‘আমরা একই সাথে মুসলিম এবং নারীবাদী হতে পারি’

একজন নারী তার একটি হাত নিজের বুকে ধরে রেখেছেন এবং আরেকটি হাত তার পেটে চেপে রেখেছেন এবং এর পর তিনি শ্বাস নিচ্ছেন আর ছাড়ছেন।

কানাডার কুইবেকে নতুন একটি ধর্ম নিরপেক্ষ আইন পাশা করা হয়েছে যা সরকারি অফিস সমূহে নারীদের ধর্মীয় পোশাক পরিধানকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। আর এই আইন পাশ হওয়ার পর যে সমস্ত নারী তাদের কর্মক্ষেত্রে ধর্মীয় পোশাক পরিধান করেন তাদেরকে নতুন এই আইনের সাথে মানিয়ে উঠার জন্য ঠিক এভাবেই যোগ ব্যয়াম শেখানো হচ্ছে।

কিন্তু অনেক মুসলিম নারী নিজেদের কে কিছুতেই শিথিল করতে পারছেন না।

তারা কিছুক্ষণ নিজেদের চেয়ারে বসে থাকেন এবং এর পরেই আইনজীবী উইলিয়াম কোর্বাতলির নিকট এই আইনের ভেতর বাহির ব্যাখ্যা করে দেয়ার জন্য প্রশ্ন করেন।

তারা আসলে কি জানতে চাইছেন?
‘এই আইনের অর্থ কি? আমরা এখন কি করতে পারি?’ একজন মুসলিম নারী তার মাথা নাড়িয়ে কথা গুলো বলে উঠলেন। ‘এটি হাস্যকর। আমি এই আইনের অবসান চাই। এটি অন্যায়।’

মুসলিম নারীরা মতামত দেয়া শুরু করেছেন। তারা কি এই আইনের সাথে তাল মেলাতে পারবেন? অন্য কোনো পন্থায় তারা কি নিজেদের চুল ঢেকে রাখতে পারবেন?

স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা মেজদা মোউফাক বলেন, ‘আপনার হিজাবের উপরে এখন থেকে একটি পাগড়ি পরিধান করা শুরু করুন।’

কানাডার বিভিন্ন সোশ্যাল মাধ্যমে এই আইনের বিরুদ্ধে ইহুদি, ইসলাম, শিখ, খ্রিষ্টান ধর্ম সহ অন্যান্য ধর্মের অনুসারীরা এক হয়েছেন। অনেককে এই আইন নিয়ে ঠাট্টা করতে দেখা গিয়েছে।

আমরা একই সাথে মুসলিম এবং নারীবাদী হতে পারি
শিথিলায়ন শেখার জন্য যোগ দেয়া সারা হাসানেইন কুইবেকের নারীবাদী সংগঠন সমূহের সাথে আলাপ করতে চান যারা এই আইনের পক্ষে সাফাই গাইছেন।

তিনি বলেন, ‘আমি তাদেরকে এ কথা বলার জন্য চেষ্টা করছি যে, যা তোমরা সবসময় চিন্তা করে থাক… আমরা মুসলিমরা একই সাথে মুসলিম এবং নারীবাদী হতে পারি।’

সারা হাসনেইন বার্তা সংস্থা সিবিসি নিউজ কে এসব কথা বলার সময় যে সমস্ত নারীবাদী সংগঠন নতুন আইনটি সমর্থন করছেন তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

তিনি বলেন, ‘কুইবেক কিসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা আমি ঠিক বুজতে পারছি। আমি বুজতে পেরেছি যে, আপনাদের মা, আপনাদের দাদীরা নিজদের অধিকার আদায়রে জন্য অনেক সংগ্রাম করেছিল এবং আমি তাদে সমর্থন জানাই। আমরা এখন আপনাদের কে আশ্বস্ত করে বলতে চাই যে আমরা আপনাদের কে পেছনে চলে যাওয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি না।’

