ব্যাপক অনিয়ম, সহিংসতা, কেন্দ্র দখল ও জালভোটের মহোৎসব, নিহত ১

উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের চতুর্থ দফার ভোটগ্রহণ ব্যাপক অনিয়ম, সহিংসতা, কেন্দ্র দখল ও জালভোটের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে । এখন চলছে ভোট গনণার কাজ।

নির্বাচনী সহিংসতায় মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া বালুয়াকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শামসুদ্দিন প্রধান (৪৫) নিহত হয়েছেন। এছাড়া, কেন্দ্র দখল, জাল ভোট, ব্যালট পেপার, ছিনতাই, পোলিং এজেন্টদের মারধরের ঘটনা ঘটেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ১৯৯১ সালের গণতান্ত্রিক নির্বাচনের যাত্রা শুরু হবার পর এবারই সবচেয়ে বেশি অনিয়মের মধ্যে ভোটগ্রহণ হয়েছে।

নির্বাচন চলাকালীন বিভিন্ন অভিযোগে ফেনীর সোনাগাজী, খুলনার তেরখাদা, পিরোজপুর সদর ও মঠবাড়িয়া, ভোলার তজুমদ্দিন ও মনপুরা, ঝালকাঠি সদর ও নলছিটি এবং বরিশালের আগৈলঝড়া উপজেলায় বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা ভোট বর্জন করেছেন। এছাড়া, কেন্দ্র দখল ও ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের কারণে বেশ কিছু কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন। তবে নতুন বার্তা ডটকমের স্থানীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জানা গেছে এ সংখ্যা আরো বেশি।

গজারিয়ায় নির্বাচনী সহিংসতায় ইউপি চেয়ারম্যান নিহত
মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচন চলাকালে আওয়ামী লীগ সমর্থিত দুই প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষে বালুয়াকান্দি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান শামছুদ্দিন প্রধান (৬৫) নিহত হয়েছেন। রোববার সকাল ১১টার দিকে বালুয়াকান্দি ড. আবদুল গাফাফার স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রের কাছে এ ঘটনা ঘটেছে।

জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তা সারোয়ার মোর্শেদ চৌধুরী জানান, চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আমিরুল ইসলাম ও বিদ্রোহী প্রার্থী রেফায়েত উল্লাহ খান তোতার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধলে শামছুদ্দিন প্রধানকে কুপিয়ে আহত করা হয়।পরে গজারিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

সিইসির উপজেলায় কেন্দ্র দখল, জালভোট
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিব উদ্দিন আহমেদের এলাকা চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে উপজেলা নির্বাচনে কেন্দ্র দখল, জাল ভোট ও বিরোধীদলের পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। সকালে প্রকাশ্যে জাল ভোট দিতে দেখা গেছে। ৫৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ৩৫টি কেন্দ্র দখল করে নিয়েছে সরকার সমর্থকরা। প্রিজাইডিং অফিসারদের অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন কেন্দ্রে সংঘর্ষ হয়েছে। বোমা ফাটিয়েছে দুর্বৃত্তরা। অনেকেই আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। টেলিভিশনে নির্বাচনের খবর যাতে দেখতে না পারে, সেজন্য সকাল থেকে এলাকায় ডিস সংযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

এ ঘটনায় নির্বাচন বর্জন করে পুনঃনির্বাচনের দাবিতে সোমবার সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৯ দলীয় জোট। জীবননগর উপজেলায় রোববারের নির্বাচন স্থগিত ও পুনঃনির্বাচনের দাবিতে এ কর্মসূচি দেয়া হয়েছে।

বরিশালের এক কেন্দ্রে ৩০ মিনিটে ১৮৭৮ ভোট!
বরিশালের আগৈলজাড়া বিএইচপি একাডেমি কেন্দ্রে ৩০ মিনিটের মধ্যে এক হাজার ৮৭৮ ভোট বালট বাক্সে জমা পড়েছে। কেন্দ্র দখল করে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর সমর্থকেরা এ ভোট দিয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠেছে। এই কেন্দ্রে মোট ভোটার দুই হাজার ৮৭৮ জন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, ওই কেন্দ্রে প্রতিটি বুথে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী গোলাম মোর্তুজা খানের সমর্থকেরা ব্যালট পেপারে সিল মেরে তা বাক্সে ভরছেন। এ সময় পোলিং অফিসারদের অনেকটা অসহায়ের মতো ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে দেখা যায়।’

এ ঘটনায় বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী এস এম আফজাল হোসেন সকাল ১০টায় আগৈলঝাড়া প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন স্থগিত ও পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। ভোট স্থগিত ও পুনর্নির্বাচনের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনে আবেদন জমা দিয়েছেন তিনি।

যশোরে ফিল্মি কায়দায় ভোটকেন্দ্র দখল ও সিল মারা
একেবারে ফিল্মি স্টাইলে ভোটকেন্দ্র দখলের ঘটনা ঘটেছে যশোরে। ভোটগ্রহণ শুরুর ঘণ্টাখানেকের মাথায় প্রথমে ককটেল ফাটিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে, পরে কেন্দ্র দখল করেছে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী শাহীন চাকলাদারের লোকজন।

