গাঁটে গাঁটে দুর্নীতি পেট্রোবাংলায়

পেট্রোবাংলা ও এর অধীন কোম্পানিগুলোতে চলছে ব্যাপক দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতি। মানা হচ্ছে না সার্ভিস রুলস। অভিযোগ আছে, দুর্নীতির পথ খোলা রাখতে সংশোধন করা হয়  পেট্রোবাংলার নীতিমালা। নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি নিয়ে বাণিজ্য যেন এখানে সাধারণ ব্যাপার।  বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হওয়া ও শাস্তি পাওয়া কর্মকর্তারা পদোন্নতি পেয়ে এখন উচ্চপদে আসীন। কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি প্রভাবশালী চক্রের (সিন্ডিকেট) সদস্যরা। সব মিলিয়ে দুর্নীতিতে আকণ্ঠ ডুবে আছে এই রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি।

 

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ড. হোসেন মনসুর দুর্নীতির বিষয়টি স্বীকার করে বলেছেন, দুর্নীতিবাজদের হাত অনেক লম্বা। তাই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া চালালে উল্টো তার (মনসুর)  বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলে তারা। আর একজন কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে মামলা ও আদালতের শাস্তির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, কাজ করতে গেলে এমন মামলা-মোকদ্দমা হয়েই থাকে।

 

নিয়োগ পরীক্ষার মানদণ্ড সংশোধন
খোঁজ নিয়ে জানা যায়,  সম্প্রতি পেট্রোবাংলায় নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ক্রাইটেরিয়ায় নম্বর বিভাজন সংশোধন করা হয়েছে।  নিয়োগ-বাণিজ্যে দুর্নীতির পথ প্রশস্ত করতেই এটি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।  ভাইভা বা মৌখিক পরীক্ষায় আগে নম্বর ছিল ১৫; এখন  করা হয়েছে ৩৫।  অন্যদিকে শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে আগে নম্বর ছিল ৩৫; সেটি কমিয়ে এখন করা হয়েছে ১৫। আগে পাস নম্বর ৬০ থাকলেও মানদণ্ড সংশোধন করে তা করা হয়েছে ৪০। এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠলে পরে পাস নম্বর ৪০-এর পরিবর্তে করা হয় ৫০। তা-ও করা হয় সম্প্রতি বড় ধরনের নিয়োগ-প্রক্রিয়া শেষ করার পর।

 

স্বজনপ্রীতি
নিয়োগ-বাণিজ্যের পাশাপাশি এখানে আছে স্বজনপ্রীতি। প্রায় সব নিয়োগের সময়ই এই স্বজনপ্রীতি ঘটে বলে জানায় সূত্র। সম্প্রতি প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া পাঁচ সহকারী ব্যবস্থাপকের উদাহরণ দিয়ে সূত্র জানায়, তাদের একজন টুঙ্গিপাড়া উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যানের স্ত্রী, একজন সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর ভাগ্নি, একজন জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিবের স্ত্রী এবং অন্য দুজন পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের আত্মীয়।

 

বাণিজ্যের আরেক পথ প্যানেল নিয়োগ
পেট্রোবাংলায় নিয়োগ-বাণিজ্যের প্রক্রিয়া সম্পর্কে একটি সূত্র জানায়, প্রথমে প্রয়োজনের চেয়ে কমসংখ্যক লোক নিয়োগ দেয়া হয়। পরে নিয়োগকালীন তালিকা (প্যানেল) থেকে আবার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। এ ক্ষেত্রে যেসব প্রার্থীর সঙ্গে সমঝোতা হয়, তাদের কাছে যথাযথভাবে প্রস্তাব পাঠানো হয়। আর যাদের সঙ্গে সমঝোতা হয় না, তাদের কাছে প্রস্তার পাঠানো হয় না। এ ক্ষেত্রে পোস্ট অফিসের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে চিঠি পাঠানো হয়েছে দেখিয়ে ফেরত আনা হয়। তাই তাদের পক্ষে (যাদের সঙ্গে সমঝোতা হয় না) চাকরিতে যোগ দেয়া সম্ভব হয় না।

 

পেট্রোবাংলার প্যানেল থেকে যখন তালিকা অন্য কোম্পানিতে পাঠানো হয়, তখন জ্যেষ্ঠতা বা কোনো ধরনের কোটা মানা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। কখনো কখনো এক কোম্পানির প্যানেল থেকে অন্য কোম্পানিতে নিয়োগ দেয়া হয়। সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট কোম্পানির এমডিদের যোগসাজশে কর্ণফুলী গ্যাস ও অন্য দুটি কোম্পানির নিয়োগ প্যানেল থেকে লোক নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