কুইবেকের নতুন এই আইনে সরকারি বিদ্যালয় সমূহের শিক্ষক, পুলিশ অফিসার এবং সরকারি আইনজীবীদের কে তাদের কর্ম ক্ষেত্রে ধর্মীয় পোশাক এবং ধর্মীয় প্রতীক ব্যাবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে।

সমালোচকদের মতে এই আইন মূলত যে সমস্ত মুসলিম নারী হিজাব পরিধান করেন তাদের কে লক্ষ্য করে পাশ করা হয়েছে।

নতুন এই আইনের পরিণতি হাস্যকর
কোর্বাতলি নামের একজন এই আইনের মধ্যকার অসঙ্গতি সমূহের সাথে একমত পোষণ করে বলেন, ‘ধর্মীয় প্রতীক’ শব্দ সমূহ একেবারেই অস্পষ্ট এবং তা হিজাবের চাইতেও খ্রিষ্টানদের ব্যবহৃত ক্রসের সাথে মিল খায়।

একই সাথে তিনি একথাও বলেন এই আইন অমান্য কারীদের কে চাকুরী চ্যুত করা হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘যখন আপনি এই আইন অমান্য করবেন তখন এর ফলাফল আপনার জন্য কিম্ভূতকিমাকার হবে।’

তিনি আশা করেন চলতি সপ্তাহে এই আইন কে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে মামলা দায়ের করা হবে এবং কুইবেক কানাডার ধর্মীয় স্বাধীনতার বাহিরে যেতে পারবে না।

এটি আমার মর্মস্থলে নাড়া দিয়েছে
আমিনা নামের একজন মুসলিম নারী অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে দুবছর মেয়াদী একটি কোর্সে ভর্তি হয়েছিলেন কিন্তু এখন তিনি তার কোর্স পূর্ণ করতে পারবেন কিনা তা নিয়ে শঙ্কায় পড়ে গিয়েছেন।

কুইবেকে আসার ১৪ বছর পর আমিনা শিক্ষকতা পেশায় নিজেকে গড়ে তুলবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু নতুন এই আইন হিজাব পরিধান কারী আমিনা বেশ বিপত্তি তে পেলে দিয়েছে।

তিনি শিথিলায়ন শেখার জন্য এসেছেন কারণ এর মাধ্যমে তিনি কিছুটা পরিবর্তণ আনতে পারবেন বলে আশা করছেন।
হানাদি সাদ নামের একজন নারী এই শিথিলায়ন কার্যক্রম চালু করেছেন যাতে করে কর্ম ক্ষেত্রে যেসব নারী হয়রানির শিকার হন তাদের কে আইনি এবং মানসিক সহযোগিতা করা যায়।

হানাদি সাদ বলেন, ‘এর মাধ্যমে আমরা একটি দ্বার উন্মুক্ত করেছি। এখন আপনি বৈষম্য কে টেক্কা দিতে পারবেন।’
তারা যেন আমার একটি অংশ নিয়ে নিয়েছে।

হানাদি সাদ লেবাননের গৃহ যুদ্ধ চলার সময় আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর পূর্বে নিজ পরিবারের সাথে কানাডায় আসেন। তিনি গত ১৮ বছর যাবত কুইবেকে বসবাস করেন। তার মতে এর পর থেকে কুইবেক তার আসল বাড়িতে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু এ বছর তিনি দ্বিতীয় বারের মত লেবানন সফর করেছেন এবং এবারই প্রথম লেবানন কে তার নিকট কুইবেকের চাইতেও বেশী করে নিজ বাড়ির মত মনে হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমি অনুভব করতে থাকি তারা যেন আমার অস্তিত্বের একটি অংশ কেড়ে নিয়েছে।’

‘এসব নারীদের কে তাদের হিজাব খুলে পেলার জন্য বলা আর আপনাকে আপনার গায়ের জামা খুলে পেলতে বলা একই কথা।’

তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের কে নারী হিসেবে আমাদের নিজ অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াতে হবে। সুতরাং এই সরকার যা করেছে তা আমাদের কে একসাথে হয়ে লড়তে বাধ্য করেছে।’