বিহারী পল্লীতে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বিরোধ

পল্লবীর বিহারী ক্যাম্পে নৃশংস হত্যাকান্ডের নেপথ্যে জমি দখল ও ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বিরোধ। শীর্ষস্থানীয় বাংলা দৈনিক মানবজমিনের অনুসন্ধানে এমন তথ্যই উঠে এসেছে স্থানীয়দের কাছ থেকে। বর্বরোচিত এই হত্যাযজ্ঞের অভিযোগের আঙুল উঠেছে আওয়ামী লীগ এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা ও তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে।

 
বিহারী ক্যাম্পের পাশে রাজু নামে একটি বস্তি ছিল। ওই বস্তিতে স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের লোকজন পাশের বিহারী ক্যাম্প থেকে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ নেন। এতে বাধা দেন বিহারী ক্যাম্পের লোকজন। এতে রাজু বস্তির লোকজন তাদের ওপর ক্ষিপ্ত ছিল।

 

আর এ ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদত ছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার। যুবলীগ নেতা জুয়েল রানার নেতৃত্বে হামলা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন ক্যাম্পের বাসিন্দারা।

 

বিহারী ক্যাম্পের বাসিন্দাদের সংগঠন স্ট্র্যান্ডেড পাকিস্তানিজ জেনারেল রিপ্যাট্রিয়েশন কমিটির (এসপিজিআরসি)’র চেয়ারম্যান জালাল উদ্দিন ভল্টু বলেন, এই ঘটনার পেছনে এমপি সাহেবের ইন্ধন আছে।

 

তিনি বলেন, ‘বিদ্যুতের সংযোগ দিতে না দেয়ায় তার লোকজন আমাদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়েছে। এছাড়া হামলার সময় এমপির অনেক লোকজনকে দেখেছে ক্যাম্পের বাসিন্দারা। এত বড় ঘটনা এমপি একবারও এলাকায় এলেন না কেন? এতেই বোঝা যায় তিনি এই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত কিনা?’

 
সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুন্না হোসেন দাবি করেন, পল্লবীর সেকশন ১২/ই কুর্মিটোলা বিহারী ক্যাম্পের পাশে নতুন কুর্মিটোলা বিহারী ক্যাম্প (রাজু বস্তি বলে পরিচিত)। ওই জমির মালিক সরকারি একটি সংস্থা। তিন বছর আগে সেটি ফাঁকা বালুর মাঠ ছিল। বাঙালি ছিন্নমূল ও বিহারী পরিবারের লোকজন ওই মাঠে বসতি গড়ে তোলে।

 
তিনি বলেন, আগে রাজু বস্তিতে বিদ্যুৎ লাইন ছিল না। পরে রাজু বস্তির লোকজন স্থানীয় এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার প্রভাব খাটিয়ে পাশের মূল বিহারী ক্যাম্প থেকে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ লাইন নেয়। বিহারী ক্যাম্প থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ নেয়ার কারণে তাদের বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করতে হতো না। স্থানীয় এমপির লোকজন ওই বস্তিতে প্রতিটি বাড়ি থেকে বিদ্যুৎ বিলের টাকা ওঠাতো এবং নিজেরা ভাগ-ভাটোয়ারা করতো।

 

স্থানীয় সূত্র জানায়, সরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়, কুর্মিটোলা বিহারী ক্যাম্প থেকে অবৈধভাবে নেয়া রাজু বস্তির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে। এ নিয়ে চাপ দেয়া হয় (এসপিজিআরসি) কর্তৃপক্ষকে। তখন কুর্মিটোলা বিহারী ক্যাম্পের লোকজন ১১ মে বুধবার রাতে রাজু বস্তির অবৈধ বিদ্যুৎ লাইন সংযোগ বিছিন্ন করতে যায়। তখন রাজু বস্তির লোকজন এতে বাধা দেয়। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও তর্কাতর্কির ঘটনা ঘটে।

 

