বিএনপি নেতাদের আত্মগোপন কৌশল নাকি আত্মরক্ষা!

সরকারবিরোধী আন্দোলনে তৃণমূলে মার খাচ্ছেন নেতাকর্মীরা। অথচ পদ নিয়ে আরাম-আয়েশে দিন কাটাচ্ছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। প্রধান বিরোধী দল বিএনপির তৃণমূল যখন এই অভিযোগ করছেন তখন কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, দলের চেয়ারপারসনের নির্দেশেই তারা গ্রেফতার এড়াতে আত্মগোপনের কৌশল নিয়েছেন। কেউ আবার দাবি করছেন, অজ্ঞাত স্থানে বসেই তারা আন্দোলন পরিচালনা করছেন। তবে মাঠের কর্মীরা বলছেন, কৌশল নয়, নিজেদের রক্ষার জন্যই এসব নেতা আত্মগোপনের কথা বলছেন। এছাড়া আন্দোলনে নিজেদের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক এড়াতে নেতাদের কেউ কেউ গ্রেফতার হয়ে ‘সেইফহোমে’ যাওয়ারও চেষ্টা করছেন-এমন অভিযোগও করছেন কর্মীরা। আর ক্ষুব্ধ হয়ে এসব ‘সুবিধাভোগী’ নেতার নামে নালিশ জানিয়ে স্বয়ং দলীয় চেয়ারপারসনের কাছে বিভিন্ন জেলার নেতারা চিঠি দিয়েছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। নির্দলীয় সরকারের দাবিতে গত কয়েক বছর ধরে আন্দোলন করলেও মূলত গত ২৫ অক্টোবরের পর থেকে বারবার কঠোর কর্মসূচি দিয়ে আন্দোলন জোরদারের চেষ্টা করছে বিএনপি। আর ২৫ নভেম্বর তফসিল ঘোষণা হলে আন্দোলনে গতি আনতে সড়ক, নৌ ও রেলপথ অবরোধের ডাক দেয়া হয় দলটির নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষ থেকে। কিন্তু দুই একটি স্থান ছাড়া কোথাও দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা মাঠে না থাকায় দলের প্রধানের মতো তৃণমূলের নেতাকর্মীরা দারুণভাবে ক্ষুব্ধ হয়। এই ক্ষোভ থেকে ইতিমধ্যে ‘সুযোগবাদী’ এসব নেতার নামে অভিযোগ করে খালেদা জিয়ার কাছে বেশ কিছু জেলার নেতারা চিঠি দিয়েছেন বলে দলীয় সূত্র জানায়।

যদিও এর আগে আন্দোলনে না থাকায় কেন্দ্রীয় নেতাদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে বেশ কয়েকজনকে সতর্ক করে দেন চেয়ারপাসন। পাশাপাশি ঢাকায় আন্দোলন চাঙ্গা করতে আট নেতাকে দায়িত্ব দেন তিনি। কিন্তু এ চেষ্টাও কোনো কাজে আসেনি। কয়েক দফা হরতাল শেষে টানা অবরোধে সহিংসতায় এ পর্যন্ত ৫১ জনের প্রানহানি হয়েছে। যাদের মধ্যে জোটের নেতাকর্মীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সংখ্যাও কম নয়। নিহত নেতাকর্মী-সমর্থকরা সবাই তৃণমূলের। কিন্তু রাজধানীতে আন্দোলন চাঙ্গা করতে না পারলেও বিএনপির অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতা নিরাপদ মনে করে এখানে ‘আত্মগোপনে’ আছেন। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সারা বছর আন্দোলনে মাঠে না থাকলেও ৮ নভেম্বর থেকে আতঙ্ক শুরু হয় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে। দলটির স্থায়ী কমিটির তিন সদস্য, চেয়ারপারসনের এক উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী গ্রেফতার হলে এ আতঙ্ক আরো বেড়ে যায় নেতাদের মধ্যে। এর ভেতরেই পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঢুকেন যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এরপর থেকে তিনিই কয়েকদফা অবরোধ চিত্রসহ দলের নানা বক্তব্য তুলে ধরেছেন। রিজভীর পরে মুখপাত্রের দায়িত্ব নিলেও গ্রেফতার আতঙ্কে কার্যালয়ে না এসে অজ্ঞাতস্থানে বসে ভিডিও বার্তা দিয়ে যাচ্ছেন যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ। যদিও তার ওপর কার্যালয়ে আসার নির্দেশ ছিল খালেদা জিয়ার। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী মহাসচিবের মুখপাত্রের দায়িত্ব পালনের কথা। কিন্তু প্রকাশ্যেই আসছেন না মির্জা ফখরুল। সবশেষ গত ২৮ নভেম্বর অবরোধে নিহতদের স্মরণে নয়াপল্টনে গায়েবানা জানাজায় যোগ দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে মোটরসাইকেলে চলে যান অজ্ঞাতস্থানে।

