হলমার্ক কেলেঙ্কারি: অভিযুক্ত ২৫ জন

বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ বহুল আলোচিত হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার দায়ে ২৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। মামলায় নাম থাকা আট কর্মকর্তাকে বাদ দেয়া হয়েছে। নতুন করে ছয়জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। সোনালী ব্যাংকের ১৫ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তির সুপারিশ করা হয়েছে।
বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নামও রয়েছে কারন তিনি আগে সোনালী ব্যাংকের ডিএমডি ছিলেন। রোববার দুপুরে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) কেলেঙ্কারির তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে তদন্তদল। দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত বিভাগের মহাপরিচালক জিয়াউদ্দিন আহমেদ প্রতিবেদনটি কমিশনের চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামানের কাছে জমা দেন।

দুদকের সিনিয়র উপ-পরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলীর নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি বিশেষ টিম এ ঘটনার তদন্ত করে।

বিভিন্ন সূত্র জানায়, তদন্ত প্রতিবেদনে হলমার্ক ও সোনালী ব্যাংকের ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে আদালতে চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন চেয়েছে। এর আগে ২০১২ সালের ৪ অক্টোবর হলমার্ক গ্রুপের এমডি, চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলামসহ মোট ২৭ জনের বিরুদ্ধে ১১টি মামলা দায়ের করে দুদক। প্রতিবেদনে নতুন ছয়জনকে অভিযুক্ত করা হলেও মামলায় নাম থাকা আট কর্মকর্তাকে বাদ দেয়া হয়েছে। সোনালী ব্যাংকের ১৫ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তির সুপারিশ করা হয়েছে।

যাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট প্রদানের অনুমতি চাওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন- হলমার্কের এমডি মো. তানভীর মাহমুদ (কারাগারে), তার স্ত্রী ও গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম (জামিনে আছেন), তানভীরের ভাইরা ও গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক তুষার আহমেদ।

দেশের আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় এ কেলেঙ্কারির তদন্ত প্রতিবেদনে সোনালী ব্যাংকের সাবেক পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের অভিযুক্ত করা হয়নি।

এছাড়া হলমার্ক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান অ্যাপারেল এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. শহিদুল ইসলাম, স্টার স্পিনিং মিলসের মালিক মো. জাহাঙ্গীর আলম, টিঅ্যান্ড ব্রাদার্সের পরিচালক তসলিম হাসান, ম্যাক্স স্পিনিং মিলসের মালিক মীর জাকারিয়া, সেঞ্চুরি ইন্টারন্যাশনালের মালিক মো. জিয়াউর রহমান, আনোয়ারা স্পিনিং মিলসের মালিক মো. জাহাঙ্গীর আলম, প্যারাগন গ্রুপের এমডি সাইফুল ইসলাম রাজা, নকশী নিটের এমডি মো. আবদুল মালেক ও সাভারের হেমায়েতপুরের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জামাল উদ্দিন সরকারকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ম্যাক্স স্পিনিং মিলস, আনোয়ারা স্পিনিং মিলস, সেঞ্চুরি ইন্টারন্যাশনাল, অ্যাপারেল এন্টারপ্রাইজ ও স্টার স্পিনিং মিলসের মালিকরা সবাই ভুয়া। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে এই কথিত মালিকরা সবাই হলমার্কের কর্মচারী। কাগজ-কলম ছাড়া ম্যাক্স ও আনোয়ারা স্পিনিং মিলসের বাস্তবে কোন অস্তিত্ব নেই। তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এসব ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করেছেন।

ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের জিএম অফিসের দুই জিএম ননী গোপাল নাথ ও মীর মহিদুর রহমান, প্রধান কার্যালয়ের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন কবির, ডিএমডি মাইনুল হক ও আতিকুর রহমান এরা সবাই ওএসডি, দুই উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) শেখ আলতাফ হোসেন ও মো. সফিজউদ্দিন আহমেদ, দুই এজিএম মো. কামরুল হোসেন খান এরা সাময়িক বরখান্ত হলেও এজাজ আহম্মেদকে অভিযুক্ত করা হয়।

মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ
১১ মাস তদন্ত শেষে জমা দেয়া প্রতিবেদনে এজাহারভুক্ত আট আসামিকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। তারা হলেন_ সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের কেন্দ্রীয় হিসাব বিভাগের সাবেক ডিজিএম ও বর্তমানে সিলেটের জিএম কার্যালয়ে কর্মরত জিএম ভগবতী মজুমদার, একই বিভাগের এজিএম মো. আবুল হাসান এবং রূপসী বাংলা হোটেল শাখার সাবেক সিনিয়র কর্মকর্তা অব. মো. ওয়াহিদুজ্জামান।

শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছে যাদের বিরুদ্ধে
মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হলেও বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে পাঁচজনের বিরুদ্ধে। তারা হলেন- সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের জিএম আনম মাসরুরুল হুদা সিরাজী ও সবিতা সিরাজ, ডিজিএম কানিজ ফাতেমা চৌধুরী, এজিএম মো. খুরশিদ আলম ও আশরাফ আলী পাটোয়ারী। দায়িত্বে অবহেলার জন্য তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলে মতামত দিয়েছে তদন্তদল। তবে তারা কোনো দুর্নীতিতে যুক্ত ছিলেন না।

এজাহারে নাম নেই এমন আরো ১০ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তির সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। তারা হলেন- প্রধান কার্যালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য (অর্থায়ন) বিভাগের এজিএম মো. শওকত আলী, ভিজিল্যান্স অ্যান্ড কন্ট্রোল বিভাগের ডিজিএম এমএইচএস আবু জাফর, বেসিক ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সোনালী ব্যাংকের সাবেক ডিএমডি কাজী ফখরুল ইসলাম, জিএম মো. মাহবুবুল হক ও নওশের আলী খন্দকার, অডিট অ্যান্ড ইনস্পেকশন ডিভিশন-২-এর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. একরামুল হক।

এছাড়া রয়েছেন ইতিমধ্যে অবসরে যাওয়া ইনস্পেকশন অ্যান্ড অডিট ডিভিশন-২-এর এসইও কে ডবিস্নউ শাহিদা খানম, পরিদর্শন ও নিরীক্ষা বিভাগের এজিএম শামীম আখতার এবং রূপসী বাংলা শাখার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম ও কর্মকর্তা উকিল উদ্দিন।

মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে রূপসী বাংলা হোটেল শাখা থেকে হলমার্ক মোট ২ হাজার ৬৮৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে। এর মধ্যে স্বীকৃত বিলের বিপরীতে পরিশোধিত (ফান্ডে) অর্থ হচ্ছে এক হাজার ৫৬৮ কোটি ৪৯ লাখ ৩৪ হাজার ৮৭৭ টাকা।


সম্পাদনা: শামীম ইবনে মাজহার,নিউজরুম এডিটর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।