আরো ৯ খুন ও ৬ গুমের অভিযোগ তারেক সাঈদের বিরুদ্ধে (ভিডিও)

নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা ছাড়াও মাত্র ছয় মাসের দায়িত্ব পালনকালে সাবেক র‌্যাব কর্মকর্তা তারেক সাঈদ মোহাম্মদের বিরুদ্ধে আরো নয় খুন ও ছয় গুমের অভিযোগ উঠেছে।

 

বর্বরোচিত সাত খুনের ঘটনায় তারেক সাঈদ গ্রেপ্তারের পর এখন একে একে মুখ খুলতে শুরু করেছে লক্ষ্মীপু ও কুমিল্লার বাকি ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। মিলেছে প্রত্যক্ষদর্শীও।

 

সাবেক এমপিসহ দুই বিএনপি নেতা গুম
কুমিল্লার লাকসাম থেকে আটক হওয়া বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম হিরু এবং পৌর বিএনপির সভাপতি হুমায়ুন কবির পারভেজ গুম হওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় র‌্যাব-১১ সাবেক অধিনায়ক তারেক সাঈদসহ র‌্যাবের পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কুমিল্লার আদালতে মামলা করেন ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলো।

 

হিরুর ছেলে রাফসানুল ইসলাম বলেন, ‘কী হলো, ঘটনাটা কী ঘটলো এবং কেন তাদের ধরে নিল, এসবের উত্তর জানতে তারেককে জিজ্ঞাসা করা হোক, রিমান্ডে নেয়া হোক।’

 

হুমায়ুন কবির পারভেজের স্ত্রী শাহনাজ আক্তার বলেন, ‘র‌্যাবের লোকেরা লাকসাম থানায় যদি জসিমকে না দিয়ে যেত, তাহলে আমরা বুঝতামই না এ ঘটনা কে বা কারা করেছে।’

 

ডা. ফয়েজকে গুলির পর ছাদ থেকে ফেলে হত্যা
লক্ষ্মীপুর শহরের তেমুহানী এলাকায় ডা. ফয়েজ আহমদের বাসভবনে গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর রাতে অভিযান চালায় র‌্যাব। তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে ডা. ফয়েজের ছেলে ভবনের কার্নিশে আশ্রয় নেন।

 

বাবাকে নির্মমভাবে হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী ছেলে বেলাল আহমেদ বলেন, ‘র‌্যাব সদস্যদের দেখেই আমি দেখেই আতঙ্কিত হয়ে যাই। আমি চেষ্টা করি বাসা থেকে সরে যাওয়ার জন্য। আমি ছাদের ওপর উঠে আমি কার্নিশে আশ্রয় নেই।’ ‘কিছুক্ষণ পর দেখি তারা (র‌্যাব) আব্বুকে ছাদে নিয়ে আসে। দীর্ঘসময় তারা আব্বুকে টর্চার করে। খুঁজতে থাকে আমাকেও। তারেক সাঈদ সেদিনের অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সে আব্বুকে গুলি করে ছাদ থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়’ যোগ করেন তিনি।

 

লক্ষ্মীপুরে একদিনে চার হত্যা, এক লাশ গুম
র‌্যাবের অভিযানে লক্ষ্মীপুরে সবচেয়ে রক্তঝরা দিনটির শুরু ১২ ডিসেম্বর ২০১৩। সে সময় র‌্যাব-১১ অধিনায়ক লে. কর্নেল তারেক সাঈদের নেতৃত্বে অভিযানে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাহাবুদ্দিন সাবু দু’পায়ে গুলিবিদ্ধ হন।

তার বাসায় ডাকাত ঢুকেছে এমন খবরে দলীয় নেতাকর্মীরা আসতে চাইলে র‌্যাবের গুলিতে নিহত হন যুবদল নেতা ইকবাল মাহমুদ জুয়েল, মাহবুব, শিহাব ও সুমন। গুলিতে আহত ছাত্রদল নেতা নেসার উদ্দিন এবং জুয়েলের পরিবার অভিযোগ করেন জুয়েলের লাশ গুম করেছে র‌্যাব। জুয়েলের স্ত্রী মনোয়ারা বেগম বলেন, ওইদিনের ঘটনায় দায়ী র‌্যাব-১১।

 

মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘নিজেরা বেছে থেকে লাভ কী? আমাদের চার চারটি জীবনকে অসহায় করে গেছে। আমরা তাদের (র‌্যাব-১১) বিরুদ্ধে মামলা করবো।’ ছাত্রদল নেতা নেসারউদ্দিন বলেন, ‘প্রথমে শুনলাম জুয়েল ভাইয়ের গায়ে একটা গুলি লেগেছে। পরে দেখি গুলিটা তার ঘাড়ে লাগলে তিনি আর উঠতে পারেননি। সম্ভবত তিনি সেখানে মারা যান কিংবা তারা তাকে নিয়ে যাওয়া হয়।’

 

বিএনপি নেতা বাবুলসহ দুজনকে হত্যা, একজনকে গুম
গত ১৫ ডিসেম্বর দিঘলী ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম-সম্পাদক আসাদুজ্জামান বাবুলের বাড়িতে অভিযান চালানোর সময় র‌্যাব তাকে গুলি করে হত্যা করেছে বলে দাবি করেন প্রত্যক্ষদর্শী তার স্ত্রী শাহীনুর আক্তার।

 

তিনি বলেন, ‘তারেক সাঈদ এসেই র‌্যাব-১১ পরিচয় দিয়ে বাবুলকে বলে আমাকে চিনতে পারিস, আমি তারেক সাঈদ। বাবুল তাকে চিনি বললে তারেক সাঈদই প্রথমে তার বুকে গুলি করে।’ ঘটনাস্থল থেকে মান্নান, সুমন ও বেলাল হোসেনকে আটক করে নিয়ে যায় র‌্যাব। পরে মান্নান ও সুমনের লাশ পাওয়া যায় পাশের গ্রামে। তবে এখনও পর্যন্ত বেলালের কোনো খোজ নেই বলে জানান তার স্ত্রী সায়রা খাতুন।

 

বিএনপি নেতা ফারুককে গুম
একইভাবে লক্ষ্মীপুর হাজিরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ওমর ফারুকে ৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম থেকে র‌্যাব-১১ পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়ে বলে অভিযোগ করেছে তার স্ত্রী পারভীন আক্তার। তিনি বলেন, ‘আমার অভিযোগ র‌্যাব-১১ বিরুদ্ধে। তারেক সাঈদের লোকেরা আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে গেছে।’

 

বিএনপি নেতা সোলাইমানকে অপহরণের পর হত্যা
লক্ষ্মীপুর থানা বিএনপির সহ-সম্পাদক শামসুল ইসলাম সোলাইমানকে এ বছরের ২৪ এপ্রিল রাতে রাজধানীর উত্তরা থেকে র‌্যাব পরিচয়ে আটকের দুদিন পর লক্ষ্মীপুরের বসুরহাটে তার লাশ পাওয়া যায়।

 

সোলাইমানের স্ত্রী সালমা ইসলাম মায়া বলেন, ‘তোরা (র‌্যাব) আমার স্বামীকে ছেড়ে দেয়ার কথা বলে আমার কাছ থেকে টাকা নিলি। বিনিময়ে খুন করলি আমার স্বামীকে। তাহলে তোদের হাতে খুন হওয়ার জন্যই কি তার জন্ম হয়েছিল। এর পুরো দায়-দায়িত্ব তারেক সাঈদের।’

 

যুবলীগ নেতাকে গুম করে ২ কোটি টাকা দাবি
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের যুবলীগ নেতা মো. ইসমাঈলের অপহরণের খবরও তারেক সাঈদ জানেন বলে অভিযোগ করছে তার স্ত্রী জোসনা আক্তার। তিনি বলেন, ‘র‌্যাব-১১ সিইও তারেক সাঈদ আমাকে বলে আপনার স্বামীকে পেতে হলে দুই কোটি টাকা লাগবে। তবে একথা আর কাউকে জানাতে পারবেন না। যদি জানান তাহলে আপনার স্বামীর লাশও পাবেন না।’

 

জোসনা আক্তার বলেন, ‘পরে টাকা যোগাড় করতে আমার শাশুড়ির জমি এবং আমার গহনাগাটি বিক্রিসহ আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে এক কোটি টাকা যোগাড় করি। কিন্তু স্বামীকে ফেরত পাইনি।’

 

এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, তদন্তে র‌্যাবের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াবে সরকার। তিনি আরো বলেন, ‘ব্যক্তি বিশেষের অবহেলার ফলেই এমন ঘটনাগুলো ঘটেছে। লোকমুখে ভাসা কথাগুলো আমরা খতিয়ে দেখব। যদি এসব ঘটনা সত্যি হয়, তাহলে বিচার হবে, ইনশাআল্লাহ।’

 

তবে নিখোঁজ মানুষগুলোর ভাগ্যে কী ঘটেছে তার কোনো খবর দিতে পারেননি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।