ভারত-বাংলাদেশ দ্রুত ট্রানজিট চায় ঢাকা

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে দেশটির সরকার মিয়ানমার-কালাদান হাইওয়ে প্রকল্পকেই অধিকতর গুরুত্ব দিচ্ছে। ভারত-বাংলা ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট প্রকল্পের চাইতে বর্তমানে মিয়ানমার-কালাদান হাইওয়ে প্রকল্পই ভারত সরকারের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে এবং এই প্রকল্পটিই দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার বিকল্প পথ হিসেবে বেছে নেয়া হচ্ছে। আর ঢাকার ঢিলেমির কারণেই এমনটা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

আজ এই খবর দিয়েছে ভারতের আসাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক যুগশঙ্খ।

যুগশঙ্খের প্রতিবেদনটি এখানে তুলে ধরা হলো:

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে মিয়ানমার-কালাদান হাইওয়ে প্রকল্পের মাধ্যমে মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক উন্নয়নে ভারত সরকার যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন বাংলাদেশ সরকার। ফলে ভারতের সঙ্গে ট্রানজিট-ট্রান্সশিপমেন্টসহ অমীমাংসিত সবগুলো দ্বি-পাক্ষিক সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে উদগ্রীব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকার।

ভারত-মিয়ানমার ট্রানজিট প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সম্প্রতি দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারিক এ করিম চার পৃষ্ঠার একটি চিঠি পাঠিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের কাছে। চিঠিটির একটি কপি প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভীর কাছেও পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

সরকারের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করে চিঠিটিতে বলা হয়েছে, কালাদান প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কলকাতা সমুদ্রবন্দর ও মিয়ানমারের সিত্তে বন্দরের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এরপর সিত্তে থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত নদী ও সড়কপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে। আর এর ফলে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে ভারত-বাংলাদেশ ট্রান্সশিপমেন্ট আর ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক প্রকল্প হারাতে থাকবে বাংলাদেশ।

পর্যাপ্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের মাধ্যমে আগামী ৩০ এপ্রিলের মধ্যে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পরামর্শও দেয়া হয়েছে চিঠিটিতে। গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, নৌ-পরিবহণ মন্ত্রণালয়, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, রেল মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধানদের নিয়ে উচ্চস্তরের বৈঠকের প্রতি।

দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারিক এ করিম ও ভারতের বিদেশ সচিব সুজাতা সিংয়ের মধ্যে সম্প্রতি এক বৈঠকের কথা উল্লেখ করে চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, দুই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কোন্নয়নে জড়িত ইস্যুগুলো নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে তাগাদা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সুজাতা সিং।

সীমান্তে চোরাচালানসহ অন্যান্য অপরাধমূলক কাজ বন্ধ করার জন্য যতো বেশি সম্ভব সীমান্ত হাট স্থাপনের পরামর্শ দেয়া হয়েছে চিঠিতে। এছাড়া, ভারত-বাংলা এলসি স্টেশনের পরিকাঠামো উন্নয়ন, নৌ-প্রটোকলে নতুন পথ অন্তর্ভুক্ত করা, ট্রানজিট পরিকাঠামো উন্নয়নে রেলপথ স্থাপন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের কাজে ব্যবহৃত নৌ-প্রটোকলে ব্রহ্মপুত্র নদকে অন্তর্ভুক্ত করা, আসাম-বাংলাদেশ সংযোগ স্থাপনের জন্য নৌ-প্রটোকলের ব্যবস্থা করা, আসাম-বাংলাদেশ ও মেঘালয়-বাংলাদেশের স্থলবন্দরগুলোর সুবিধা বাড়ানো, বিভিন্ন বন্দরের সঙ্গে রেল যোগাযোগ তৈরী করা, ঢাকা-গুয়াহাটি সরাসরি বিমান চলাচলের পদক্ষেপ গ্রহণ করা- ইত্যাদির প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে চিঠিতে। দ্বি-পাক্ষিক সমস্যার সমাধান করতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রশ্ন তোলা হয়েছে বাণিজ্য সম্প্রসারণে বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) দক্ষতা নিয়েও।

ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হলে অবিলম্বে ট্রানজিট-ট্রান্সশিপমেন্টসহ ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে অমীমাংসিত সবগুলো দ্বি-পাক্ষিক সমস্যার সমাধান করতে হবে বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকগুলোতেও বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পাচ্ছে।

প্রসঙ্গত, ২০১০ সালে শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময়ে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী যৌথ ইশতেহার ঘোষণার মাধ্যমে দুই দেশ যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করে। এরপর থেকে বেশ কিছু দ্বি-পাক্ষিক সমস্যার সমাধান হলেও ভারত-নেপাল-ভুটান ট্রানজিট তৈরি, তিস্তা চুক্তি, সীমান্ত চুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ ও বড় সমস্যাগুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।