অপহরণ: এক অমীমাংসিত রহস্য

সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত বিভিন্ন অপহরণসংক্রান্ত ঘটনার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে অপহৃত ব্যক্তির ফিরে আসার পরেও অপহরণকারীদের শনাক্ত করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো। ফলে মীমাংসা না হওয়ায় সম্প্রতি সংঘটিত অপহরণের ঘটনাগুলোর রহস্য থেকে যাচ্ছে পর্দার আড়ালেই। বেশিরভাগ সময়েই অপহরণকারীরা দেশের বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার পরিচয়ে অপহরণের ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে।

দেখা গেছে, অপহৃত অবস্থা থেকে উদ্ধার হয়ে ফিরে আসার পর অপহরণের শিকার এই ব্যক্তিরা এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা তাদের অপহরণের বিষয়ে কোনো কথা বলতে চান না। কোনো এক অজানা কারণে হয় তারা পুরোপুরি চুপ থাকেন, না হয় অত্যন্ত কৌশলে বিষয়টিকে এড়িয়ে যান। অথচ পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীগুলোও এসব রহস্য সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যান এবং যাচ্ছেন।

সম্প্রতি সংঘটিত এসব অপহরণের ঘটনায় নিরাপত্তার অভাববোধ করে দেশের জনগণ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে এখন উদ্বেগ কাজ করছে এবং এরই মধ্যে এই বিষয়ে প্রতিবাদী কণ্ঠ তুলতেও শুরু করেছেন তারা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে তারা বলছেন, বিচারবহর্ভূত হত্যাকাণ্ডের পরিবর্তে বাহিনীগুলো এখন অপহরণের ঘটনা ঘটাচ্ছে।

অপহরণের পর উদ্ধার হওয়া মিরপুরের বাসিন্দা আব্দুল হাসনাত পলিন বলেন, “দয়া করুন আমাকে, আমার পরিবারের সঙ্গে শান্তিতে থাকতে চাই আমি। আমার অপহরণের বিষয়ে আমি কিছু বলবো না, আর সেসব দিনের কথা আমি বাকি জীবনে আর মনেও করতে চাই না।”

পেশায় ঠিকাদার পলিন গত ৯ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বিএএফ শাহীন স্কুলের সামনে থেকে অপহৃত হন এবং প্রায় আড়াই মাস পর গত ২০ এপ্রিল ফিরে আসেন।

কারা তাকে অপহরণ করেছিলেন, আর কিভাবেই বা তিনি ফিরে এলেন এই বিষয়েও কিছু জানাতে ও বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে পলিন বলেন, “শুধু সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলার জন্যই এখন আমি অন্য জায়গায় থাকছি। আমি অসুস্থ এবং বর্তমানে একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছি। আমি ওই ঘটনার বিষয়ে আর কোনো কথাই বলতে চাই না।”

মিরপুরে পলিনের বাড়িতে গেলে তার পরিবারের সদস্যরা জানান যে তিনি বাড়িতে নেই। কিন্তু তিনি কোথায় আছেন এ ব্যাপারেও কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানান তার পরিবারের সদস্যরা। এই রহস্যের সমাধান করার চাইতে বরং পলিনের নিরাপদে ফিরে আসায় এখন বিভিন্ন মসজিদ প্রার্থনা করে এবং মাজারগুলোতে এতিমদের খাবার বিলি করে দিন কাটানোর দিকেই বেশি উৎসাহ তার পরিবারের সদস্যদের।

পলিনের শ্বশুর মশিউর রহমান জানান, পলিন কেন অপহৃত হয়েছিলেন তা জানার কোনো আগ্রহ নেই তাদের। তিনি বলেন, “আমার মেয়ের জামাই যে নিরাপদে ফিরে এসেছে, আমরা তাতেই অনেক খুশি।”

একই রকম ঘটনার শিকার অর্থাৎ অপহৃত হওয়ার পর ফিরে এসেছেন এমন অন্তত তিনজন ব্যক্তি, তাদের সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল এবং কেনই বা তাদের অপহরণ করা হলো আর কেনই বা আবার ছেড়ে দেয়া হলো সেসব বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু জানাতে অস্বীকার করে, ঠিক পলিনের মতোই প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করেন।

এদের প্রত্যেকেই সাংবাদিকদের সবগুলো প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন এই বলে যে, যেহেতু অপহরণের সময় তাদের চোখ বেঁধে ফেলা হয়েছিল তাই কারা এই ঘটনার জন্য দায়ী তা অনুমান করতে পারছেন না তারা।

আরেকটি ঘটনায় একটি মুদি দোকানের সাবেক কর্মচারী মহিউদ্দিন আহাদ (২৬) দাবি করেন, মিরপুরে তার বাসা থেকে র‍্যাবের কয়েকজন সদস্য তাকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার পর ৬ মার্চ একটি মাইক্রোবাসে করে আবার তাকে মিরপুর ১০-এ নামিয়ে দিয়ে যান।

সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলার সময় পুরো ঘটনার আদ্যপান্ত বর্ণনা না করে বরং তা এড়িয়ে যান আহাদ, দাবি করেন- কারা তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল এই বিষয়ে কিছুই জানেন না তিনি। তিনি বলেন, “তারা আমাকে কেন তুলে নিয়ে গিয়েছিল এবং কেনই বা ছেড়ে দিয়েছিল তার কিছুই জানি না আমি।”

