টিকিট সিন্ডিকেট: হাব-আটাব দ্বন্দ্বে হজযাত্রীদের দুর্ভোগের শঙ্কা

টিকিট বিক্রিতে সৌদি এয়ারলাইন্সের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তাদের অনলাইন সিস্টেম ব্লক করে আসন্ন হজের বিমান টিকিটের বেশিরভাগ সিন্ডিকেট করে বিক্রি হচ্ছে। মূলত চার-পাঁচটি নির্দিষ্ট ট্রাভেল এজেন্সিকে সুবিধা দিতে ওমরার ৮০ ভাগ টিকেট এভাবে বিক্রি হচ্ছে। এ নিয়ে হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব) ও অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্সি অব বাংলাদেশের (আটাব) দ্বন্দ্ব এখন তুঙ্গে। ফলে সংগঠন দুটির নেতাদের একচেটিয়া টিকিট বাণিজ্যের লালসা ও দ্বন্দ্বে প্রতিবছরের মতো এবারও সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হতে পারেন হজযাত্রীরা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, হজ ও ওমরাহ যাত্রীদের কাছে সৌদি এয়ারলাইন্স পছন্দের তালিকায় প্রথমে থাকে। ২০১২ সাল থেকে থার্ড ক্যারিয়ার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ বিমান ও সৌদি এয়ারলাইন্স ভাগাভাগি করে হজযাত্রীদের বহন করে। এ সুযোগেই প্রতি বছর সৌদি এয়ারের টিকিট নিয়ে সৃষ্টি হয় শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেট টিকিট প্রতি পাঁচ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি আদায় করে। এতে হজযাত্রীরা ভোগান্তির শিকার হন। এর মধ্যে ২০০৪ সালে হজের নামে সৌদিতে রোহিঙ্গা পাঠানোর অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া বর্তমান আটাব সভাপতি মঞ্জুর মোর্শেদ মাহবুবের মালিকানাধীন সুরেশ্বর ট্রাভেল অন্যতম। যদিও তার কাছেই এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ করেছেন সারাদেশের শতাধিক ট্রাভেল এজেন্ট মালিক।

২০১২ সৌদিয়ার হজ কো-অর্ডিনেটর ইফতেখার আহম্মদ ওমর খৈয়াম-এর আশীর্বাদে সুরেশ্বর ট্রাভেলস একাই সাত হাজার ৮৬০টি হজ টিকিট কালোবাজারে বিক্রি করে সিন্ডিকেট চক্রে প্রধান হয়েছিল। তখন সৌদিয়ার তৎকালীন কান্ট্রি ম্যানেজার আব্দুর রহমান আল হারান্ডা’র সঙ্গে আঁতাত করে শীর্ষ ১০-এর মধ্যে এক নম্বর হয় ওই এজেন্সি। এবারও আসন্ন হজে সর্বোচ্চ টিকিট বিক্রি করতে ওমরার টিকেট বিক্রির ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই শীর্ষ পাঁচ-এ রয়েছে সুরেশ্বর ট্রাভেলস। ওই বছর মাত্র আট-নয়টি এজেন্সি  প্রায় ৪১ হাজার হজ টিকিট বিক্রির সুযোগ লাভ করে।

একইভাবে বর্তমানে হাব নেতা সায়েম মোহাম্মদ হাসানের মালিকাধীন আল গাজী ট্র্যাভেলসের বিরুদ্ধেও রয়েছে একই রকম অভিযোগ। এ নিয়ে হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব) ও অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্সি অব বাংলাদেশের (আটাব) নেতারা একে অন্যের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন।

এ ব্যাপারে আটাব সভাপতি এসএন মঞ্জুর মোর্শেদ মাহবুব নতুন বার্তা ডটকমকে বলেন, “সৌদিয়া এয়ারলাইন্স ওমরা ও হজ টিকিট গ্রুপ ফেয়ারের মাধ্যমে বিক্রি করার কারণেই টিকিট নিয়ে সিন্ডিকেট তৈরি হচ্ছে। কালোবাজারে টিকিট বিক্রি বন্ধ করতে হলে গ্রুপ ফেয়ারের মাধ্যমে টিকিট বিক্রি বন্ধ করতে হবে।”