মুন্না হোসেন বলেন, খবর পেয়ে স্থানীয় এমপি ইলিয়াস আলী মোল্লা ঘটনাস্থলে হাজির হন। সেখানে এমপি এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বলেন, রাজু বস্তিতে বিদ্যুৎ লাইন থাকবে। এই লাইন বৈধ না অবৈধ এবং কোথা থেকে এসেছে এটি দেখার দরকার নেই। কে বিদ্যুৎ লাইন বিছিন্ন করার আদেশ দিলেন সেটিও বিবেচনায় আনার দরকার নেই। শেখ হাসিনার সরকার জনগণের সরকার। তাই জনগণের জন্য যেটি মঙ্গল হবে সেটিই করা হবে।

 

এমপির এই বক্তব্যে ক্যাম্পের লোকজনের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে জানিয়ে মুন্না হোসেন বলেন, ওই দিন বিক্ষুব্ধ লোকজন ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার পাঞ্জাবির কলার ছিঁড়ে ফেলে এবং ধাক্কাধাক্কিতে ইলিয়াস পড়ে যান। এরপর এমপি বিহারী ক্যাম্পের লোকজনকে দেখে নেয়ার হুমকি দেন।

 

তিনি অভিযোগ করে বলেন, এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার ইন্ধনে পল্লবী থানায় রাজু বস্তির বাসিন্দা ও স্থানীয় যুবলীগ নেতা মাদক ব্যবসায়ী মো. রিয়াজ বাদী হয়ে বিহারী ক্যাম্পের লোকজনের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করে। মামলা নম্বর ৫।

 

মামলায় আসামি করা হয় ২০ জনকে। অন্যান্য আসামিরা হলেন- কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পের সভাপতি জালাল উদ্দীন আহমেদ ভল্টু, সেক্রেটারি মো. ফিরোজ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুন্না আহমেদ, তথ্য ও বার্তা সম্পাদক শামশাদ শাকিল, সদস্য রাজু আহমেদ, আসগার আলী, পরিমণি, নূরিয়া বেগম, হামিদা বেগম, জামাল উদ্দীন,  আবির হোসেন, ইমরান আহমেদ, আশিক রহমান, মোদ্দেবের আলী প্রমুখ।

 
শুক্রবার বিহারি ক্যাম্পে মামলার তদন্ত করতে আসে পুলিশ। বিহারী ক্যাম্পের লোকজন যেন রাজু বস্তির বিদ্যুৎ লাইন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে না যায় এজন্য ক্যাম্পের বাসিন্দাদের পুলিশও সতর্ক করে যায়।

 

ক্যাম্পের বাসিন্দারা জানান, বুধবারের রাতের ঘটনার পর স্থানীয় এমপি ইলিয়াস আলী মোল্লা ও তার লোকজনের বিহারী ক্যাম্পের বাসিন্দাদের প্রতি  আক্রোশ বেড়ে যায়। এছাড়াও বাউনিয়াবাদ এলাকার কিছু সরকারি দলীয় লোকজনের বিহারী ক্যাম্পের জমি দখলের ওপর দৃষ্টি ছিল। তারা পরিকল্পনা করে আতশবাজির নাম করে বিহারী ক্যাম্পে এ হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে।

 

সূত্র জানায়, প্রায় ১৫ দিন আগে ঢাকা জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয় যে, পল্লবীর ১২/ই কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পে কতটি বাড়িতে বিদ্যুৎ লাইন আছে এবং কতটি বাল্ব জ্বলে? বিহারী ক্যাম্পের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসককে একটি তালিকা দেয়া হয়।

 
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করেও এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাকে পাওয়া যায়নি। এছাড়া নিজের নির্বাচনী এলাকায় এমন নৃশংস ঘটনা ঘটলেও গতকাল তিনি একবারের জন্যও ঘটনাস্থল বা হাসপাতালে যাননি।

 

এদিকে পুলিশের দাবি, বিহারিদের নিজেদের কোন্দলের কারণে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশের মিরপুর জোনের ডিসি ইমতিয়াজ আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, মূলত বিহারীদের এ ক্যাম্পে কয়েকটি গ্রুপ সক্রিয়। তাদের মধ্যে কোন্দলকে কেন্দ্র করে এ সংঘর্ষ হয়। পরে স্থানীয়রাও সংঘর্ষে জড়ায়।

 

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন সাবেক এমপি সাহিদা তারেখ দীপ্তি। স্থানীয় এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা কেন ঘটনাস্থলে যাননি জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি কেন আসেননি তা লোকজন জানে। তারাই বলতে পারবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।