তিনি আরো বলেন, “যারা আমাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল তাদের মধ্যে অন্তত দু’জন ছিলেন যাদের পরনে ছিল র‍্যাবের সদস্যদের মতো কালো পোশাক। তারা আমার চোখ বেঁধে একটি ঘরে আমাকে আটকে রেখেছিল এবং আর কিছুই বলেনি আমাকে। যদিও সারাক্ষণই তারা হ্যান্ডকাফ পড়িয়ে রাখতো আমাকে, কিন্তু আমি নিশ্চিত না যে তারা আসলেই র‌্যাবের লোক কি না। তারা একটি মাইক্রোবাসে করে এনে আমাকে বিকাল ৪টার দিকে নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিল এবং বলেছিল পেছনে ফিরে না তাকাতে।”

আহাদের বাবা-মা জানান, ছেলেকে নিরাপদে ফিরে পেয়ে অত্যন্ত খুশি তারা। এখন কে বা কারা কেন তাকে অপহরণ করেছিল, সেসব জানায় কোনো আগ্রহ নেই তাদের।

দেশের খ্যাতনামা সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশবাসী আইনজীবী সংস্থা বেলা’র প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী পেশায় ব্যবসায়ী আবু বকর সিদ্দীক গত ১৬ এপ্রিল ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় তার নিজ কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার পথে একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসীর মাধ্যমে অপহৃত হন। অপহরণের প্রায় ৩০ ঘণ্টা পরে ১৭ এপ্রিল রাতে তাকেও একটি মাইক্রোবাসে করে এনে মিরপুর ১-এ ছেড়ে দেয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।

ঘটনাটি তার পরিবার ও আত্মীয়স্বজন তো বটেই, এমনকি পুরো দেশবাসীকে নাড়িয়ে দিলেও এখনো অপহরণকারীদের হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এমনকি যে গাড়িটিতে করে সিদ্দীককে অপহরণ করা হয়েছিল, সেটিও খুঁজে বের করতে পারেনি তারা।

রিজওয়ানার স্বামীকে অপহরণের পর দ্রুততর সময়ের মধ্যে পুলিশের প্রধান কার্যালয়ে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং নারায়ণগঞ্জ পুলিশও ১২ সদস্য বিশিষ্ট আরেকটি কমিটি গঠন করে। কিন্তু এতোকিছুর পরে এখনো পর্যন্ত তদন্তে কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি পুলিশ।

সিদ্দীকের মুক্তি পাওয়ার পর পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেছিলেন, ওই অপহরণের রহস্যের জট ছাড়াতে তারা তদন্তের কাজ অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাবেন।

সিদ্দীক জানিয়েছিলেন যে তিনি ‘অপরাধীদের’ চিনতে পারেননি এবং কারা আর কেন তাকে অপহরণ করেছিল তাও জানেন না তিনি।

সিদ্দীকের স্ত্রী রিজওয়ানা হাসান জানান, তার স্বামী নিজের কোনো ব্যক্তিগত কিংবা ব্যবসায়িক কারণে অপহৃত হননি। বরং কর্মক্ষেত্রে রিজওয়ানার সঙ্গে বৈরী সম্পর্কের কারণে স্বামী সিদ্দীককে অপহরণ করা হয়ে থাকতে পারে বলেও তার সন্দেহের কথা জানান তিনি।

তিনি আরো জানান, অপহরণকারীরা অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিল।

নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম জানান, এই বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং তদন্তে কোনো অগ্রগতি হলেই তারা জানাবেন।

এই তিন ব্যক্তি- পলিন, আহাদ এবং সিদ্দীক- অপহরণের পর এদের প্রত্যেককেই মিরপুরে নিয়ে এসে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এসব ঘটনার বিষয়ে ন্যূনতম তথ্যও দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা।

মিরপুর বিভাগীয় পুলিশের উপ-কমিশনার ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, “পলিন, আহাদ ও সিদ্দীককে মিরপুরে এনে নামিয়ে দেয়ায় এসব অপহরণের ঘটনার পেছনের রহস্য সমাধানে এখনো তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি আমরা। তাদের ছাড়া পাওয়ার পরবর্তীতে কী কী ঘটেছে, না ঘটেছে তা নিয়েও অনুসন্ধান করছি। কিন্তু এখনো কোনো বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি।”

র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এটিএম হাবিবুর রহমান জানান, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপহরণের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার ও স্বজনরা নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে আঙুল তুলছেন। কিন্তু বেশ কয়েকজন অপহৃত ব্যক্তি যখন ফেরত এসেছেন, তারপর থেকে তাদের কেউই আর বলেননি যে র‍্যাবই তাদের অপহরণ করেছিল।

তিনি বলেন, “এর মানে একটাই, এই ধরনের অবৈধ কাজের সঙ্গে র‌্যাব জড়িত নয়। র‌্যাব সবসময়েই ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করার চেষ্টা করে।”

এসব অপহরণের ঘটনার রহস্য মীমাংসায় তারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও জানান তিনি। সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।