ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন আর নেই

ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন আর নেই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি বুধবার সকালে মারা যান।

 

হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিনের মরদেহ। তার আগে আইসিইউতে তার কর্নিয়া সংগ্রহ করা হয়। মরহুমের স্ত্রী গুলবদন নেছা মনিকা এর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। মরহুমের স্ত্রী গুলবদন নেছা মনিকা।

 

গত ৪ অক্টোবর লাইফ সাপোর্টে দেয়ার আগে নিজের চোখ সন্ধানীকে দেয়ার ঘোষণা দেন ভাষা মতিন। বুধবার সকাল ৯টার দিকে লাইফ সাপোর্ট খুলে নিয়ে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।
গত ১৮ আগস্ট আবদুল মতিনকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার স্ট্রোক করেছিল। এর এক দিন পরই আবদুল মতিনকে বিএসএমএমইউতে ভর্তি করা হয়। ২০ আগস্ট তার মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করেন নিউরোসার্জারি বিভাগের অধ্যাপক আফজাল হোসেন। অস্ত্রোপচারের পরও তার অবস্থা অনেকটা অপরিবর্তিতই ছিল। এরই মধ্যে গত কয়েক দিনে মারাত্মক অবনতি ঘটে তার। বিএসএমএমইউতে ভর্তির পর থেকেই তিনি নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন।

 

ভাষামতিনের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া গভীর শোক প্রকাশ ও মরহুমের স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
দুই মেয়ের বাবা আবদুল মতিন মোহাম্মদপুরে পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। তার জন্ম ১৯২৬ সালের ৩ ডিসেম্বর, সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালী উপজেলার ধুবলিয়া গ্রামে।
তার বাবার নাম আব্দুল জলিল এবং মায়ের নাম আমেনা খাতুন। তিনি ছিলেন তাদের প্রথম সন্তান।
১৯৫২ সালে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে নেতৃত্বের ভূমিকার জন্য তিনি সবার কাছে ‘ভাষামতিন’ নামেই পরিচিত।
মরহুমের স্বজনেরা জানান, ভাষামতিনের শারীরিক অবস্থার অবণতি হলে গত ৪ অক্টোবর থেকে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। বুধবার সকাল নয়টার দিকে লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলা হয়। এর কিছু সময় পর তিনি মারা যান বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

ভাষা মতিন ডায়াবেটিস, রিকারেন্স হার্নিয়া ও প্রস্টেট গ্ল্যান্ডসহ বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় দীর্ঘদিন ভুগছিলেন। গত ১৮ আগস্ট মস্তিষ্কে রক্তরণে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ভাষা মতিনকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিইউতে নেয়া হয়।

২০ আগস্ট অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মস্তিষ্কের জমাটবাঁধা রক্ত অপসারণ করা হয়। তখন থেকেই তার অবস্থা অপরিবর্তিত ছিল।
এরই মধ্যে ৬ অক্টোবর ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালকে মরণোত্তর দেহ দান করেন। আর নিজের চক্ষু দিয়ে গেছেন সন্ধানীকে।
গত ১৮ আগস্ট অসুস্থ হয়ে পড়েন ভাষামতিন। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে নগরীর সিটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন ১৯ আগস্ট ভিসি প্রাণ গোপালের আগ্রহে তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে আনা হয়।

আবদুল মতিন ১৯৪৩ সালে রাজশাহী গভর্মেন্ট কলেজে ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষে ভর্তি হন। দুই বছর পর ১৯৪৫ সালে তিনি এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে তিনি ব্রিটিশ আর্মির কমিশন র্যা ঙ্কে ভর্তি পরীক্ষা দেন। ফোর্ট উইলিয়াম থেকে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কমিশন পান আবদুল মতিন। এরপর তিনি কলকাতা থেকে ব্যাঙ্গালুর যান।
কিন্তু ততদিনে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। ফলে তিনি একটি সার্টিফিকেট নিয়ে আবার দেশে ফিরে আসেন। দেশে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি ১৯৪৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাচেলর অব আর্টসে (পাশ কোর্স) ভর্তি হন। ফজলুল হক হলের ছাত্র মতিন ১৯৪৭ সালে গ্র্যাজুয়েশন কোর্স শেষ করেন এবং পরে মাস্টার্স করেন ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস বিভাগ থেকে।
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তোলায় তার অবদান অন্যতম। ১৯৫২ সালে আবদুল মতিনসহ অন্যরা ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত নেন। তারই নেতৃত্বে ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সারা বাংলার জন্য আন্দোলনের নানা কর্মসূচি।

আবদুল মতিন বেশ ক’টি বই রচনা করেন। এগুলো হলো- ‘ইউরোপের দেশে দেশে’ (১৯৬০), ‘কাস্তে’ (১৯৮৭), ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রবাসী বাঙালি’ (১৯৮৯), ‘প্রবাসীর দৃষ্টিতে বাংলাদেশ’ (১৯৯১), ‘শামসুদ্দিন আবুল কালাম ও তার পত্রাবলী’ (১৯৯৮), ‘শেখ হাসিনা: একটি রাজনৈতিক আলেখ্য’ (১৯৯২), আত্মজীবনী ‘স্মৃতিচারণ পাঁচ অধ্যায়’ (১৯৯৫), ‘জীবনস্মৃতি: একটি বিশেষ অধ্যায়’ (২০১২), রাজনীতি বিষয়ক ‘জেনেভায় বঙ্গবন্ধু’ (১৯৮৪), ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব: কয়েকটি প্রাসঙ্গিক বিষয়’ (১৯৯৩), ‘খালেদা জিয়ার শাসনকাল: একটি পর্যালোচনা’ (১৯৯৭), ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব: মুক্তিযুদ্ধের পর’ (১৯৯৯), ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব: কয়েকটি ঐতিহাসিক দলিল’ (২০০৮), ‘বিজয় দিবসের পর: বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ (২০০৯), ইতিহাস বিষয়ক ‘রোমের উত্থান ও পতন’ (১৯৯৫), ‘মহানগরী লন্ডন’ (১৯৯৬), ‘ক্লিওপেট্রা’ (২০০০), ‘দ্বি-জাতি তত্ত্বের বিষবৃক্ষ’ (২০০১), ‘ভলতেয়ার: একটি অনন্য জীবনকাহিনী’ (২০০২), ‘কামাল আতাতুর্ক: আধুনিক তুরস্কের জনক’ (২০০৩), ‘মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী বাঙালি: যুক্তরাজ্য’ (২০০৫), ‘ইউরোপের কথা ও কাহিনী’ (২০০৫); ‘ইউরোপের কথা ও কাহিনী’ (২০০৭), ‘ইউরোপের কথা ও কাহিনী’ (২০০৯)।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।