মহাজোটে টানাপড়েন

বিশেষ সংবাদদাতা

ক্ষমতাসীন মহাজোটের দুই প্রধান শরিক আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির মধ্যে টানাপড়েন চলছে। দুই দলের মধ্যে একটি বিষয়ে মোটামুটি ঐকমত্য রয়েছেÑ সেটি হলো বিএনপিকে কোনোভাবেই নির্বাচনে অংশ নিতে দেয়া যাবে না। দুই দলেরই ধারণা, বিএনপি বা ১৮ দল নির্বাচনে অংশ নিলে আওয়ামী লীগ বা জাতীয় পার্টির পক্ষে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে বাইরে যাই বলা হোক না কেন তারা সব দলের অংশগ্রহণে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক তা কামনা করে না। মহাজোটের দুই প্রধান শরিকের মধ্যে আওয়ামী লীগ চাইছে জাতীয় পার্টি এবং সম্ভব হলে ১৮ দলের দুয়েকটি খুচরা দলকে নিয়ে নির্বাচন করতে। সে অবস্থায় আওয়ামী লীগের জেতার পথে কোনো বাধা থাকবে না। অন্য দিকে জাতীয় পার্টি মনে করছে বিএনপিকে বাইরে রেখে নির্বাচন করা গেলে বিএনপির নেতাকর্মীরা দলে দলে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেবেন। এতে এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় যেতে সক্ষম হবে। এ কারণে সম্প্রতি ভারত সফরের সময় জাতীয় পার্টি প্রধান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট এইচ এম এরশাদ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি আর কাউকে ক্ষমতায় নিয়ে যেতে কোলাবরেটর হবেন না। এরশাদের এ বার্তায় সরকার ুব্ধ হওয়ায় তার বিরুদ্ধে চাপা থাকা মামলাগুলো আবার পুনরুজ্জীবিত করা হচ্ছে। এতে তিনি কিছুটা ভয়ও পেয়ে গেছেন। মহাজোটের উচ্চপর্যায়ের সূত্রগুলো থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও দফতরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত অবশ্য এ ব্যাপারে গতকাল সন্ধ্যায় নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। নির্বাচনের এখনো প্রায় দেড় বছর বাকি। ওই নির্বাচনে বিএনপিসহ সবাইকেই আসতে হবে। কারণ, আমরা একদলীয় কোনো নির্বাচনের চিন্তা করছি না। সে জন্য নির্বাচনের আগে তারা অবশ্যই আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় আসবে বলে আমরা আশাবাদী।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের মন্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মহাজোটের বাইরেও জাতীয় পার্টির বা এরশাদের ব্যক্তিগত মত আছে। সে অবস্থান থেকেই তিনি বিভিন্ন কথা বলে থাকতে পারেন। তবে আগামী নির্বাচনেও মহাজোট অটুট থাকবে বলে আমরা আশাবাদী।
অন্য দিকে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদ এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘আমি বর্তমানে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে অবস্থান করছি। এ ছাড়া দলের নীতিনির্ধারণী বিষয়ে চেয়ারম্যান এবং মহাসচিবই কথা বলবেন।’
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ বা মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার দু’জনের মধ্যে কাউকেই যোগাযোগের চেষ্টা করে পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড আগামী নির্বাচন সামনে রেখে একাধিক বিকল্প ঠিক করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বিএনপিকে বাইরে রেখে নির্বাচন করা। এ ক্ষেত্রে দলীয় সরকারের অধীনে যেহেতু বিএনপি নির্বাচনে যাবে না, সে কারণেই এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেয়া হবে না। এ ক্ষেত্রে মনে করা হচ্ছে বিএনপি দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিরুদ্ধে যত বড় আন্দোলন করুক না কেন পুলিশ, র‌্যাব ও প্রশাসন ব্যবহার করে তা দমন করা সম্ভব হবে। আর একবার নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হলে বিএনপি বা ১৮ দলের পক্ষে সরকারের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কিছুই করা সম্ভব হবে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, দলীয় সরকারের অধীনে একতরফা নির্বাচনের বিরুদ্ধে ১৮ দলের আন্দোলন দমানোর জন্য নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের মামলা তৈরি ও চলমান রাখা হয়েছে। আন্দোলনে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে মাঠপর্যায়ের এমন অনেক সংগঠকের স্থান ইতোমধ্যে গুমের তালিকায় চলে গেছে। প্রয়োজনে এ তালিকা আরো দীর্ঘ করা হবে। আন্দোলন দুর্বল করার জন্য বিরোধী দলের মধ্যে প্রয়োজনে বিভাজনও আনা হবে।
