ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে বাড়াবাড়ি!

ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে উচ্ছ্বাস বিগত বছরগুলোর মতোই। তবে কোনো কোনো েেত্র তা মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। পাড়া-মহলা, উচু দালান, খুঁটি বা স্তম্ভ এর উপর লাগানো হচ্ছে বিভিন্ন দেশের পতাকা। দেশের সংশিষ্ট আইনের ব্যাপারে অসচেতন লোকজন পতাকা আইন সম্পর্কে না জেনেই এমন বেআইনী কাজ করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশের বিদ্যমান আইন লঙ্ঘন করে চারিদিকে ভিনদেশী পতাকার যত্রতত্র ব্যবহার সচেতন মহলকে রীতিমতো হতবাক করে তুলেছে।

 
কক্সবাজারসহ সারাদেশে বিদেশী পতাকার প্রদর্শনী এতই চরম পর্যায়ে পোঁছে গেছে যে, বিভিন্ন জায়গায় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা নিচে রেখে তার উপর ভিনদেশী পতাকা প্রদর্শন করা হচ্ছে। তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে দেশের আইন ও এর অমান্য করে ভিনদেশী পতাকা লাগিয়ে অতিউৎসাহী সমর্থন করা নিয়ে।

 
এই পরিস্থিতিতে জাতীয় পতাকার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে গতকাল যশোর জেলায় ২৪ ঘন্টার মধ্যে সব বিদেশী পতাকা সরিয়ে নিতে নির্দেশ দিয়েছেন স্থানীয় জেলা প্রশাসক। গতকাল সোমবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পত্র পাঠিয়ে জেলা প্রশাসক মোস্তাফিজুর রহমান প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছেন।

 

পত্রে উলেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী এ দেশের অভ্যন্তরে কোনো ভবনে বা যানবাহনে কোনো বিদেশি পতাকা উত্তোলন করা যাবে না। কিন্তু বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা উপল্েয জেলার বিভিন্ন ভবনে বিদেশি রাষ্ট্রর পতাকা উত্তোলন করে বাংলাদেশ পতাকা বিধিমালা লঙ্ঘন করা হয়েছে। এজন্য পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জাতীয় পতাকাকে সম্মান জানিয়ে বিদেশী পতাকা সরিয়ে নিতে সবার প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।
একইভাবে কক্সবাজার জেলায়ও যত্রতত্র বিদেশী পতাকার ব্যবহার এবং বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাকে অবমাননা করে ভিনদেশী পতাকা প্রদর্শনের ব্যাপারে গতকাল রাতে জেলা প্রশাসক মোঃ রুহুল আমিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। এর প্রেেিত তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান।

 
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক রুহুল আমিন জানান, দেশের অভ্যন্তরে এই ধরনের বিদেশী পতাকা প্রদর্শন আইনের লঙ্ঘন। দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ও আস্থা কমে যাচ্ছে উলেখ করে তিনি কক্সবাজারেও এই ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন। গতকাল সকালে কক্সবাজার শহরে মেডিকেল কলেজের শিক ও শিার্থীদের বিদেশী পতাকা প্রদর্শনী নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়। এসময় উপস্থিত লোকজনের মাঝে প্রশ্ন উঠে, যখন বাংলাদেশী ক্রিকেটাররা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিরোপা জিতে কিংবা ভালো ক্রিকেট খেলে তখন এই ধরনের উৎসাহ ল্য করা যায় না। কিন্তু বিদেশীদের পতাকা নিয়ে তাদের প্রতি এই অতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শন কেনো? আর কেনইবা দেশীয় আইন লঙ্ঘন করে বিদেশী পতাকা প্রদর্শনী করা হচ্ছে শহরজুড়ে।

 
আইনি সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে পতাকা আইন ১৯৭২ এর বিধি ৯(৪) এ দেশের অভ্যন্তরে কোনো ভবনে বা যানবাহনে কোনো রকম বিদেশী পতাকা উত্তোলন করা যাবে না বলে সুষ্পষ্ট উলেখ আছে। আইন অনুসারে আরো অন্যান্য সব দেশের মতোই বাংলাদেশের মাটিতেও খুবই সুনির্দিষ্ট কিছু ত্রে ছাড়া বিদেশের পতাকা ব্যবহার করা যাবে না। আরো উলেখ আছে, বাংলাদেশের মাটিতে বিদেশের পতাকা ওড়ানোর এই ত্রেগুলো সেসব দেশের দূতাবাস ভবন, তাদের রাষ্ট্রপ্রধান ও মন্ত্রীদের গাড়িতে বাংলাদেশে সফরকালে ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এর বাইরে কোথাও বিদেশি জাতীয় পতাকা ব্যবহার করতে হলে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুমতির দরকার হবে।

