সারা দেশে ২৪ ঘণ্টায় ১২ জন গুম

একের পর এক গুম-অপহরণের ঘটনায় সারা দেশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের দিয়ে শুরু হলেও সরকারি দলের নেতাদের নামও এখন অপহৃতদের তালিকায় যোগ হচ্ছে। বাদ পড়ছেন না ব্যবসায়ীরাও। কিন্তু সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে এমন কোনো ঘটনাই ঘটছে না। পুলিশ প্রশাসনও বলছে এটি স্বাভাবিক। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

রোববার দুপুর থেকে ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে অন্তত ১২ জন অপহরণ হয়েছেন। এদের কারো সন্ধান এখনো মেলেনি। জিডি ও মামলা-মোকদ্দমা নিয়ে র‌্যাব-পুলিশের দফতরে দৌড়াচ্ছেন অপহৃতদের স্বজনরা। ২৪ ঘণ্টা পরও এসব ঘটনার কূল-কিনারা করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

দেশের এমন পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল দাবি করেছেন “দেশে কোনো গুম বা হত্যা হয় না। যাদের গুম করা হয়েছে বলে বিএনপি অভিযোগ করছে, তারা আইনের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। ” তিনি বলেছেন, “এখন দেশে কোনো দুর্নীতি নেই, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নেই, চাঁদাবাজি-রাহাজানি নেই।”

রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর ভাষানটেক থানার কৃষকলীগ কার্যালয়ের সামনে এক সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

সবশেষ সোমবার ভোরে ময়মনসিংহের ভালুকায় দুই শিক্ষককে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। উপজেলার পাঁচগাও গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে একদল অস্ত্রধারী হাতকড়া পরিয়ে তাদের তুলে নিয়ে যায়। অপহৃতরা হলেন স্থানীয় গণজাগরণ টিউটিরিয়াল কোচিং সেন্টারের প্রধান শিক্ষক কামাল হোসেন সবুজ (৩৫) ও একই প্রতিষ্ঠানের সহকারী শিক্ষক আবু বকর সিদ্দিক স্বপন (২৮)।

একই সময়ে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলা থেকে অপহরণ হয়েছেন দুই ভাই। তারা হলেন কেদারী চন্দ্র সরকার (৬০) ও তার ছোট ভাই ঝিলমোহন চন্দ্র সরকার (৫৫)। তাদের বাড়ি কালিয়াকৈর উপজেলার সূত্রাপুর এলাকায় মাধাই চন্দ্র সরকারের ছেলে।

রোববার নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের দুই নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা নজরুল ইসলামসহ পাঁচজন অপহৃত হয়েছেন।  নারায়ণগঞ্জে আরেক ঘটনায় আদালতপাড়া থেকে এক আইনজীবী ও তার গাড়িচালককে অপহরণ করা হয়েছে।

জানা যায়, দুপুরে আওয়ামী লীগ নেতা নজরুল ইসলাম নারায়ণগঞ্জের আদালত থেকে একটি মামলায় জামিন নিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ ফিরছিলেন। তার সঙ্গে প্রাইভেটকারে ছিলেন তিন সহযোগী ও ড্রাইভার। রওনা হওয়ার কিছুক্ষণ পরই তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তারা অপহরণ হয়েছেন বলে নিশ্চিত হন স্বজনরা। পরে পরিত্যক্ত অবস্থায় তাদের ব্যবহৃত গাড়ি উদ্ধার হয় গাজীপুরে। সেখান থেকে নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীরের ড্রাইভিং লাইসেন্স, একজন মহিলার জাতীয় পরিচয়পত্র এবং একজন পুলিশ পরিদর্শকের ভিজিটিং কার্ড উদ্ধার করা হয়।

