জনের মৃতদেহ কক্সবাজারে, অন্যরা টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনে, দুই থাই ও এক মিয়ানমার নাগরিক আটক

গত ১১ জুন বুধবার মালয়েশিয়াগামী যাত্রীবাহী জাহাজে ৬ বাংলাদেশী নিহতের ঘটনায় টেকনাফ থানায় পৃথক ৩টি মামলা হয়েছে। এঘটনায় গুলী করার অভিযোগে কোস্টগার্ড মানব পাচারকারী চক্রের সদস্য থাইল্যান্ডের নাবিক পিউ’র পুত্র মিউ মং ও এ্যাছাউ’র পুত্র থ্যাং নামের দুই ব্যাক্তি এবং আব্দুল গফুর নামের এক মিয়ানমার নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।

 

এই ঘটনায় তিনটি মামলা হলেও সাগর পথে ঝুঁকিপূর্ণ মালয়েশিয়া গমনে সহায়তাকারী মানব পাচারকারী চক্রের মূল হুতারা রয়েছে ধরা ছুঁয়ার বাইরে। এদিকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার হওয়া আহত ৩১ যাত্রীকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

 

বাকী যাত্রীদের পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। তাছাড়া এ ঘটনায় আটক রয়েছে থাইল্যান্ডের দুই জন নাবিক ও একজন মিয়ানমারের দালাল। তাদের বিরুদ্ধে মানব পাচারের অভিযোগে পৃথক ৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। রিপোর্ট লেখাকালে আহতরা জেলা কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

 
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিরা হলেন- নরসিংদি জেলার রায়পুর উপজেলার ভেলুয়াচর এলাকার তাজুল ইসলামের পুত্র মিজান মিয়া, কিশোর গঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার রূরপুর এলাকার জমির উদ্দিনের পুত্র দীন ইসলাম, মাদারীপুরের পশ্চিম হাফছড়া এলাকার মুজিবুর রহমানের পুত্র শামীম, যশোরের মনিরামপুর থানার কোদাপাড়া এলাকার হাবীব উল্লাহর পুত্র ইসলাম আলী, শরীয়তপুরের পূর্ণরিয়া এলাকার আব্দুল মান্নানের পুত্র মু. ফয়সাল, নারায়নগঞ্জের আড়াই হাজার এলাকার সদর আলীর পুত্র ওমর আলী, কিশোরগঞ্জের পটিয়ারী আদমপুর এলাকার নুরুল ইসলামের পুত্র সবুজ, আতাউর রহমানের পুত্র মো. শাহীন, কক্সবাজারের টেকনাফ বরইতলী এলাকার আলী আকবরের পুত্র মে.সোহেল, পেকুয়া উপজেলার মগনামা এলাকার মোহাম্মদ ফরিদের পুত্র মু. আরিফ, যশোরের জিগরগাছা এলাকার ওবায়দুল হকের পুত্র মজনু মিয়া, বগুড়া ঘরানিপুরের রমজান আলীর পুত্র আবু বকর ছিদ্দিক, জয়পুরহাট জেলার তেলাল এলাকার নাছির উদ্দিনের পুত্র বাদেশ, কুষ্টিয়া জেরার দৌলতপুর মালিবাগ এলাকার নজিবুল ইসলামের পুত্র সজিব, কিশোরগঞ্জের মিঠাবল এলাকার সবুর মিয়ার পুত্র মো. রাশেদ, নরসিংদীর হামিদ আলীর পুত্র মাসুদ রানা, পাবনা সুধা নগর মটপাড়া এলাকার ইমতাজ আলীর পুত্র জাহিদ হাসান, মুনসিগঞ্জ মংসিকান্দি এলাকার আজিজুল হকের পুত্র মিল্লাত, জয়পুর হাট তেলাল এলাকার নরেসের পুত্র সবুজ, সিরাজগঞ্জের খারকুন্ড এলাকার আব্দুল হামিদের পুত্র নুররুন্নবী, নরসিংদি রায়পুর দণি মির্জা নগর এলকার ইসমাঈলের পুত্র আব্দুর রহীম, জিন্নাতের পুত্র আরাফাত আলী, জমির উদ্দিনের পুত্র আরামনা, ঝিনাদাহ আব্দুর রহীমের পুত্র শামীম, যশোরের এনায়েতপুর এলাকার হাফিজুর রহমানের পুত্র রবিউল ইসলাম, কুমিল্লা দাউদকান্দি এলাকার দাউদ আলীর পুত্র ছালাহ উদ্দিন, যশোরের কুতুব আলী এলাকার আইয়ুব হোসেনের পুত্র মিলন হোসেন, ভ্রাহ্মণবাড়িয়া রায়পুর বামছা এলাকার মোস্তফার পুত্র সাগর ও কিশোরগঞ্জের আদমপুর এলাকার লালমিয়ার পুত্র মো. ফারুক।

