মানিকগঞ্জের তেওতা গ্রামখানি পরিগণিত হতে পারে একটি দর্শনীয় স্থানে। জাতীয় কবি নজরুলের লেখা গান-কবিতা আমাদের জাতীয় জীবনের পরতে পরতে প্রেরণার অন্যতম উৎস। ১৯৭১-এ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে শক্তি ও সাহস জুগিয়েছে নজরুলের সংগ্রামী গান। নজরুলের স্মৃতি বাঙালি জাতির এক পরম সম্পদ।
প্রতি বছরের মতো এবারও জাতীয় কবি, বিদ্রোহী কবি, সাম্যের কবি, মানবতার কবি এবং সর্বোপরি প্রেমের কবি কাজী নজরুলের জন্ম জয়ন্তীকে ঘিরে নজরুলময় হয়ে উঠেছে সারাদেশ। জাতীয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে নজরুলের জন্ম দিনটিকে ঘিরে আয়োজন হয়েছে নানা অনুষ্ঠানের। যথার্থই তিনি বলেছিলেন, আমি চিরতরে দূরে চলে যাব, তবু আমারে দিব না ভুলিতে ঃ ।
বাণী : জাতীয় কবির জন্ম জয়ন্তী উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া পৃথক বাণীতে তার অমর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
কর্মসূচি : আজ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৪তম জন্ম বার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় পর্যায়ে নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জাতীয় কবির জন্ম জয়ন্তী উদযাপন করা হবে। আজ সকাল ১১টায় ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। তথ্য অধিদফতর জানায়, অনুষ্ঠান উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে কবির সমাধিতে পুষ্প অর্পণ, মাজার চত্বরে আলোচনা সভা, কবিতা পাঠ ও সঙ্গীতানুষ্ঠান।
আওয়ামী লীগের কর্মসূচি : জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৪তম জন্ম বার্ষিকী উপলক্ষে আওয়ামী লীগ বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সকাল ৭টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে চিরনিদ্রায় শায়িত কবির সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আজ এক বিবৃতিতে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম দিন যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনে জন্য দল ও দলের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সব স্তরের নেতাকর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী ও দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
জন্ম বার্ষিকী উপলক্ষে ত্রিশালে ৩ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা : জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বাল্যস্মৃতি বিজড়িত ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালের দরিরামপুরের সুসজ্জিত নজরুল মঞ্চে আজ শনিবার থেকে শুরু হচ্ছে কবির ১১৪তম জন্ম বার্ষিকীর তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা। জেলা প্রশাসন আয়োজিত এ অনুষ্ঠানমালা চলবে ২৭ মে পর্যন্ত।
শনিবার সকালে নজরুল একাডেমী মাঠের দক্ষিণ পাশের নজরুল মঞ্চে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর। বিশেষ অতিথি থাকবেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. ক্যাপ্টেন (অব.) মজিবুর রহমান ফকির, মেজর জেনারেল আবদুস সালাম এমপি, অধ্যাপক ডা.এম আমানউল্লাহ এমপি,রেজা আলি এমপি,মুক্তিযোদ্ধা সংসদ জেলা ইউনিট কমান্ডের কমান্ডার নাজিমউদ্দিন আহমেদ ও জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আবদুল মতিন সরকার।
নজরুল স্মারক বক্তৃতা দেবেন জাতীয় কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. খোন্দকার আশরাফ হোসেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন জেলা প্রশাসক মুস্তাকিম বিল্লাহ। ২৬ মে দ্বিতীয় দিন সকালের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। বিশেষ অতিথি থাকবেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী প্রমোদ মানকিন। নজরুল স্মারক বক্তৃতা দেবেন নজরুল বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শান্তনু কায়সার। সভাপতিত্ব করবেন ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার এএন সামসুদ্দিন আজাদ চৌধুরী। ২৭ মে সমাপনী দিনে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী। স্মারক বক্তৃতা দেবেন নজরুল বিশেষজ্ঞ ড. হায়াৎ মাহমুদ। সমাপনী দিনে সভাপতিত্ব করবেন জেলা প্রশাসক মুস্তাকিম বিল্লাহ। তিনদিনের অনুষ্ঠানমালায় সঙ্গীত, নৃত্যনাট্য, নাটক, আবৃত্তি পরিবেশন করবেন জাতীয় পর্যায়ের শিল্পীরা।


সম্পাদনা: শামীম ইবনে মাজহার,নিউজরুম এডিটর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।