বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশ-ভারত পানিবণ্টন সমস্যার মীমাংসা?

ভারতে চলমান লোক সভা নির্বাচনে জয়লাভ করে দিল্লির ক্ষমতা হাতে পাওয়ার মাধ্যমে বিজেপি ভারতের পরবর্তী সরকার গঠন করবে বলে আশা করছেন বাংলাদেশী জনগণের একটি অংশ, তাদের আশা- এতে প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের পানিবণ্টন সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান হবে এবং সহজেই তিস্তা ও মহানন্দা নদী থেকে দুই দেশ যার যার প্রাপ্য পানি পাবে।

ভারতের প্রভাবশালী পত্রিকা ইন্ডিয়ান টাইমসের সহযোগী দৈনিক ইকোনমিক টাইমসে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে একথা বলা হয়েছে।

দুই দেশের মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে চুক্তির পরেও এখনো বাংলাদেশ-ভারত অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির তীব্র আপত্তির মুখেই মূলত এই সমস্যার সমাধান এখনো আটকে আছে। অভিন্ন এই নদীগুলো তার দায়িত্বাধীন রাজ্য কলকাতা হয়েই বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

এই সংকটের সন্ধিস্থলেই বাংলাদেশের পানি নিয়ে আন্দোলনকারীদের কাছে নতুন আশার নাম হয়ে উঠেছে বিজেপি।

ন্যায্য পানির হিস্যা পাওয়ার দাবিতে আন্দোলনরত এক বাংলাদেশী কর্মী বলেন, “বিজেপি সভাপতি রাজনাথ সিং ব্রক্ষ্মপুত্রের পানিবণ্টন ইস্যুতে অনেকবার তীব্র আওয়াজ তুলেছেন। চীন থেকে প্রবাহিত ব্রক্ষ্মপুত্রের পানির ভৌগোলিকভাবেই দাবিদার বাংলাদেশও, আর তাই তিনি চান বাংলাদেশ এবং ভারতের এই সমস্যার যেন অবিলম্বে একটি সমাধান হয়। তাই আমরা বিশ্বাস করি যে তিনি এবং তার দল তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়েও একইভাবে ইতিবাচক দৃষ্টি দেবেন।”

বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি রাহুল সিনহার কণ্ঠেও ইকোনমিক টাইমসের সঙ্গে কথা বলার সময়ে একইরকম প্রতিধ্বনি পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, “এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং এর সমস্যার একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।”

এরই মধ্যে তিস্তা ও মহানন্দা ইস্যু বাংলাদেশে বেশ আলোড়িত হচ্ছে। এই দুটি নদীই ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে পশ্চিমবঙ্গের গজলডোবা এবং ফুলবাড়ি বাঁধ হয়ে যেখানে ইতিমধ্যে ভারতের অন্যতম প্রধান ও কেন্দ্রীয় নদীশাসন প্রকল্প হিসেবে তিস্তা বাঁধ সেচ প্রকল্পের (টিবিপি) কাজ শুরু হয়েছে।

পানি আন্দোলনকর্মীদের দাবি- “টিবিপি প্রকল্পের ক্ষেত্রে ভারত সবসময়েই বাঁধের মাধ্যমে তিস্তা এবং মহানন্দার সিংহভাগ পানি নিজেদের কাছে রেখে দিয়ে বাংলাদেশকে শুষ্ক অঞ্চলে পরিণত করেছে। শুধু এই একটি কারণেই বাংলাদেশের এক রংপুরই নিজেদের সাড়ে সাত লাখ হেক্টর উর্বর কৃষি জমি হারিয়েছে।”

ইন্দো-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের বাংলাদেশের সদস্য টিএ খানের মতে, ৪০ বছরের গড় পানিপ্রবাহ সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা ভারতের জন্য বাধ্যমূলক হলেও তারা তা করেনি। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- এর ফলে “বাংলাদেশের নদীগুলোতে ২৪ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত পানিপ্রবাহ থাকলেও ১৯৭১ সালের পর থেকে কমতে কমতে এখন তা এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র তিন হাজার ৮০০ কিলোমিটারে।”

উত্তরবঙ্গ বন্যা নিয়ন্ত্রণ কমিশনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারত চায় বাংলাদেশের দিকে প্রবাহমান তিস্তার পানির ৫০ শতাংশ নিজেদের কাছে রাখতে, ৪০ শতাংশ বাংলাদেশকে দিতে এবং বাকি ১০ শতাংশ নদীতেই রাখতে। কিন্তু বাংলাদেশের দাবি- বণ্টনযোগ্য পানির এই অনুপাত করতে হবে ৪০ শতাংশ, ৪০ শতাংশ এবং ২০ শতাংশ করে।

মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্য দিয়ে অভিন্ন ৫৪টি নদী প্রবাহিত হলেও দেশ দুটির মধ্যে শুধু গঙ্গার পানি নিয়েই পানিবণ্টন চুক্তি রয়েছে।

ফারাক্কা বাঁধ কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানান, উভয়পক্ষের সম্মতিতে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী ফারাক্কার মাধ্যমেই সবসময়ে গঙ্গার পানিবণ্টন হয়ে এসেছে। কিন্তু ইন্দো-বাংলা গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি ১৯৯৬-তে এটা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা নেই যে ভারত গঙ্গার কী পরিমাণ পানি ব্যবহার করতে পারবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।