আমার কী! চাইলেই দিয়ে দেবো, আপনারা কি চান?

আপনারা কি নির্বাচন চান? আবার জ্বালাও-পোড়াও দেখতে চান? আপনারা চাইলেই দিয়ে দেবো। আমার কী!মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এভাবেই তার অবস্থান তুলে ধরেছেন।

তিনি আরো বলেন, ‘আপনারা কি আবারো ২০০১-০৬ সালের সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদে ফিরে যেতে চান। এছাড়া আগাম নির্বাচন দিলে তারা (বিএনপিসহ বর্জন করা দলসমূহ) যে আসবে তার নিশ্চয়তা কী? কেন তাদের এ কনফিডেন্স নেই?’

বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে কারা?
গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বৈধতা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কে, কারা বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে? তাদের বৈধতাটি কী ছিল? যে দলটা (বিএনপি) বেশি সোচ্চার তাদের জন্মপরিচয় কী?’

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর খুনি মোশতাকের হাতে জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান হন। বিচারপতি সায়েমকে অস্ত্র ঠেকিয়ে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। মিলিটারি ডিক্টেটর হয়ে ক্ষমতা দখল করার কোনো বৈধতা ছিল? তার হাতেই বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হয়। বৈধতার প্রশ্ন তাদের জন্মেই রয়েছে।’

শেখ হাসিনা বলেন, কোনো দল যদি নির্বাচন না করে সেটা তাদের সিদ্ধান্ত। তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর দায় কে নেবে? ভুলের খেসারত ওই নেতাকে দিতে হবে। জনগণ কেন জিম্মি হবে?’

বিএনপির নির্বাচন বর্জনের আন্দোলনে মানুষ সাড়া দেয়নি দাবি করে তিনি বলেন, আন্দোলনের নামে মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল। গাড়িতে আগুন দিয়ে অবলা গরু পর্যন্ত মারা হয়েছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচন ঠেকিয়ে কী আনতো? মিলিটারি রুল? তাদেরকে হয়তো কেউ কেই এমন পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু সফল হয়নি।’

নির্বাচনে ৪০ ভাগের ওপর ভোট পড়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘অনেক উন্নত দেশে ৫০ শতাংশ কেবল ভোটারই হয়। আর ভোট দেয় অর্ধেক। এখানে তো ৪০ ভাগের বেশি ভোট পড়েছে। তাহলে বৈধতার প্রশ্ন আসবে কেন?’

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘আমাদের দলে শৃঙ্খলা আছে বলে একক প্রার্থী দিতে পেরেছি। দুজন করে প্রার্থী দিয়ে নিজেরাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হতে পারতাম, তাহলে এখন প্রশ্ন উঠতো না। এছাড়া বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ের বিষয়টি আইনে আছে। বৈধতা নিয়ে যারা প্রশ্ন তোলেন তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেই পারতেন।’

এ সময় নির্বাচন সম্পন্ন করার সফলতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মূল ফ্যাক্টর- পুলিশ, প্রশাসন ও সেনাবাহিনী গণতন্ত্রের পক্ষে ছিল, যার কারণে আমরা নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে পেরেছি।’

 

যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে অস্থির হওয়ার কিছু নেই
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে ‘স্থবিরতা’ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা এ বিচার শুরু করেছি, রায় কার্যকর হচ্ছে। অস্থির হওয়ার কিছু নেই, যেটা শুরু করেছি সেটা শেষ করবো।’

এ সময় তিনি বলেন, ‘কাদের মোল্লাকে ফাঁসি না দিতে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি এবং জাতিসংঘ মহাসচিব বান-কি মুন নিজে ফোন করেছেন। দেশে এমন কে আছে যে এ ধরনের ফোন পেলে রায় কার্যকর করে?’

জামায়াত নিষিদ্ধের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন কেন এতো হইচই, যখন জামায়াতকে রাজনীতি করার সুযোগ দেয়া হলো তখন কেন কোনো কথা বলা হলো না।’

তিনি বলেন, ‘সুপ্রিমকোর্টে এনিয়ে একটা কেস পেন্ডিং রয়েছে। এটা শেষ হওয়ার আগে আরেকটা কেস নিয়ে কেন অস্থিরতা। আইনমন্ত্রী যেটা বলেছেন এনিয়ে বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ নেই।’

ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকবে
ভারতে মোদি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক বিষয়ে এক প্রশ্নে শেখ হাসিনা বলেন, ‘অতীতে ভারতের সব সরকারের সঙ্গে কাজ করেছি। সুসম্পর্ক রেখেই কাজ করেছি। গঙ্গা চুক্তি হয়েছে। সীমান্ত চুক্তি ও ছিটমহল আলোচনা একটি পর্যায়ে আছে।’