জানা গেছে, এ পরিকল্পনা সামনে রেখে জাতীয় পার্টি প্রধান এরশাদের সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ বৈঠক হয়। সে বৈঠকে সাবেক প্রেসিডেন্টকে বিরোধী শিবিরে দাঁড় করিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা জানানো হয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে যথেষ্ট সমালোচনা করার অধিকারও দেয়া হয় এরশাদকে। বলা হয়, বিএনপি ছাড়া অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টি জিতে গেলেও শেখ হাসিনার কোনো আপত্তি থাকবে না। মুখে এরশাদ জিতলে আপত্তি থাকবে না বলে উল্লেখ করা হলেও আওয়ামী লীগ প্রধান নিশ্চিত যে আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টিতে নির্বাচন হলে তাতে এরশাদের দলের জেতার কোনো সম্ভাবনা নেই।জানা গেছে, মহাজোটের দুই প্রধান দলের সমঝোতায় জাতীয় পার্টি বিরোধী দলের আবহ তৈরির অভিযানে নামার পর আরেকবার ক্ষমতায় যাওয়ার আকাক্সা পেয়ে বসে সাবেক প্রেসিডেন্টকে। তিনি কূটনৈতিক মহলে বিএনপি ক্ষমতায় এলে অতীতের পুনরাবৃত্তি হওয়ার ভয় দেখান। অন্য দিকে আওয়ামী লীগের বিপরীতে তিনি আগামী নির্বাচনে ক্ষমতায় যেতে পারবেন বলে ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেন।
আওয়ামী লীগের শীর্ষ সূত্র থেকে জানা গেছে, এত দিন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদের তৎপরতাকে বড় ধরনের সন্দেহের চোখে দেখা হয়নি। বাংলাদেশের একাধিক কূটনৈতিক অংশীদার দেশে এরশাদকে পাঠানোর পর দেখা গেছে সেসব স্থানে সরকারের বার্তা পৌঁছানোর পরিবর্তে তিনি নিজের বার্তা পৌঁছাচ্ছেন। কিন্তু সাবেক প্রেসিডেন্টের ভারত সফরের বিস্তারিত তথ্যাদি পাওয়ার পর সরকারপ্রধান কোনোভাবেই আর এরশাদের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না। এ সফরে ভারতের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের সাথে একান্ত বৈঠকগুলোতে বিএনপিকে বাইরে রেখে নির্বাচনের ওপর যেমন জোর দিয়েছেন তেমনি এরশাদ আওয়ামী লীগের পরিবর্তে জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতায় নিয়ে গেলে প্রতিবেশী দেশটির স্বার্থ রক্ষিত হবে মর্মে ভারতীয় নেতাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন। গোয়েন্দা সূত্র থেকে এরশাদের সফরের বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে সরকার।
জানা গেছে, সরকারের শীর্ষপর্যায়ের নির্দেশে এরশাদের বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলো নতুন করে সচল হওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন এরশাদ। ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার না হওয়ার ঘোষণা দিলেও নবতিপর বয়সে তিনি আর জেলে যেতে চান না। তিনি অবশ্য বৃহৎ প্রতিবেশীর হস্তক্ষেপে বড় রকমের বিপদের শঙ্কা কেটে যাবে বলেও মনে করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতার মতে, এরশাদ স্বাধীনভাবে ছোটাছুটির অবস্থা এখন আর নেই। তিনি নতুন করে রঙিন স্বপ্ন দেখতে চাইলে তা দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে। কৌশলগত কারণে জাতীয় পার্টিকে সরকার বেশি ক্ষ্যাপাতে চায় না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অন্য দিকে জাতীয় পার্টির এক শীর্ষ নেতা বলেন, জনগণ এরশাদের আহ্বানে সাড়া দিতে শুরু করেছেন। মহাজোটের সাথে জাতীয় পার্টির সম্পর্কের পাট চুকানো এখন সময়ের ব্যাপার।
এ দিকে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভের জন্য গোপন কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে বিএনপি ও ১৮ দল ভীতি ছড়িয়ে দেয়ার কৌশল নেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে ভারতীয় কিছু সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ১৮ দল বা বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ভারতের সাত রাজ্যের বিদ্রোহীরা আবার বাংলাদেশের সমর্থন পাবে। সংখ্যালঘুদের সুবিধাজনক অবস্থান থাকবে না। তাদের মধ্যে ভারতে চলে যাওয়ার প্রবণতা শুরু হবে। তবে এসব প্রচারণার পরও বাংলাদেশের বৃহৎ প্রতিবেশী দেশটি বিএনপি বা ১৮ দলকে বাদ দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানে তাদের স্বার্থ রক্ষিত হবেÑ এমন সিদ্ধান্তে আসেনি বলে জানা গেছে। প্রতিবেশী দেশটির নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ দেশটির স্বার্থসংরক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে সব রাজনৈতিক পক্ষের সাথে সম্পর্ক রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে বাংলাদেশের নির্বাচনের ব্যাপারে দেশটির কৌশল এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানা গেছে। অন্য দিকে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো নির্বাচন বাংলাদেশে চায় না বলে আভাস দিয়েছে। একতরফা নির্বাচনে তাদের সম্মত করা সহজ হবে না বলে জানা গেছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।