কোনো এয়ারলাইন্সের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, “ওমরা ও হজ টিকিট বিক্রয়ে একটি স্বচ্ছতা তৈরি হওয়ার লক্ষ্যেই আমরা গ্রুপ ফেয়ারের মাধ্যমে টিকিট বিতরণের পরিবর্তে আগে এলে আগে পাবেন ভিত্তিতে টিকিট সেল করার অনুরোধ জানাচ্ছি।”

নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পর্কে মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, “শুধু এক বছরের দুর্নীতি নিয়ে কেন, তার আগে পরের দুর্নীতিরও খোঁজ নেন।”

সম্প্রতি চট্টগ্রামের আটাব জোনের সভাপতি আবু তাহেরের নেতৃত্বে ৪৪টি ট্রাভেল এজেন্ট আটাবে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছে। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ওমরা টিকিট ক্রয়ে আমরা একটি সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছি। দুই হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা অতিরিক্ত দিয়ে প্রতিবছর হজ ও ওমরা টিকিট কিনতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, আয়টাভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও অনলাইনে আমরা সৌদিয়ার ওমরা টিকিট পাচ্ছি না। এয়ার এরাবিয়া ও ফ্লাই দুবাইও টিকিট বিক্রি নিয়ে অনিয়ম করছে। এসব এয়ারলাইন্সের দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধের দাবিতে চট্টগ্রামে এয়ারলাইন্সের অফিস দুটিতে লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়েছে।

হজ এজেন্সির মালিকদের একটি সূত্র জানায়, হজযাত্রী পরিবহনে থার্ড ক্যারিয়ার বন্ধ করে মাত্র দুটি এয়ারলাইন্স চালু থাকায় হজ ও ওমরা টিকিট প্রতি বছর কালোবাজারে চড়া দামে বিক্রি হয়। এবারও সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের ওমরা টিকেটের প্রায় ৮০ ভাগই অনলাইন সিস্টেমে ব্ল¬ক করে কৌশলে পাঁচ-ছয়টি চিহ্নিত ট্রাভেল এজেন্সিকে দিয়ে তাদের সেলসের দিক থেকে টপ লিস্টে দেখানো হচ্ছে। এভাবে আসন্ন হজের টিকিট সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এসব অনিয়মে সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের হজ কো-অর্ডিনেটর লাবনী হাসনা চৌধুরীর বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের ওমরা টিকিট নিয়ে কোনো সিন্ডিকেট হচ্ছে না। ওমরা টিকিট নিয়ে কোনো সিন্ডিকেটের অভিযোগ আমরা পাইনি। তবে গ্রুপ ফেয়ার সিস্টেমে টিকিট বিক্রির প্রক্রিয়া চালু আছে। কারণ, গ্রুপের টিকিটের ভাড়া কম।

চার-পাঁচটি এজেন্সির কাছে ওমরা টিকিট বিক্রির অভিযোগ সঠিক নয় দাবি করে তিনি বলেন, টিকিট ক্রয়ের অনলাইন সবার জন্যই ওপেন আছে। সিট বিতরণ করেন সৌদীয়ার কান্ট্রি ম্যানেজার। আমরা শুধু কর্তৃপক্ষের হুকুম পালন করি।

হাব সভাপতি মো. ইব্রাহিম বাহার বলেন, সৌদিয়া এয়ারলাইন্স প্রতি বছরই তাদের নিয়ম অনুযায়ী ওমরা ও হজ টিকিট বিক্রি করছে। তিনি বলেন, ওমরা টিকিট বিক্রি প্রক্রিয়া দেখে এখনো বলতে পারছি না সৌদিয়ার হজ টিকিট সিন্ডিকেট প্রভাবমুক্ত হবে কি না। তিনি হজযাত্রীদের সুবিধার্থে এবং টিকিট নিয়ে সিন্ডিকেট বন্ধে অবিলম্বে থার্ড ক্যারিয়ার চালুর জোর দাবি জানান।

অবশ্য এ বছর সৌদি এয়ারের ওমরাহ টিকিট নিয়ে অনিয়মের কোনো অভিযোগ হাবের কাছে আসেনি উল্লেখ করে সংগঠনের মহাসচিব শেখ আব্দুল্লাহ বলেন, থার্ড ক্যারিয়ার ওপেন থাকলে টিকিট নিয়ে অভিযোগ ওঠার সুযোগ থাকত না। এর আগে টিকিট কালোবাজারির অভিযোগ দুদক পর্যন্ত গড়িয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।