মোদির সঙ্গে কাজ করতে অসুবিধা হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিগত দুই মেয়াদে ভারতের পাঁচজন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করেছি। আশা করছি, মোদি সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করতে পারবো।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছি। আশা করছি, তিনি বাংলাদেশে বেড়াতে আসবেন। আর আমিও ভারত সফরে যাবো। সমস্যা ও সম্ভাবনা যাই থাকুক প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক তো রাখতেই হবে।’

উনিই পঁচে গেছেন
সরকারকে পঁচতে সময় দিয়েছি- বিএনপি চেয়ারপরাস বেগম খালেদা জিয়ার এমন বক্তব্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পঁচল কে? নির্বাচন না করে উনিই পঁচে যাচ্ছেন, ফরমালিন দিয়ে তাজা রাখা হচ্ছে।’ অনেকটা হাসিমুখে তিনি বলেন, ‘এখন বিএনপিকেই ফরমালিন দিয়ে তাজা রাখতে হচ্ছে।’

র‌্যাব বিলুপ্তি নয়
র‌্যাব বিলুপ্তির সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘র‌্যাব এখন একটা বাস্তবতা। এটি একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এখন র‌্যাব বিলুপ্ত করা সম্ভব নয়। তখন (র‌্যাব গঠনের সময়) আমার কথা শুনলে আজ এ অবস্থা হতো না।’

এ সময় বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘ক্ষমতায় এসে বিএনপি অপারেশন ক্লিন হার্টের পর র‌্যাব গঠন করলো। রক্ষীবাহিনীকে যারা গালি দিতো তারাই র‌্যাব করলো। যখন ২০০৪-০৫ সালে এক বছরে একহাজার খুন করা হলো, তখন তো আওয়াজ আসে নাই।’

আত্মসমর্পণ করতে বলা অপরাধ নয়
নারায়ণগঞ্জের সাত খুনে আওয়ামী লীগ এমপি শামীম ওসমানের নাম আসা প্রসঙ্গে দলটির সভানেত্রী বলেন, ‘ফোনে কাউকে আত্মসমর্পণ করতে বলা তো অপরাধ নয়। তাছাড়া পত্রিকায় আসা ওই ফোনালাপের সত্যতা কতটুকু?’

তিনি বলেন, ‘নূর হোসেন একসময় বিএনপি করতো। সে মূলতঃ সব সময় সরকারি দল। এছাড়া নূর হোসেন এভাবে পালিয়ে গেল, কিন্তু এতো সাংবাদিক, অথচ কেন তারা তাকে ধরতে পারল না?’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘ফেনীর হত্যাকাণ্ডে বিএনপিসহ আমাদের দলের কিছু লোকজনও জড়িত। যে দলের হোক আমরা অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি বিধান করবো। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।’

হাইকোর্ট বেঞ্চ আদেশ দিলে আমাদের আর দায়িত্ব কী
এ সময় নারায়ণগঞ্জের সাত গুম-খুনের ঘটনায় তিন র‌্যাব কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চের দেয়া আদেশে দৃশ্যতঃ ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘যখন আমরা বিষয়টি তদন্ত করছি, তখন ওই বেঞ্চ তাদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিল। তাহলে আমাদের কাজ কী? নিশ্চিয়ই তাদের কাছে ভালো সাক্ষ্য-প্রমাণ আছে। এখন তারাই এর বিচার করুক।’

জাপান সফর অত্যন্ত ফলপ্রসূ
জাপান সফর অত্যান্ত ফলপ্রসূ হয়েছে দাবি করে প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এ সফরে দুদেশের সম্পর্কের মধ্যে নতুনমাত্র পেয়েছে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরো এগিয়ে নিতে দুদেশ একমত হয়েছে।

জাপানকে পরীক্ষিত বন্ধু আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, জাপান অবকাঠামো ও মানবসম্পদসহ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ভবিষ্যতে তা আরো জোরদার হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, জাপান বাংলাদেশকে ছয়শ’ বিলিয়ন ইয়েন অর্থ-সহায়তা দেবে। বিভিন্ন প্রকল্পে এ অর্থ বিনিয়োগ করা হবে। প্রকল্পগুলো নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সব সময় জাপানকে পাশে পেয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছি। শিগগিরই তিনি বাংলাদেশ সফরে আসবেন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাপান সফরের পর শিগগিরই আমি চীন যাচ্ছি। এশিয়ান জায়ান্টদের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা আমাদের অন্যতম লক্ষ্য। সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’ প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের অর্জন নিয়ে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে বেশ কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা উপস্থিত ছিলেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।