মানবাধিকার কর্মীদের নিষ্ক্রিয় করতে চায় সরকার

স্বায়ত্তশাসিত আঞ্চলিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা দ্য এশিয়ান লিগ্যাল রিসোর্স সেন্টার (এএলআরসি) এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেছে, মানবাধিকার কর্মীদের নিষ্ক্রিয় করে ফেলতে চায় বাংলাদেশ সরকার। ‘বিদেশি অনুদান (স্বেচ্ছাপ্রণোদিত কার্যক্রম) নিয়ন্ত্রণ বিল, ২০১৪’ শীর্ষক একটি বিল পাস করেছে মন্ত্রিসভা, যেটি খুব শিগগিরই আইন হিসেবে পাস হয়ে যাবে।

 

 

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো (এনজিও) ও স্বপ্রণোদিত মানবাধিকার কার্যক্রমের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য আমলাতান্ত্রিকতার ক্ষমতায়ন সম্পূর্ণ করা হবে এই বিলের মাধ্যমে। যেকোনো এনজিও কিংবা মানবাধিকার সংরক্ষণ গোষ্ঠীর যেকোনো ব্যক্তি বা দল যারা মানবাধিকার উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সম্পন্ন করার জন্য বৈদেশিক সাহায্য পান, নতুন এই বিলটির মাধ্যমে তাদের সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় আনা হবে।

 

দ্য এশিয়ান লিগ্যাল রিসোর্স সেন্টার (এএলআরসি) শুক্রবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানিয়েছে। হংকংভিত্তিক এই সংগঠনটি জাতিসংঘের ইকোনমিক ও সোশ্যাল কাউন্সিলের সাধারণ উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত আছে এবং একইসঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এশিয়ান হিউম্যান রাইটস্‌ কমিশনেরও একটি অঙ্গসংগঠন।

 

 

এশিয়া মহাদেশের সবগুলো দেশ ও অঞ্চলের স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সাধারণ মানবাধিকার ও আইনি অধিকার নিশ্চিতকরণের জন্য গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপকে উৎসাহিত ও জোরদার করার জন্য ভূমিকা রাখে সংস্থাটি। সংস্থাটির অভিযোগ, বাংলাদেশে স্বৈরতান্ত্রিক প্রশাসনিক কার্যক্রমকে এই আইনের মাধ্যমে আরো শক্তিশালী করে তোলা হবে।

 

 

বর্তমানে যে বিলটি রয়েছে সেটির মাধ্যমে আমলারা নিজেদের ‘সন্তোষ’-এর ওপর নির্ভর করেই যেকোনো এনজিও’র নিবন্ধনে অনুমোদন দিতে পারে কিংবা তা স্থগিত বা বাতিল এমনকি এনজিওটির আওতাধীন যেকোনো প্রকল্পে ‘অনিয়ম’-এর অভিযোগ এনে সাংগঠনিক নিবন্ধন বাতিলও করে দিতে পারে। আর সরকারের এসব সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে মামলা দায়ের করারও কোনো সুযোগ নেই।

 

এএলআরসি জানায়, এই আইনের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ দায়ের করার জন্য প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিয়োগ করার ক্ষমতা রাখবে সরকার। এই অভিযোগের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নিযুক্ত সচিবের কাছে ‘আপিল আবেদন’ করতে পারবেন অভিযোগটি দায়ের করার পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে এবং এক্ষেত্রে সচিবের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।

 

১৯ নং ধারা অনুযায়ী: “এই আইনটির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সরকার নতুন কোনো নিয়ম প্রণয়নের আগ পর্যন্ত প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করতে পারবে, প্রয়োজন হলে এই আইন সংশ্লিষ্ট সাধারণ বা বিশেষ আদেশ প্রদানের মাধ্যমে সরকার এই আইনের অধীনে যেকোনো ব্যবস্থা গ্রহণ বা আদেশ প্রদান ও বাস্তবায়ন করতে পারবে।” এই ধারাটি পড়ার পর আর কোনো সন্দেহই থাকে না যে বাংলাদেশে এনজিওগুলোকে চতুর্দিক থেকে বেঁধে ফেলার ব্যবস্থা করা হয়ে গিয়েছে।