পাঁচজনের অপহরণের রেশ না কাটতেই নারায়ণগঞ্জ বারের আইনজীবী চন্দন সরকার (৬০) ও তার গাড়ি চালক অপহৃত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। দুপুরের পর থেকে তাদের খোঁজ নেই। রাতে এ ব্যাপারে নিখোঁজ আইনজীবীর ভাতিজা অরুনাভ সরকার পান্না ফতুল্লা থানায় জিডি করেছেন। জানা যায়, দুপুর দুইটার দিকে নারায়ণগঞ্জের আদালতপাড়া থেকে নিজের প্রাইভেটকারে চড়ে (ঢাকা মেট্রো গ-২৭-৩৩৩৭) বের হন অ্যাডভোকেট চন্দন সরকার। এরপর থেকে চালকসহ তার কোনো খোঁজ নেই।

ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলার শুভাড্যা ইউনিয়নের পারগেন্ডারিয়া গ্রামের রিন্টু (২৪) নামের এক আওয়ামী লীগ কর্মী খোঁজ মিলছে না রোববার দুপুর থেকে।

রিন্টুর বড় বোন শিল্পী জানান, এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ দক্ষিণ থানায় মামলা হয়েছে। সোমবার দুপুরে পুলিশ জানিয়েছে রিন্টুর মোবাইল ট্র্যাকিং করে কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া এলাকায় তার অবস্থান সনাক্ত করা হয়েছে। কিন্তু সোমবার বিকেল পর্যন্ত তাকে উদ্ধার করতে পারেনি।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য মতে, ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে ২৬৮ জন অপহৃত হন। এর মধ্যে ৪৩ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। অপহরণের পর ২৪ জনকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। অপহরণের পর পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে ১৪ জনকে। কিন্তু ১৮৭ জনের এখন পর্যন্ত কোনো খোঁজ নেই।

গুম ও অপহরণ নিয়ে সরকারের অবস্থানের সমালোচনা করেছেন খোদ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিনি বলেন, “সম্প্রতি এটি সীমা অতিক্রম করেছে।আমাদের সরকারের সামনে দুটি চ্যালেঞ্জ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা। অপহরণ গুম ও বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা রয়েছে তাদের চক্রকে খুঁজে বের করতে হবে।”

গত ১৬ এপ্রিল দুপুরে নারায়ণগঞ্জ থেকে বেলা’র প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী এ বি সিদ্দিক অপহৃত হন। বিষয়টি নিয়ে সারা দেশে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হলে অপহরণের একদিন পর রাত সাড়ে ১১টার দিকে অপহরণকারীরা তাকে রাজধানীর মিরপুরে চোখ বাঁধা অবস্থায় মাইক্রোবাস থেকে নামিয়ে দিয়ে যায়। ১২ দিন পেরিয়ে গেলেও এ ঘটনার রহস্য উন্মোচন করতে পারেনি পুলিশ।

রিজওয়ানা হাসান সোমবার বলেন, “অপহরণের ঘটনা খুবই দুঃখজনক। একটি সুষ্ঠু স্বাভাবিক সমাজে গুম-অপহরণের মতো ঘটনা থাকতে পারে না। অপহৃত ব্যক্তি যেই হোক তাকে উদ্ধার করার দায়িত্ব সরকারের। একই সঙ্গে দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে এসব ঘটনার রহস্য বের করা দরকার।”

পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজি) হাসান মাহমুদ খন্দকার সোমবার একটি দৈনিকে বলেন, “অতীতে অপহরণ হয়েছে। সব সময় হচ্ছে। এসব অপহরণের ঘটনা গুরুত্ব সহকারে র্যা ব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা মনিটর করছে। উদ্ধার ও জড়িতদের গ্রেফতার করে আসছে। পুলিশ যদি ওই সব কোন অপহরণের সঙ্গে জড়িত থাকে তা হলে প্রমাণ সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।” অপহরণ নিয়ে আতংকিত হওয়ার কোন কারণ নেই বলে আইজি জানান।

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, “অতীতে দেশে অপহরণ ও গুমের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিরোধে বিশেষ অপারেশনসহ নানা ধরনের অভিযান হয়েছে। এখনও অপহরণ হচ্ছে। আগের তুলনায় অনেক কম। এ নিয়ে আতংকিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।