 
উলেখ্য যে, বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা আমাদের অর্জন, গর্ব আর অহঙ্কার। এ পতাকার ছায়াতলে আমরা বারবার একত্রিত হই। এই জাতীয় পতাকার প্রতি অবমাননামূলক আচরণের মধ্যে অন্যতম পতাকা পোড়ানো, পদদলিত করা, ছিঁড়ে ফেলার মতো উগ্রতা, দেশের পতাকাকে অবমূল্যায়ন করে স্ব-দেশের পতাকা বিহীন বিভিন্ন সময় বিশেষ করে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার সময় ভিন্ন দেশের পতাকা উড়ানো এক ধরনের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।
স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭২ সালে পতাকা আইন করা হয়েছিল। ২০১০ সালের জুলাই মাসে আইনটি সংশোধিত হয়, সংশোধনীতে সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত শাস্তি এবং ১০ হাজার টাকা অর্থদন্ডের বিধান রাখা হয়। কিন্তু দেশের বিদ্যমান এসব আইনকে কোনো ভাবেই তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। বিভিন্ন সময় ভিনদেশী পতাকার প্রতি অতিউৎসাহী হয়ে দেশীয় পতাকাকে হেয় করা হচ্ছে।

 
সম্প্রতি জাপান থেকে সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ফেইসবুকে স্ট্যাটাস আকারে বাংলাদেশী এক সাংবাদিক লিখেছেন “অন্য দেশের পতাকা টাঙ্গাতে গিয়ে বাংলাদেশে মানুষ মারা যায় অথচ জাপান বিশ্বকাপে খেলার পরও জাপানের কোথাও বিশ্বকাপ নিয়ে সেখানকার মানুষের মাঝে ছিটে ফুটা উত্তেজনাও এই কয় দিনে চোখে পড়েনি”। তিনি অবশ্য এর জন্য আমাদের দেশের বেকারত্বকে দায়ী করেন। অন্যান্য দেশে জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ব্যাপারে উলেখ্য যে, ভারতীয় ক্রিকেটার শচীন টেন্ডুলকারের জন্মদিনের কেক ভারতীয় পতাকার মতো তিনরঙা ছিল বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল পতাকা অবমাননার। সেলিব্রেটিদের পতাকা-রঙা শাড়ির পাড় পা ছুঁই ছুঁই করেছিল বলে বিষয়টা আদালত পর্যন্ত গড়িয়ে ছিল। খেলার সময় পরিধেয় হেলমেটে বিসিসিআইর পরে জাতীয় পতাকা অঙ্কিত ছিল বলে শচীন টেন্ডুলকার আরো একবার পতাকা অসম্মানের দায়ে অভিযুক্ত হন। এরপর তাকে হেলমেটে আগে জাতীয় পতাকা ও তারপর বিসিসিআই অঙ্কিত করতে হয়েছিল।

 
এেেত্র চীনের আইন আরো কঠোর। আটকাদেশ, তিন বছরের জেল-জরিমানা ছাড়াও ব্যক্তির রাজনৈতিক অধিকার খর্ব হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে চীনের জাতীয় পতাকা ব্যবহারবিধি আইনে। ফিনল্যান্ড, জার্মানি এবং ডেনমার্কে জাতীয় পতাকার অবমাননা অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আরব বিশ্বের অনেক দেশেই জাতীয় পতাকায় ইসলামিক স্বার রয়েছে। এসব দেশে জাতীয় পতাকার মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয় এবং জাতীয় পতাকার নূন্যতম অবমাননাকে ইসলামের অবমাননা হিসেবে বিবেচিত হয়।

 
এরই মধ্যে গত টি-২০ বিশ্বকাপে দেশের ‘ফ্যাগ রুল’ বা জাতীয় পতাকা ব্যবহার সংক্রান্ত আইন মেনে চলার জন্য সরকার থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। নির্দেশের পর বাংলাদেশী হয়েও অন্যান্য দেশের পতাকা নিয়ে মাঠে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে বিসিবি। এর পর থেকে মাঠে প্রবেশ করার সময় পতাকা বহনকারীদের বাংলাদেশী কিনা ঐ দেশের নাগরিক যাচাই করা হয়।

শাহনেওয়াজ জিল্লু, কক্সবাজার
০১৬৮২৭৯৩৫১২
১০.০৬.১৪ ইং

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।