 

এ ছাড়া ঘটনার মূল নায়ক থাইল্যান্ডের নাবিক পিউ’র পুত্র মিউ মং, এ্যাছাউ’র পুত্র থ্যাং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। এ ঘটনায় নিহতরা হলেন- যশোরের এনায়েত পুরের হরিরামপুর এলাকার রশিদ আহমদের ছেলে মো: সেলিম (১৯), একই এলাকার মোকামের ছেলে রুবেল (৩৫), বগুড়ার কাহালু উপজেলার মাটিখালি এলাকার সাইফুল (৪০), সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার পাইতুশা এলাকার মনির। অপরজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাদের লাশ ময়না তদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।

 
এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন চৌধুরী জানান, বৃহস্পতিবার বিকালে ৫ জনের মরদেহ ময়না তদন্ত শেষে তাদের স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আহত ৩১ জনকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
এদিকে গত ১২ জুন বৃহস্পতিবার বিকেল ৫ টার দিকে শহরের বাজারঘাটাস্থ হোটেল সী-হাট থেকে প্রকাশ পাল ও জাহাঙ্গীর আলম নামের ২ দালালকে আটক করেছে মডেল থানা পুলিশ। কোস্টগার্ড বাদী হয়ে টেকনাফ থানায় হত্যা ও মানব পাচারসহ পৃথক ৩টি মামলা দায়েরের কথা জানিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তোফায়েল আহমদ বলেন, মামলায় আসামী করা হবে আটক থাইল্যান্ডের ২ নাগরিক ও শিবপুরে আটক কামালসহ আরো অনেকে।

 
অসমর্থিত একটি সূত্র জানায়, কক্সবাজার শহরে মানবপাচারকারীদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। জনৈক কৃষকলীগ নেতা সুমনের নেতৃত্বে মানবপাচারকারী চক্রটি সারাদেশ থেকে মানুষ সংগ্রহ করে আদম পাচার করে থাকে। এই সিন্ডিকেটে রয়েছে খুরুস্কুল কাউয়ার পাড়ার ছৈয়দ হোসেন, লিংকরোড এলাকার পাখি, ৬নং ফিসারি ঘাট এলাকার ছৈয়দ আলম। দালাল আবছার এদের শ্রমিক হিসেবে কাজ করে থাকে।

 

এর আগে বিভিন্ন সময় কক্সবাজার মডেল থানায় আটককৃত নৌপথে মালয়েশিয়াগামী যাত্রীদের ছাড়িয়ে আনতে কৃষকলীগ নেতা সুমন তদবীর চালাতো এবং তাদের ছাড়িয়ে আনতো এমন তথ্য দিয়েছে স্থানীয় একটি সূত্র। টেকনাফ কোস্টগার্ড এর ষ্টেশন কমান্ডর লে. হারুন অর রশিদ জানান, উদ্ধার হওয়া অপর ২৮৭ জনকে খাবার ও প্রয়োজনীয় সহায়তা করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সেখান থেকে তাদের পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানো হবে।

 

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তোফায়েল  আহমদ জানান, মালয়েশিয়াগামী যাত্রী বোঝাই আক্রান্ত জাহাজ থেকে গুলিবর্ষণের ঘটনায় জড়িত থাইল্যান্ডের ক্রু মিউ মং, থ্যাং ও মিয়ানমারের দালাল আব্দুল গফুরকে আটক করেছে কোষ্টগার্ড। তাদের বিরুদ্ধে মানবপাচার আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এছাড়াও ঘটনায় জড়িত অপরাপর দালালদের খোঁজে অভিযান অব্যাহত রেখেছে পুলিশ।

 

ঘটনায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে ঝুঁকিপূর্ণ নদীপথে মালয়েশিয়া পাঠানোর অভিযোগে নরসিংদীর শিবপুর থেকে কামাল সরকার নামে এক মানব পাচারকারী দালালকে আটক করেছে পুলিশ। ওই ট্রলারের যাত্রী শিবপুরের জয়নগর গ্রামের নাঈমের বাবা আসাদ মিয়ার অভিযোগের ভিত্তিতে কামালকে আটক করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

 

এ ঘটনায় আরো কেউ জড়িত থাকলে তাদেরও গ্রেপ্তার করা হবে বলে জানিয়েছেন। অন্যদিকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মজনু (৩০) জানায়, আবছার নামে জনৈক দালালের মারফতে তারা মালয়েশিয়া যাচ্ছিল। দালাল আবছার কক্সবাজার পৌর এলাকার কুতুবদিয়া পাড়ার বাসিন্দা। আহতরা আরোও জানায় তারা সদর হাসপাতালে আসার পর থেকে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেননা। এমনকি কারও শরীর হতে এরিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বিদ্ধ গুলী বের করে নেয়নি চিকিৎসকরা। একারণে তাদের প্রত্যেকেই ব্যাথায় কাতরাচ্ছেন।

