উপজেলা নির্বাচন: অন্তহীন অভিযোগ, নীরব ইসি

দেশজুড়ে চলমান উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে অন্য প্রার্থীদের বিপুল পরিমাণ অভিযোগ জমা পড়লেও এই ব্যাপারে একেবারেই নীরব ভূমিকা পালন করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। খবর ইউএনবির।

নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ, হুমকি প্রদর্শন, নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আপত্তিকর কর্মকাণ্ডের অভিযোগসহ ভোট পুনঃগণনা ইত্যাদিসংক্রান্ত প্রায় ১৫ থেকে ২০টি অভিযোগ প্রতিদিন নির্বাচন কমিশনে জমা পড়ে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা। কিন্তু এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন দাবি করে নির্বাচন কমিশন এগুলোর কোনোটাই আমলে নেয় না। এসব ব্যাপারে কোনো দায়বদ্ধতা আছে কিংবা তাদের কিছু করার আছে বলে মনে করে না নির্বাচন কমিশন। বরং কোনো অভিযোগ বা আপত্তি পেলে তা যাচাই-বাছাইসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ঘাড়ের ওপর চাপিয়ে দিয়েই সন্তুষ্ট প্রতিষ্ঠানটি।

ফেব্রুয়ারি ২৭ তারিখে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দফার উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে যশোরের চৌগাছা উপজেলায় বিএনপি মনোনীত চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী জহুরুল ইসলাম বেশ কিছু অভিযোগ জানানো সত্ত্বেও অভিযোগকে আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করেনি নির্বাচন কমিশন। ফলে নির্বাচনে পরাজিত এই বিএনপি নেতা ও সমর্থকদের ওপর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমর্থকদের হামলার ঘটনাও থামেনি। নির্বাচন চলাকালীন উপজেলার ৮০টি কেন্দ্রের মধ্যে ২৮টি কেন্দ্রেই ভোট ছিনতাইসহ ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ এনে উপজেলাটির ফলাফল ঘোষণা স্থগিত রাখার জন্য এই প্রার্থী কমিশন বরাবর একটি পিটিশন দাখিল করেন। অভিযোগপত্রের সঙ্গে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সংবাদপত্রে প্রকাশিত নির্বাচনের দিন তার ও তার সমর্থকদের ওপর হামলার বিভিন্ন সংবাদ ও ছবিও তিনি জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু একজন নির্বাচন কমিশনার এই ব্যাপারে তাদের কিছু করার নেই জানিয়ে জহুরুল ইসলামকে কোর্টে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

নির্বাচন স্থগিতসংক্রান্ত জহুরুল ইসলামের অনুরোধে আপত্তি থাকতেই পারে। কিন্তু ১৯৭২ সালের জনপ্রতিনিধি আদেশের ৪৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে, প্রার্থীর নাম নির্বাচনে অংশগ্রহণসংক্রান্ত সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হওয়ার ৪৫ দিন পর্যন্ত প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশন বরাবর অভিযোগপত্র জমা দিতে পারবেন। তারপর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশন গঠিত নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে নির্বাচনী এসব অভিযোগপত্র জমা দেয়ার জন্য কমিশন যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মো. মোরশেদ আলম ভোট পুনঃগণনা করার জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে আবেদন জানান।

বরিশালের গৌরকান্দী উপজেলার চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী লোকমান হোসেন, ভাইস চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী জহির সাজ্জাদ এবং সংরক্ষিত নারী আসনে ভাইস চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী তাসলিমা পারভীন নির্বাচনে কমিশনের কাছে আবেদন করেন বেসরকারিভাবে ঘোষিত ফলাফল বাতিল করার জন্য।

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী গাজী গোলাম মোস্তফা নির্বাচনের দিন ঝুঁকিপূর্ণ ১৪টি কেন্দ্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের অনুরোধ করেন।
ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান পসপ্রার্থী কামাল উদ্দীন নির্বাচন কমিশনের কাছে আবেদন করেন যেন সেখানকার রিটার্নিং অফিসারকে বদলে দেয়া হয়। রিটার্নিং অফিসারের বিরুদ্ধে কামাল উদ্দীন পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আনেন।

এরকমই আরো অসংখ্য অভিযোগ নির্বাচন কমিশনের কাছে নিয়মিত জমা পড়েছে।

নির্বাচনের আগেই নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গসহ নানারকম অনিয়ম প্রতিরোধ করতে নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট শাখা তাদের ওয়েবসাইটে লিখেছে- “এরকম যেকোনো ধরনের অনিয়ম বা সংঘর্ষের কারণে কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দল ক্ষতিগ্রস্ত হলে তারা নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটি কিংবা নির্বাচন কমিশনের কাছে সহযোগিতা চেয়ে আবেদন করতে পারেন। যদি আবেদনটি যৌক্তিক বলে প্রমাণিত হয় তাহলে তা তদন্তের জন্য উক্ত কমিটি বরাবর পাঠানো হবে।”

এই প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নওয়াজ বলেন, “নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ বা অনিয়মসংক্রান্ত অধিকাংশ অভিযোগ অনির্দিষ্ট হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় আমরা কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারি না।” এক্ষেত্রে তিনি অভিযোগপত্রে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উল্লেখ করার জন্য প্রার্থীদের পরামর্শ দেন।

অবশ্য কমিশনার শাহ নওয়াজ স্বীকার করেন যে গত দুই মাসে অনুষ্ঠিত দুই দফার উপজেলা নির্বাচনের সময়েই দেশজুড়ে বিভিন্ন উপজেলায় অনিয়ম ও সংঘর্ষের অনেক ঘটনা ঘটেছে।

প্রসঙ্গত, দেশজুড়ে মোট পাঁচ দফায় চতুর্থ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রথম দফায় গত ১৯ ফেব্রুয়ারি দেশের ৯৮টি উপজেলায় এবং দ্বিতীয় দফায় ২৭ ফেব্রুয়ারি ১১৪টি উপজেলায় ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে। নির্বাচনের পরবর্তী দফাগুলোর মধ্যে তৃতীয় দফার উপজেলা নির্বাচন আগামী ১৫ মার্চ দেশের ৮৩টি উপজেলায়, চতুর্থ দফা ২৩ মার্চ ৯২টি উপজেলায় এবং সর্বশেষ পঞ্চম দফা ৩১ মার্চ দেশের ৭৪টি উপজেলায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।