 

আউট সোর্সিং নিয়োগেও অনিয়ম
সূত্র জানায়, গত বছর পেট্রোবাংলা, তিতাস, পিজিসিএল, সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে কম্পিউটার অপারেটর, গাড়িচালক, পিয়নসহ বেশকিছু পদে কয়েক শ লোক নিয়োগ দেয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী, দরপত্রের মাধ্যমে আউট সোর্সিংয়ের এজেন্ট নিয়োগ করতে হয়। এজেন্টরা দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করে। এ ক্ষেত্রে ঘটছে উল্টো। জনপ্রতি দুই-তিন লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে পেট্রোবাংলার অসাধু সিন্ডিকেটটি নিয়োগপ্রাপ্ত লোকদের সঙ্গে সমঝোতা করে তাদের এজেন্টের কাছে পাঠায়। পরে আউট সোর্সিং এজেন্ট সেসব জনবল সরবরাহ করে। বিনিময়ে ওই এজেন্ট ওই সিন্ডিকেটের কাছ থেকে কমিশন পায়। এ প্রক্রিয়ায় নিয়োগপ্রাপ্ত লোকবলের বেশির ভাগই দুটি বিশেষ এলাকার বলে জানা যায়।

 

মন্ত্রণালয়ে জনবল  সরবরাহে ঘুষ
২০০৯ সালে পেট্রোবাংলা থেকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরের জন্য কম্পিউটার অপারেটর, গাড়িচালক ও পিয়ন পাঠাতে বলা হয়। কিন্তু এসব জনবল পেট্রোবাংলা বা কোম্পানি থেকে না পঠিয়ে দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে লোক নিয়োগ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তাদের কাছ থেকে জনপ্রতি তিন-চার লাখ টাকা নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

 

দুর্নীতির নতুন ক্ষেত্র কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানি
২০০৯ সালে বাখরাবাদ গ্যাস সিস্টেমস লিমিটেডের চট্টগ্রাম এলাকা নিয়ে কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানি করা হয়। নতুন কোম্পানি হওয়ায় সেখানে পদোন্নতির সুযোগ বেশি থাকায় বেশির ভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী সেখানে যাওয়ার চেষ্টা চালান। আর এতে সংঘটিত হয় বড় একটি বদলি-বাণিজ্য। ওই সময় ২৩০ জনের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কর্ণফুলীতে বদলি করার মাধ্যমে ছয়-সাত কোটি টাকার বাণিজ্য করা হয় বলে গুঞ্জন রয়েছে।

 

আরো অভিযোগ রয়েছে, কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানি গঠনের পরপরই মোটা অঙ্কের আন্ডার হ্যান্ড ড্রিলিং-এর মাধ্যমে ৫৫ জন কর্মকর্তাকে অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছেন পেট্রোবাংলার প্রভাবশালী কর্মকর্তা আইয়ুব খান চৌধুরীর দুই ছেলে। অ্যাডহক নিয়োগের দুই বছরের মধ্যেই তাদের চাকরি স্থায়ী করা হয়। স্থায়ীকরণ প্রক্রিয়ায় বিধান রয়েছে মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলা ও কোম্পানির প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠনের। কিন্তু অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি টের পেয়ে কমিটিতে  প্রতিনিধি দিতে অস্বীকৃতি জানায় মন্ত্রণালয়। পরে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিকে বাদ দিয়েই কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির প্রতিবেদনের সঙ্গে একমত না হওয়ায় পেট্রোবাংলার প্রতিনিধি স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকেন। পরে ডিজিএম পদমর্যাদার ওই কর্মকর্তাকে বাদ নিয়ে কমিটিতে অন্য এক কর্মকর্তাকে অন্তর্ভুক্ত করে প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করানো হয়।

 

কর্ণফুলীর সাংগঠনিক কাঠামোতে পদ না থাকা সত্ত্বেও গত বছর সেখানে সহকারী ব্যবস্থাপকসহ বিভিন্ন পদে ১৫ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়। এ নিয়োগকে বৈধতা দেয়ার জন্য তড়িঘরি করে প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক কাঠামোতে পরিবর্তন এনে ওই সব পদ তৈরি করা হয়।

 