সরেজমিনে দেখা যায়, নাজিরশংকরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের বাইরে কমপক্ষে ৫০ জনের জটলা। ভেতরে যশোর ছাত্রলীগের সভাপতি রিয়াদুল ইসলাম, শ্রমিক লীগের নেতা আজিজুল হক মিন্টু, একাধিক মামলার আসামি ‘বুনো আসাদ’-এর  নেতৃত্বে অন্তত ৫০ জন যুব ককেন্দ্র দখল করে সিল মারছেন। পুলিশকে অবশ্য অসহায়ভাবে বাঁশি বাজাতে দেখা গেছে। ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ঢুকে পাওয়া গেল ছেঁড়া ব্যালট পেপার।

বরুড়ায় অগ্রিম ভোট!
কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার ২০টি ভোটকেন্দ্রে শনিবার রাতেই ব্যালটে সিল মেরে বাক্সে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাত সাড়ে ১২টা থেকে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়ার লোকজন এ কাজ করেন বলে জানা গেছে।

রোববার সকাল সাড়ে আটটার দিকে পূর্ব নলুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ৮০০ ব্যালটে সিল মারা রয়েছে। প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ফখরুদ্দিন জানান, বেশ কিছু লোক রাত ১২টা থেকে দুইটার মধ্যে দুই দফা এসে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীর আনারস প্রতীকে সিল মারেন।

সকাল নয়টা ২০ মিনিটে উপজেলার বাগমারা পৌর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, চেয়ারম্যান প্রার্থীর এক হাজার ২০০ ব্যালট পেপার নেই। জানতে চাইলে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা গোপাল কৃষ্ণ চক্রবর্তী বলেন, গত রাতে তাকে জিম্মি করে চেয়ারম্যান প্রার্থীর এক হাজার ২০০ ব্যালট পেপার নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা।
এ সময় কেন্দ্রের সাতটি বুথ ঘুরে দেখা গেছে, ৫ নম্বর বুথে ১৮টি ভোট পড়েছে। বাকি বুথ ও বাক্সগুলো খালি।

সিলেটে জাল ভোটের উৎসব
সিলেট সদর উপজেলায় রোববারের নির্বাচনে ব্যাপক জালভোট হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সিলেট শহরতলীর মীরাপাড়ায় ছাত্রলীগ কর্মীরা কেন্দ্র দখল করে প্রায় এক ঘন্টা টেবিল কাস্ট করেছে বলে প্রতিপক্ষের প্রার্থীরা অভিযোগ করেছেন। ছাত্রলীগের তাণ্ডবের কারণে মীরাপাড়াস্থ আব্দুল লতিফ স্কুলকেন্দ্রে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ভোটগ্রহণ বন্ধ ছিল।

স্থানীয় সূত্র জানায়, সদর উপজেলায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আশফাক আহমদের সমর্থক ছাত্রলীগ কর্মীরা দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে কেন্দ্রের একটি বুথে ঢুকে প্রতিপক্ষ, বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী শাহ জামাল নুরুলের এক এজেন্টকে মারধর করে। এ সময় তারা অন্য বুথগুলোতে ঢুকে একই কায়দায় সকল এজেন্টকে বের করে দেয়ার চেষ্টা করে। ছাত্রলীগ কর্মীরা ওই কেন্দ্রের সবগুলো কক্ষে ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে টেবিল কাস্ট করে প্রায় আধা ঘণ্টা। কেন্দ্রে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় নারী ও পুরুষ ভোটাররা কেন্দ্র ছেড়ে চলে যান।

টাঙ্গাইলে প্রকাশ্যে সিল মারা
টাঙ্গাইলের কালীহাতি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে প্রকাশ্যে ব্যালটে ছিল দেওয়া, একজনের ভোট আরেকজনে দেওয়াসহ বিভিন্ন অনিয়মের ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে সহদেবপুর ইউনিয়নের খরশিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ কিছু সময়ের জন্য স্থগিত হয়ে যায়। পরে আবার ভোট শুরু হয়েছে।
সরেজমিনে টাঙ্গাইলের নাগবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র, হাসিনা চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্র ও আওলিয়াবাদের আলাউদ্দিন সিদ্দিক মহাবিদ্যালয় কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, এখানে ক্ষমতাসীন দলের চেয়ারম্যান প্রার্থী, ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থীর পক্ষে প্রকাশ্যে ব্যালটে সিল দেয়া হচ্ছে, একজনের ভোট আরেকজন দিচ্ছেন। এই তিন প্রার্থীর পক্ষে এজেন্টদের সামনেই ভোট দিতে বাধ্য করা হচ্ছে।

৯টি উপজেলায় ভোট বর্জন
এদিকে চতুর্থ দফায় ৯১ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে এখন পর্যন্ত বিএনপি ৯টি উপজেলায় ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে প্রার্থীরা। নির্বাচনে অনিয়ম, কারচুপি, হামলা, ভোটদানে বাধা এবং প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে এসব উপজেলায় ভোট বর্জনের ঘোষণা দেয় স্থানীয় বিএনপি।

বিএনপির বর্জন করা উপজেলাগুলো হলো: ফেনীর সোনাগাজী, ভোলার মনপুরা ও দৌলতখান, বরিশালের আগৈলঝাড়া, পিরোজপুরের সদর ও মঠবাড়িয়া, খুলনার তেরখাদা, ঝালকাঠির সদর ও নলছিটি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।