 
কোস্টগার্ড টেকনাফ স্টেশন কমান্ডার কমান্ডার লে. কাজি হারুন অর রশীদ জানান, মালয়েশিয়াগামী ওই জাহাজে যাত্রীদের সাথে নাবিকদের কথাকাটি এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলে দুই নাবিক জাহাজ থেকে ঝাঁপ দেয়। এবং অপর একটি দ্রুতগামী ট্রলারে উঠে পড়ে। পরে ওই ট্রলার সহ আরো তিনটি ট্রলার মালয়েশিয়াগামী যাত্রীবাহী ট্রলারটি ঘিরে ফেলে। যাত্রীদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করে। গুলি বর্ষণকারীরা সকলেই মানবপাচারকারী এবং মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের নাগরিক বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।

 
তিনি আরো জানান, কোস্টগার্ডের উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে গিয়ে ট্রলার থেকে মালয়েশিয়াগামি সহ মোট ৩১৮ জনকে উদ্ধার করে। এর মধ্যে ৫ জন মৃত। রাতে ৫ জনের মৃতদেহ, গুলিবিদ্ধ ২৩ জন, আটক ৩ বিদেশী নাগরিক এবং নানাভাবে আহত ও অসুস্থ আরো ৩৩ জন সহ মোট ৬৮ জনকে টেকনাফ আনা হয়। অপর ২৫০ জন সেন্টমার্টিন দ্বীপে কোষ্টগার্ডের হেফাজতে রয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেলের মধ্যে তাদেরও টেকনাফ আনা হবে বলে জানাগেছে। এদিকে গতকাল সকাল ১০টায় নিহত ৫ জনের লাশ কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ময়না তদন্তের জন্য নিয়ে আসা হয়।

 

টেকনাফ থানার ওসি মোক্তার আহমদ জানিয়েছেন, মৃতদেহ ময়না তদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। ওখান থেকে অভিভাবকের কাছে হস্তান্তর করা হবে। উদ্ধার হওয়া সকল ভিকটিমকে অভিভাবকের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এ ঘটনায় প্রাথমিকভাবে মানব পাচার, হত্যা ও অস্ত্র আইনে ৩ টি মামলার প্রক্রিয়া চলছে। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মোজাহিদ জানিয়েছেন, আহতদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, খাবার প্রদান করা হচ্ছে।

 
উল্লেখ্য, বুধবার সকাল ১১টায় সেন্টমার্টিনের পূর্ব-দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরের ১৫ কিলোমিটার দূরে অবৈধভাবে মালয়েশিয়াগামি ৩ শতাধিক যাত্রীর একটি ট্রলার ভাসতে দেখে স্থানীয় লোকজন বিষয়টি প্রশাসনকে অবহিত করে। এর প্রেক্ষিতে কোষ্টগার্ডের ৩ টি বিশেষ দল নৌ বাহিনীর সহায়তায় ট্রলারটি উদ্ধার করে সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টার দিকে সেন্টমার্টিন দ্বীপে আনা হয়। ওখান থেকে একটি কাঠের ট্রলার যোগে টেকনাফ স্থলবন্দরস্থ ট্রানজিট ঘাটে ৬৮ জনকে আনা হয় রাত ২টার দিকে।

 
টাকার লোভে বেকার যুবকেরা ঝুঁকি নিয়ে সাগর পাড়ি দিচ্ছে দালালদের আকর্ষনীয় প্রচারণা ও লোভনীয় অফারে অশিক্ষি বেকার যুবকরা সাগর পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়া যেতে পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ছে বেশী। এক লাখ টাকা, সত্তর হাজার টাকা, এমনকি পঞ্চাশ হাজার টাকায় ও সাগর পথে মায়েশিয়া পৌঁছে দেয়ার কথা বলে অর্ধেক টাকা আগে নিয়ে ফেলে।

 

এভাবে বিভিন্ন স্থানে কয়েকদিন আটকিয়ে রেখে বকেয়া টাকা আদায় করার চেষ্টা করে। আর না হয় সাগর মাঝে আটকিয়ে রেখে আত্মীয় স্বজনদেরকে ফেন করে কুলে থাকা দালালদের মাধ্যমে সব টাকা আদায় করে নড়ে বড়ে নৌকা বা ট্রলার দিয়ে যাত্রীদের সাগর পথে ঠেলে দেয়া হয়। এর পর এরা কোথায় পৌঁছল দালাল চক্র নাকি আর দায়িত্ব নেয় না। এভাবে অনেকবার সাগরে নৌকা ডুবির টনা ঘটেছে। হতাহত হয়েছে অসংখ্য সাগর পথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাত্রী।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।