ঘুষ গ্রহণে কালেক্টর
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঘুষ নেয়ার জন্য পেট্রোবাংলার একজন ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপকের কালেক্টর হিসেবে কাজ করছেন উপমহাব্যবস্থাপক জয়েন উদ্দিন, সহকারী ব্যবস্থাপক শাহনেওয়াজ ও পিয়ন আমিরুল। বিভিন্ন ব্যাংকে ওই ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপকের বেশ কিছু অ্যাকাউন্ট রয়েছে, যা তার আয়কর নথিতে উল্লেখ করা হয়নি। বড় অঙ্কের ঘুষ লেনদেনের ক্ষেত্রে তিনি ওই সব অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে থকেন। ২০১১ সালের ২৮ ডিসেম্বর এনসিসি ব্যাংক চট্টগ্রামের ওআর নিজাম রোড শাখায় তার একটি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ১৫ লাখ টাকার একটি চেক গ্রহণ করা হয়।

 

পদোন্নতিতে যত অনিয়ম
পেট্রোবাংলার চাকরিবিধি অনুযায়ী, জেনারেল ক্যাডারের সহকারী ব্যবস্থাপকের পদ থেকে উপব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি পেতে সাত বছরের কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। কিন্তু আইয়ুব খান চৌধুরী চার বছরেই পদোন্নতি পেয়ে যান। উপমহাব্যবস্থাপক থেকে মহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতির জন্য তিন বছরের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হলেও তিনি পদোন্নতি পেয়ে যান দুই বছর দুই মাসে। ২৫-২৬ বছর চাকরি করার আগে কোনো কর্মকর্তাই এ যাবৎ ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক হতে পারেননি। কিন্তু আইয়ুব খান চৌধুরী চাকরির ১৯ বছরের মধ্যেই ওই পদে আসীন হয়েছেন। তিনি ১৯৯৪ সালের ১৬ জানুয়ারি সহকারী ব্যবস্থাপক পদে চাকরিতে যোগ দেন। এর আগে আইএফআইসি ব্যাংকে কর্মরত থাকাকালে দুর্নীতির দায়ে চাকরিচ্যুত হন তিনি। বরখাস্ত হওয়ার সময় তার বয়স ৩০ বছরের বেশি ছিল। তিনি ভুয়া সনদ দেখিয়ে বয়স শিথিল করে পেট্রোবাংলায় যোগ দেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।

 

বিদেশে প্রশিক্ষণ নীতিমালা অচ্ছুত
সূত্র জানায়, কয়েক বছর ধরে কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণসংক্রান্ত নীতিমালার তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনেক সিনিয়র কর্মকর্তা এখনো বিদেশ যাওয়ার সুযোগ পাননি। আবার দুই-এক বছরের নবীন কর্মকর্তাকেও বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। কেউ কেউ বারবার বিদেশ যাচ্ছেন।

 

নিজ স্বার্থে সভার সম্মানী বৃদ্ধি
জানা যায়, নিজেদের স্বার্থে পেট্রোবাংলার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বোর্ড সভার সম্মানী ভাতা বাড়ানো হয়েছে তিন গুণের বেশি এবং সাধারণ সভার সম্মানী ভাতা বাড়ানো হয়েছে ছয় গুণের বেশি।  চেয়ারম্যান হোসেন মনসুর পেট্রোবাংলার অধীন ১৩টি কোম্পানির কোনোটিতে চেয়ারম্যান, আবার কোনোটিতে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আগে কোম্পানিগুলোর প্রতিটি বোর্ড মিটিংয়ে প্রত্যেক পরিচালকের জন্য সম্মানী ভাতা ছিল দুই হাজার ৫০০ টাকা। হোসেন মনসুর চেয়ারম্যান হওয়ার পর তিনি এই ভাতা বাড়িয়ে আট হাজার টাকা করেন। এতে মাসে তার নিজের সম্মানী ভাতা আসছে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা। আগে প্রতিটি বার্ষিক সাধারণ সভায় পরিচালকরা সম্মানী পেতেন ১৫ হাজার টাকা। সেটি বাড়িয়ে করা হয়েছে এক লাখ টাকা। এ খাতেও বছরে হোসেন মনসুরের আয় ১৩ থেকে ১৫ লাখ টাকা।

 

