ট্রাইব্যুনালের সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করার আহ্বান এইচআরডব্লিউ’র

একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের বিচারের জন্য যারা সাক্ষ্য দিয়েছেন, দ্রুত তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারকে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

সোমবার সংস্থাটি নিজেদের ওয়েবসাইটে জানায়, বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং সংঘর্ষের মধ্যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, “যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে যারা সাক্ষ্য দিচ্ছে তাদেরকে হত্যা করার ঘটনা অতীতের এবং ভবিষ্যতে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে যারা সাক্ষ্য দেবেন তাদেরকে প্রভাবিত করবে। এতে সাক্ষীরা আর সাক্ষ্য নাও দিতে পারেন।”

প্রসঙ্গত, জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ পর্যায়ের নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের দায়ে সাক্ষী দেয়া মুস্তাফা হাওলাদার চলতি মাসের ১০ তারিখ নিহত হন। ঘরে ঢুকে দুর্বৃত্তরা তাকে হত্যা করে। মৃত্যুর আগে হাওলাদারকে অচেনা ব্যক্তিরা ফোনে হুমকি দিত। তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল স্থানীয় পুলিশের। কিন্তু হাওলাদারের ছেলের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ তাদের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব নিলে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের খাওয়াদাওয়ার খরচ বহন করতে হতো হাওলাদারের পরিবারকেই। অথচ, দরিদ্র হাওলাদারের দৈনিক আয় ছিল একশ’ টাকারও কম। ফলে বাধ্য হয়েই তারা পুলিশকে বলেছিল হাওলাদার যখন বাইরে থাকবেন, শুধু তখনই যেন পুলিশ তাকে নিরাপত্তা দেয়। এরপর থেকে কাজ থেকে ফেরা পর্যন্ত পুলিশ হাওলাদারকে নিরাপত্তা দিয়ে রাখলেও বাড়িতে তিনি নিরাপদে ছিলেন না।

আরেক সাক্ষী রণজিৎ কুমার নাথ অভিযোগ করেন, গত ১৫ ডিসেম্বর মধ্যরাতে তার বাড়ি এবং দোকানের সামনে পেট্রোল বোমা মারা হয়েছিল। রনজিত কুমার নাথ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের সাক্ষী দিয়েছিলেন। রনজিতের বাড়িতে নিক্ষিপ্ত পেট্রোল বোমাটি বিস্ফোরিত না হলেও আরেকটি পেট্রোল বোমায় তার দোকানের একাংশ পুড়ে যায়। হাওলাদারের মতোই রনজিতও পুলিশের কাছে একাধিকবার হুমকির বিষয়ে অভিযোগ করলেও নিরাপত্তা পাননি।

বিচারকাজ চলার সময়ে, আগে এবং পরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসরত সাক্ষীদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে উল্লেখ করে অ্যাডামস বলেন, “বাংলাদেশ সরকার হাওলাদার ও তার পরিবারকে নিরাপত্তা দিতে পারেনি। একটি সত্যিকারের সাক্ষী নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কখনোই নিরাপত্তাকর্মীদের খাবারের দায়িত্ব সাক্ষীরা নেবেন, এমন বাহুল্য থাকা উচিত না।”

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অন্য সাক্ষীদের বিরুদ্ধেও হুমকি দেয়ার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছে। যুদ্ধাপরাধী আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে প্যানেলভুক্ত বিচারক ফজলে কবির এবং সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বড়িতে হামলার বিষয়টিও বাংলাদেশের একাধিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক কবির গত ১০ ডিসেম্বর সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বিশেষ করে হাওলাদারের মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “একটি স্বাধীন-স্বার্বভৌম দেশে বিচারকার্যে সহায়তা করার জন্য একজন সাক্ষীকে হত্যা করার বিষয়টি কখনোই গ্রহণযোগ্য না।”

২০১০ সালে এই বিচার কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সাক্ষীদের নিরাপত্তা বিধানের বিষয়টি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিল। তখন সরকারের তরফ থেকে সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা জানানো হলেও তা ছিল অনানুষ্ঠানিক এবং অপরিকল্পিত। ফলে নিরাপত্তায় ব্যবস্থায় ফাঁক থেকে যাওয়ায় হাওলাদার হত্যাকাণ্ড ঘটে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অধীনে কর্তৃপক্ষকে একটি নিরপেক্ষ সংস্থা গঠন করতে হবে। বিচার কার্যক্রম চলাকালীন এবং শুরু হওয়ার আগে ও পরে সাক্ষীদের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব নেবে নিরপেক্ষ সংস্থাটি। সংস্থাটিকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হতে হবে। সংস্থাটিকে যথাযথভাবে কার্যকর করতে হলে এটিকে অবশ্যই তথ্যবহুল হতে হবে এবং এর কর্মকর্তারাও যেন নিরাপত্তা বিধানের সামগ্রিক দিক সম্পর্কে সঠিকভাবে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত হন, তাও নিশ্চিত করতে হবে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের বিচার কার্যক্রমকে নিরপেক্ষ ও সঠিক করার জন্য হিউম্যান রাইটস ওয়াচ নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে উল্লেখ করে অ্যাডামস বলেন, “দ্রুততার সঙ্গে সাক্ষীদের নিরাপত্তা বিধান করতে না পারলে সাক্ষীরা যদি সাক্ষ্য না দেয় কিংবা প্রত্যাহার করে নেয়, তাহলে তা যথেষ্ট যৌক্তিক। বিচারকদের সামনে এসে যেসব সাক্ষী দাঁড়াবেন তাদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় আদেশ-নির্দেশ দেয়ার ক্ষমতা বিচারকদের আছে। বিচারকদেরকে অবশ্যই এই ক্ষমতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে হবে।”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।