 

এএলআরসির মতে, এই উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য বিলটির মাধ্যমে যাবতীয় ক্ষমতা অর্পণ করা হবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আওতাধীন শাখা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অ্যাফেয়ার্স ব্যুরোর (এনজিওএবি) মহাপরিচালকের (ডিজি) ওপর। সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা পর্যায়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা থেকে শুরু করে আঞ্চলিক বিভাগীয় কমিশনার পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মকর্তারা থাকবেন এবং তাদের ওপরেই এনজিওগুলোর কার্যক্রম পরিদর্শন, পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের ভার ন্যাস্ত থাকবে। নির্দিষ্ট সময় পর পর এই নির্বাহী কর্মকর্তারা এনজিওগুলো পরিদর্শন করবেন এবং এসব কার্যক্রম মূল্যায়নের জন্য প্রতি মাসে একটি সমন্বিত বৈঠক অনুষ্ঠিত করবেন।

 

সংস্থাটির অভিযোগ, এতদিন ধরে দুর্নীতি আর রাজনীতিকরণের মাধ্যমে পরিচালিত এনজিওএবি এখন পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় যন্ত্রে পরিণত হচ্ছে। এই আইনের মাধ্যমে একজনের মাথা কেটে আরেকজনকে বাঁচানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী উন্মত্ত খায়েশকে আইনগত বৈধতা দেবেন আমলারা।

 

আগে থেকেই সরকার ও বিচার ব্যবস্থা (এই বিচার ব্যবস্থাও সরকারেরই আরেকটি হাত হিসেবে কাজ করার যন্ত্রবিশেষ) মিলে দেশটিতে কর্মরত স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মী, সংগঠন ও পেশাজীবীদের ওপর নানারকম হয়রানি করে আসছিল। আর এখন নতুন করে সরকার ও বিচার ব্যবস্থার দলে যোগ হচ্ছেন আমলারাও। সাম্প্রতিক সময়ের হয়রানিগুলোর ধরন থেকেই বোঝা যায় যে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে এই আইনটির ব্যবহার ও অপব্যবহার- দুটোই হবে।

 
মানবাধিকার সংস্থাটি আরো অভিযোগ করে, ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে যারাই অনাগ্রহ দেখাবে তাদের ধ্বংস অনিবার্য করা হবে। আর যারা সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করবে, তাদের আরো বেশি করে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে যেন পরবর্তী সময়ে কোনো মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আন্দোলন বা বিদ্রোহ বা সংঘর্ষ ঘটলে সেটার মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়ার কাজটি করতে পারে সরকারের সঙ্গে হাত মেলানো ওই প্রশিক্ষিত দলটি।

 
বাংলাদেশে ন্যূনতম জ্ঞান ছড়ানোরও যে প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে, ভবিষ্যতে তাও বন্ধ করে দেয়া হবে। কারণ বিলটির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের মত যেকোনো স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার জন্য সব ধরনের বৈদেশিক সাহায্যও নিষিদ্ধ করে দেয়া হচ্ছে।

 
এএলআরসির বিবৃতিতে বলা হয়, এই বিল নিয়ে বাংলাদেশে বেশ এক ধরনের কৌতূহলী প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। বিলটির মাধ্যমে এনজিওএবি’র নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছেন দেশটির সুশীল সমাজের বেশ কয়েকজন ‘অভিজাত’ সদস্য, এরই ধারাবাহিকতায় ক্ষতির মুখে পড়বে তাদের লাভজনক উপদেষ্টাবৃত্তি। কিন্তু আইনটির মাধ্যমে দেশটির জনগণ মূলত যে ক্ষতির মুখে পড়বেন তা হলো- তাদের ওপর নেমে আসবে দমননীতির অকল্পনীয় ভারী খড়গ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।