অবশ্য চেয়ারপারসনের নির্দেশে তার এই আত্মগোপনের কৌশল বলে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন ফখরুলের ঘনিষ্ঠজনরা। কিন্তু অন্যদের কৌশল সম্পর্কে খোদ বিএনপির চেয়ারপারসনও অবগত নন বলে জানা গেছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, খালেদা জিয়ার কাছে পাঠানো এসব চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, পদ নিয়ে যারা রাজপথে নেই তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিন, নির্বাচন হলে তাদেরকে মনোনীত করবেন না।  এসব চিঠিতে আলোচিত ১/১১-এর সময়ে সংস্কারপন্থীদের পরিণতির বিষয়ও  উল্লেখ করা হয় বলে জানা গেছে। দক্ষিণাঞ্চলের একটি জেলার নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলা হয়েছে, প্রায় তিন মাস আগে  কমিটি গঠন হলেও এখন পর্যন্ত নেতৃবৃন্দকে মাঠে দেখা যায়নি। আর এ কারণে ইচ্ছা থাকলেও কর্মীরা মাঠে নামছে না। তবে রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও খুলনায় কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউ কেউ মাঠে থাকায় অবরোধ কর্মসূচি বেশ জোরালোভাবেই পালিত হতে দেখা যায়। মাঠে না থাকার অভিযোগ রয়েছে- দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, স্থায়ী কমিটির সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা, যুগ্ম মহাসচিবসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে। এছাড়া অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আছে তৃণমূলের। তারা বলছেন, এসব নেতা রাজপথের চেয়ে জেলখানাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। তাই তারা তদবির করে মামলায় আসামি হয়ে গ্রেফতার হওয়ার চেষ্টা করছেন।  তবে রাজপথ থেকে কেউ গ্রেফতার হলে তাদের কোনো আপত্তি নেই- বলেও জানান তারা।

কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও বরিশাল মহানগর সভাপতি মজিবর রহমান সরোয়ার নতুন বার্তা ডটকমকে বলেন, “রাজপথের নেতাদের তালিকা করে মনোনয়নের সময় সেটা প্রকাশ করা উচিত, নয়তো সুসময়ের পাখিরা তা বাগিয়ে নেয়।”
রাজপথে না থাকলেও আত্মগোপনে থাকাবস্থায় ৫ নভেম্বর  রাতে উত্তরা গ্রেফতার হন ঢাকা মহানগর বিএনপির সভাপতি সাদেক হোসেন খোকা। তার গ্রেফতার নিয়েও নানা মন্তব্য করেন ঢাকার নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, সবসময় ম্যানেজ করতে পারলেও এবার আর তা না পেরে আটক হয়েছেন খোকা। চকবাজার থানা বিএনপির এক নেতা বলেন, বারবার হুঙ্কার দিলেও রাজধানীতে আন্দোলনের লাগাম টেনে ধরেছিলেন তিনি। একই অভিযোগ স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, মহানগর বিএনপির সদস্য আব্দুস সালাম, যুগ্ম মহাসচিব আমান উল্লাহ আমানসহ অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতার বিরুদ্ধে। এছাড়া যুবদল,  স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধেও রয়েছে একই ধরনের অভিযোগ। তবে স্বেচ্ছাসেবক দলের সপু-বাবু গ্রেফতার হলেও এ সংগঠনের কর্মীরা বলছেন, আন্দোলন জমাতে না পারায় তাদের শোকজ করা হতে পারে-এমন আশঙ্কা থেকে তারা নিজেরাই ধরা দিয়েছেন।

আর ছাত্রদলের সভাপতি উত্তরা ও সাধারণ সম্পাদক শান্তিনগর থেকে গ্রেফতার হলেও তাদের সংগঠনের  নেতাকর্মীরা বলছেন, নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়ে তারা পুলিশে ধরা দিয়েছেন। অন্যথায় তারা রাজপথ থেকে গ্রেফতার হতেন। কর্মীদের এমন অভিযোগের বিষয় জানতে চাইলে সরাসরি অস্বীকার না করে দলটির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য নতুন বার্তা ডটকমকে বলেন, “কৌশলে গ্রেফতার এড়ানোর জন্য বলা হলেও কেউ কেউ এটাকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছেন, তাতে আন্দোলনে ভাটা পড়ছে। তবে এটা উচিত নয়।” তবে চেয়ারপারসনের এক উপদেষ্টা বিষয়টি অস্বীকার করে নতুন বার্তা ডটকমকে বলেন, “সরকার যখন হার্ডলাইনে থাকে তখন গ্রেফতার এড়ানোর কৌশল নেয়া ছাড়া কিছু বিকল্প থাকে না। কারণ সবাই গ্রেফতার হলে পরবর্তীতে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার মতো কেউ থাকবে না।”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।