এমন কোন অপরাধ নেই যাতে পুলিশ জড়িত না

বছরকয়েক আগে পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থার একটি দল ফরিদ আহমেদের (ছদ্মনাম) কাছে কুড়ি লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। জনশক্তি রফতানিকারক ফরিদ আহমেদ একই সঙ্গে অবাক এবং ভীত হন।

ওরা সাদা পোশাকে হঠাৎ করেই আমার অফিসে এলো। অফিসে এসেই ইউনিফর্ম পরে নিলো। সবার মোবাইল, সিসি ক্যামেরা অফ করে দিলো। এরপর শুরু হলো পুরো অফিস তন্নতন্ন করে খোঁজা।

আমাকে বলা হচ্ছিল, আমি নাকি সাগরপথে মালয়েশিয়ায় লোক পাচার করি। আমি অস্বীকার করলাম। বললাম প্রমাণ দেন।

ফরিদ আহমেদ বলেন, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা অপরাধের কোন প্রমাণ দিতে পারেননি।

কিন্তু তাকে কিছু পাসপোর্টসহ আটক করে তাদের একটি অফিসে নেয়। এরপরই মানবপাচারকারী হিসেবে মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে বিশ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় তার কাছে।

তিনি বলেন, আমাকে বলা হল, যদি টাকা দেন তাহলে পাসপোর্টের ছোট্ট একটা মামলা দিয়ে চালান করে দেয়া হবে। আর টাকা না পেলে আমার নামে মানবপাচারকারী হিসেবে মামলা দেবে। মিডিয়া আসবে, আমার ব্যবসা ধ্বংস হয়ে যাবে।

আমি তখন প্রচণ্ড ভয়ে ছিলাম। শেষ পর্যন্ত ১২ লাখ টাকায় রফা হয়। ছোট্ট একটা মামলা দেয়া হয়। যেটায় পরদিন আমি কোর্ট থেকে জামিন পাই।

ফরিদ আহমেদের যে অভিজ্ঞতা বাংলাদেশে তা নতুন নয়।

এর আগেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোন কোন অংশের বিরুদ্ধে এভাবে ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি, ঘুষ নিয়ে অনৈতিক সুবিধা দেয়া, অবৈধভাবে টাকা লেনদেনের মতো দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে।

সম্প্রতি ক্যাসিনো বিরোধী অভিযানের পর পুলিশের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের এই আলোচনা ব্যাপক মাত্রা পেয়েছে।

পুলিশে দুর্নীতির চিত্র
বাংলাদেশে সরকারি সংস্থাগুলোর সেবাখাতে দুর্নীতি নিয়ে ২০১৭ সালে একটি জাতীয় ‘খানা’ জরিপ করে দুর্নীতি বিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল টিআইবি।

খানা বলতে সাধারনত: এক চুলায় খাওয়া-দাওয়া করেন এমন পরিবার বোঝায়।

সেই জরিপে সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে দুর্নীতিতে শীর্ষে স্থান পায় পুলিশ।

দেখা যায়, পুলিশের কাছে সেবা নিতে গিয়ে ৭২.৫% খানা দুর্নীতি-অনিয়মের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। বছরে টাকার অংকে যা দুই হাজার ১শ কোটি টাকারও বেশি।

পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, গ্রেফতার, ট্রাফিক সংক্রান্ত বিষয়, পাসপোর্টের পুলিশ ভেরিফিকেশন, মামলা দায়ের, চার্জশীট এমনকি জিডি করতে গিয়েও ৭০ শতাংশেরও বেশি মানুষ খানা দুর্নীতির শিকার হয়েছেন।

জরিপে দেখা যায়, সবেচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয় চার্জশীট সংক্রান্ত বিষয়ে। টাকার অংকে যা গড়ে ২১ হাজার টাকারও বেশি।

হাইওয়ে পুলিশ, স্পেশাল ব্রাঞ্চ, থানা পুলিশসহ সকল সংস্থাতেই কমবেশি দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে টিআইবির ঐ জরিপে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, জরিপ করতে গিয়ে তারা দেখেছেন পুলিশের মধ্যে দুর্নীতির ব্যাপ্তি ও গভীরতা অনেক।

তিনি বলেন, পর্যবেক্ষণে আমরা যেটা দেখতে পাই যে, এখন এমন কোন অপরাধ নেই যাতে পুলিশ জড়িয়ে পড়ছে না। এটার ব্যপ্তি খুব গভীর, বিস্তৃত এবং সকল পর্যায়ে। কেউ কেউ যেমন সততার দৃষ্টান্ত দেখাচ্ছেন, তাদের সংখ্যা কম আবার অবস্থানও দুর্বল হয়ে আসছে।

ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, একদিকে যেমন ব্যক্তিগতভাবে নৈতিক অবক্ষয়ের ঘটনা আছে। অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে পুলিশকে ব্যবহার করার যে প্রবণতা, সেখান থেকেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

তার মতে, দুর্নীতি এতো বিস্তৃত হওয়ার কারণ এর সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ।

এর ফলে যেমন অনেকে জবাবদিহিতার বাইরে থাকার সুযোগ পান। আবার অনেকে রাজনৈতিকে উদ্দেশ্য সাধনে বাধ্য হওয়ার পর নিজেও ব্যক্তিগতভাবে অন্যান্য অপরাধে জড়িয়ে অর্থ উপার্জনের পথ ধরছেন।

তিনি বলছেন, বাহিনীর মধ্যে যেমন দুর্নীতি-অনিয়ম-অপরাধের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তেমনি রাজনৈতিক কারণে পুলিশকে অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়া বন্ধ করতে হবে।

পুলিশের বক্তব্য:
পুলিশ সদর দপ্তর জানাচ্ছে, পুলিশের যারা দুর্নীতিতে জড়াচ্ছেন, সেটা সংখ্যা হিসেবে খুব বেশি নয়।

তবে কম বেশি যেটাই হোক, এরকম অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে শক্ত ব্যবস্থা নেয়া হয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের সহাকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) সোহেল রানা জানাচ্ছেন, গত ২০ মাসে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে ১৪ হাজারেরও বেশি পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।