অবৈধ গ্যাস সংযোগ ও নিয়মবহির্ভূত পদায়ন
জ্বালানি বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সরকারি নিষেধাজ্ঞার পরও ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১০ হাজার ৬৮৮টি গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়েছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে সংযোগ দেয়া হয়েছিল ১৩ হাজার ১৪৫টি। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) সূত্র জানায়, মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেলস অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েশন (এমওএ) এবং নিজস্ব প্রবিধানমালায় সরকার যে সার্ভিস রুলস নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, তার কোনোটিই পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মেনে চলেন না। ওই সূত্রটি জানায়, পেট্রোবাংলার প্রশাসন, অর্থ ও পরিচালন বিভাগে তিনজন কর্মকর্তাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রেষণে পদায়ন করা হয়েছে।

 

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সুপারিশ ও বোর্ড সিদ্ধান্ত অমান্য
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডিজিএম আনিস উদ্দিন ও কাদের এইসান দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানে পরিচিত। তাদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে (এসিআর) বিরূপ মন্তব্য রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, তাদের পদোন্নতি পাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের ভিত্তিতে তারা গত বছর ব্যবস্থাপক পদ থেকে উপমহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি পান। গ্যাস চুরির হোতা হিসেবে মহাব্যবস্থাপক ধুর্ঝটি প্রসাদ দেব, উপমহাব্যবস্থাপক দীবাকর সেন ও আনিস উদ্দিন বিগত ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ওই সময় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সুপারিশ ছিল- এই কর্মকর্তাদের যেন ভবিষ্যতে কখনো চট্টগ্রামে নিয়োগ দেয়া না হয়। কারণ, এখানে কল-কারখানা বেশি। তাই গ্যাস চুরির সুযোগও এখানে বেশি। পরে কোম্পানির বোর্ডও একই সিদ্ধান্ত নেয়।

 

কিন্তু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সুপারিশ ও বোর্ডের সিদ্ধান্তকে অমান্য করে ২০১০ সালের পর এই তিনজনকে চট্টগ্রামে (কর্ণফুলী গ্যাসে) বদলি করা হয়। এ ক্ষেত্রে ১৫ লাখ টাকা লেনদেন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এই তিন কর্মকর্তাকে চট্টগ্রামে বদলি করা যাবে না মর্মে বোর্ড যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা এরই মধ্যে গায়েব করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

 

সিজিএ রিপোর্ট অগ্রাহ্য
কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিজিএ) কার্যালয়ের এক অডিট রিপোর্টে বলা হয়েছে, গ্যাস বিক্রির খাতওয়ারি বিভাজন সঠিকভাবে না করায় বিক্রয়মূল্যের জিওবির মার্জিন বাবদ দুই বছরে ৯৯ কোটি চার লাখ ৩১ হাজার ৫৫৩ টাকা সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। হোসেন মনসুরের বিরুদ্ধে লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল নির্মাণ নিয়ে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠে ২০১২ সালের জুনে। এর তদন্তে নামে জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসি। কিন্তু হোসেন মনসুর তদন্ত কমিটির পরপর চারটি চিঠির জবাব দেননি।

 

আদালতে দণ্ডেও ঠেকেনি পদোন্নতি
এখানে চাকরিবিধি প্রতিপালনে খুব একটা গরজ দেখা যায় না। আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাদণ্ড পাওয়ার পরও এক কর্মকর্তার গত পাঁচ বছরে তিন দফা পদোন্নতি পাওয়ার উদাহরণ রয়েছে।

 

ওয়ান-ইলেভেন সরকারের আমলে আদালতের নির্দেশ অমান্য করে নারায়ণগঞ্জের এক গ্রাহকের গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন তিতাস গ্যাস কোম্পানির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নওশাদ ইসলাম। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জের আদালতে মামলা হয়। ওই মামলায় তার বিরুদ্ধে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন আদালত। সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত হলে তিনি চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত হন। মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে পদোন্নতি দেয়া যায় না। আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার পরও নওশাদ তিন দফায় পদোন্নতি পান। ব্যবস্থাপক পদ থেকে উপমহাব্যবস্থাপক, উপমহাব্যবস্থাপক থেকে মহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি পান তিনি। গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

 

এ ব্যাপারে নওশাদ ইসলাম বলেন, “ছয় মাসের কারাদণ্ড হলেও আমি আপিলের মাধ্যমে সাজা চার মাস কমিয়েছিলাম। ওটা কোনো ফৌজদারি মামলা ছিল না। আমি দেওয়ানি কারাবাসে ছিলাম। দাপ্তরিক কাজ করতে গেলে ওরকম মামলার মুখোমুখি সব সময়ই হতে হয়।”

 

