আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিতরাই আইনের লঙ্ঘন করে সীমাহীনভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে: টিআইবি

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)’র প্রধান নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, “বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে যেভাবে নাটকীয়তার মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয় তাকে আমি হাস্যকর বলে মনে করি না। আমি এটাকে একধরনের প্রতারণা বলব। একটি রাষ্ট্রীয় সংগঠনের পক্ষ থেকে বিশেষ করে যারা দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত তারা এভাবে আইনের লঙ্ঘন করে সীমাহীনভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে এবং তা মিথ্যাচারের মাধ্যমে অপপ্রচার করছে। বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক।”

রেডিও তেহরানের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ড. ইফতেখার এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, “আমাদের দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নতুন নয়। এর আগের চারদলীয় জোট সরকারের সময় হয়েছে, তারপরের সরকারের সময় হয়েছে এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ও এ ধরণের হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এবং এখনো ঘটছে। তবে সাম্প্রতিককালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড অবশ্যই একটা  উদ্বেগজনক জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে। আমি মনে করি মানুষের মৌলিক অধিকার এবং ন্যায় বিচার পাওয়ার যে অধিকার তা থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। আইনকে হাতে তুলে নিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে মেনে নেয়ার একটা মানসিকতা তৈরি হচ্ছে। আর সেটিকে  আবার সরকারের দায়িত্বশীল মহল থেকে অর্থাত মন্ত্রীরা যখন বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে প্রত্যাখ্যান করেন তখন বিষয়টি নিয়ে আমরা আরো বেশি হতাশার মধ্যে পড়ে যাই। এ অবস্থায় আমাদেরকে বিষয়টি শঙ্কিত করে যে আমরা কি গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতামুলক সরকার ব্যবস্থায় যাওয়ার পথে অগ্রসর হচ্ছি নাকি পেছনের দিকে যাচ্ছি! কাজেই  ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করি।”

এক প্রশ্নের জবাবে টিআইবি প্রধান বলেন, “প্রিজন-ভ্যান থেকে আসামি ছিনতাইয়ের ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা বিভাগের সক্ষমতা নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন উঠতে পারে। দেখুন এখানে কতগুলো বিষয় রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো বলে সরকারের পক্ষ থেকে যে কথা বলা হয় তার ব্যাখ্যা বিভিন্নভাবে হতে পারে। নির্বাচনের সময় বা নির্বাচনের আগে যেভাবে হরতাল অবরোধ, সহিংসতা, হত্যার ঘটনা ঘটেছে এবং জনজীবন বিপর্যস্ত হয়েছিল সেটা এখন নেই; সে অর্থে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো বলা চলে। তবে সেটাও চাপিয়ে দেয়া একধরনের শান্তিপূর্ণ অবস্থান বলে আমি মনে করি। এর পেছনে গণতান্ত্রিক ভিত্তি নেই। জনগণের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত সরকার হওয়ার কথা কিন্তু বাস্তবে এখানে সেটা নেই। আর এ কথাটি সরকারের উচ্চমহল থেকে একাধিকবার বলা হয়েছে। তারা বলেছেন সরকার জনগণের ম্যান্ডেট নিতে পারেনি। কাজেই দেশে যে শান্তি ও স্থিতিশীলতার কথা বলা হচ্ছে সেটিই জনগণের প্রত্যাশার বিষয় কিন্তু সেটি আসলে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া শান্তি শৃঙ্খলা।”

তিনি বলেন, “সরকারের যেসব প্রতিষ্ঠানের ওপর  শান্তি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করার দায়িত্ব এবং জনগণের অধিকার রক্ষা ও আইনের শাসন রক্ষার দায়িত্ব সেখানে তারা ক্রমাগতভাবে সাফল্যের ঘাটতি দেখাচ্ছেন। আর এজন্য যারা দায়ী তাদেরকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে না পারলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমাদের সমাজে আরো বাড়তেই থাকবে।”

আল কায়েদার ভিডিও বার্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আইমান আল-জাওয়াহেরির যে ভিডিও বা অডিও বার্তাটির কথা বলা হচ্ছে সে বিষয়টিকে কোনো অবস্থাতেই অবমূল্যায়ন করা ঠিক না।  এটাকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে এর ক্রেডিবিলিটি কতখানি রয়েছে তা গোয়েন্দার খুঁজে বের করতে হবে। আজকের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের যুগে এটি আসল নাকি নকল তা প্রমাণ করা খুবই সহজ বলে আমি মনে করি। তবে এ ধরনের একটা বিষয়কে গুরুত্ব না দেয়ার কোনো যুক্তি নেই বলে আমি মনে করি।  যারা এর পেছনে দায়ি তাদেরকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব সরকারের। এরপর তাদেরকে যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত।”

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “ বাংলাদেশের স্বাধীনতার গত ৪২ বছরে আমাদের মৌলিক মূল্যবোধের বিষয়গুলো এবং গণতান্ত্রিক চেতনার জায়গায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার সহবস্থান আছে। আর আমাদের আইডেনটিটির যে প্রকাশ তার মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে রাজনীতির ঊর্ধ্বে ধর্মের অবস্থান। এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেই আমাদের স্বাধীনতার চেতনা উজ্জীবিত। তাছাড়া সব ধর্মের সহবস্থান। আর এগুলোর সবই আমাদের সমাজে জোরালো অবস্থানে আছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে এর ওপর বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ এসেছে। আর সেই চ্যালেঞ্জ শুরু হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সহিংসতা থেকে। আর সেই সহিংসতা বর্তমানে নুতন রূপ নিয়েছে। আর সেখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, আমাদের জাতীয় আত্মপরিচয়ের বিরুদ্ধে ধর্মীয় পরিচয়টাকে রাজনীতিক বিবেচনায় নিয়ে এসে এক ধরনের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে। আর এটার জন্য আমাদের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল সবকিছুতে তাদের দলীয় এজেন্ডা প্রমোট করার প্রচেষ্টার বহিঃপ্রকাশ।”

তিনি বলেন, “যুদ্ধাপরাধের পক্ষের এবং বিপক্ষের  উভয় শক্তিই মূল ধারার রাজনীতিকে দলীয়করণ করে রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের  চেষ্টা চালাচ্ছে। যার ফলে আজকে অগণতান্ত্রিক শক্তি ও ধর্মভিত্তিক শক্তির উত্থান ঘটেছে। আর তাদেরকে সুযোগ করে দিয়েছে দুটো বড় রাজনৈতিক দল। আর এফলে আমাদের মূল্যবোধের জায়গাগুলো তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।