দুদকের অনুসন্ধানে বেরোচ্ছে নানা দুর্নীতি
অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ নানা অভিযোগে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান চলছে। এরই মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র জব্দ করা হয়েছে। তাতে বেরিয়ে আসছে দুর্নীতির নানা তথ্য। পাশাপাশি পেট্রোবাংলার অধীন ১৩টি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ-বাণিজ্য, টাকা আত্মসাৎ, ঘুষের বিনিময়ে পদোন্নতি,  ঠিকাদার নিয়োগে দুর্নীতি, ভয়-ভীতি দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের  অর্থ আদায়সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গত মার্চ থেকে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।

 

দুদক সূত্র জানায়, ২০০৯-১০ অর্থবছরে পেট্রোবাংলার অধীন বিভিন্ন সংস্থা থেকে লোপাট করা হয়েছে ২২০ কোটি ৭৪ লাখ ৩৮ হাজার ৪১৯ টাকা। সফলভাবে কাজ শেষ করার নামে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিধিবহির্ভূতভাবে এক কোটি ৭৩ লাখ ২৪ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। পেট্রোবাংলার আওতাধীন একটি সংস্থায় অঙ্গীকারনামার ভিত্তিতে ৯০ জন কর্মচারীকে উচ্চতর স্কেল দিয়ে বর্ধিত বেতন দেয়া হয়েছে। নিয়মবহির্ভূত হওয়ায় পরে তা বাতিল করা হলেও অতিরিক্ত দেয়া এক কোটি ৭০ লাখ ৩৯ হাজার টাকা আদায় করা হয়নি। দুদক আরও জানায়, সিস্টেম লসের নামে বছরে সাড়ে ৬০০ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি করা হচ্ছে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ও পরিচালকের (অপারেশন) ব্যবহৃত গাড়ির জ্বালানি ও ড্রাইভারের বেতনভাতা বিধিবহির্ভূতভাবে প্রতিষ্ঠান থেকে পরিশোধ করায় সরকারের ২১ লাখ ৯৮ হাজার ৫০৩ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। আত্মসাতের টাকায় হোসেন মনসুর রাজধানীর নিকেতনে একটি বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

 

অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পেট্রোবাংলার মহাব্যবস্থাপক আইয়ুব খান চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রায় দুই বছর ধরে আনুসন্ধান চালাচ্ছে দুদক।  বছর খানেক আগে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের সুপারিশ করে দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কমিশনে একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন। তবে এখন পর্যন্ত মামলা হয়নি। পরে অভিযোগগুলো দুই ভাগ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামর জন্য আলাদা অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ করে দুদক।

 

দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী জানা যায়, গত পাঁচ বছরে মহাব্যবস্থাপক আইয়ুব খান চৌধুরী নামে-বেনামে প্রায় ১০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময়কার অভিজ্ঞতার পর তিনি বেশির ভাগ সম্পদ করেছেন নিকটাত্মীয়ের নামে। শাশুড়ির নামে ঢাকা ও চট্টগ্রামে জমি, ফ্ল্যাট ও গাড়ি কিনেছেন। কোটি কোটি টাকার এফডিআর করেছেন। তিনি খিলগাঁওয়ের যে বাড়িতে থাকেন, সেটিও তার শাশুড়ির নামে। রাজধানীর গুলশানে দুটি ফ্ল্যাট বুকিং দিয়েছেন। চট্টগ্রামর চান্দগাঁও এলাকার ১৪ নম্বর রোডে তার স্ত্রীর নামে একটি পাঁচতলা বাড়ি রয়েছে। একই এলাকার ৮/এ নম্বর রোডে আরেকটি পাঁচতলা বাড়ি রয়েছে। চট্টগ্রামে ২০ শতাংশের একটি প্লট আছে।

 

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ড. হোসেন মনসুর বলেন, “আমি কখনো দুর্নীতি করিনি। আমার বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র চলছে। কর্মকর্তাদের অনেকেই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। যখন প্রতিবেদন তৈরি করা হচ্ছে তখন  শত শত কোটি টাকার সমস্যা দেখেছি। যারা অবৈধ সম্পদের পাহাড় বানিয়েছে আমি নিজে তদন্ত করে দুদকে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। দোষীদের বদলি করেছি। যাদের অবৈধ কাজে বাধা দেয়া হয়েছে তারাই আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে। যারা  অর্থের বিনিময়ে অবৈধ গ্যাস সংযোগ পেতে চেয়েছিল, তারাও আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।