শনিবার আবারো ইবি শিক্ষকদের ওপর ছাত্রলীগের সশস্ত্র হামলা: আহত ৩৫

আবারো ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শনিবার  শিক্ষকদের ওপর সশস্ত্র হামলা করেছে ছাত্রলীগের নেতারা। এতে কমপক্ষে ৩৫ জন শিক্ষক আহত হয়েছেন। গুরুতর আহত শিক্ষকদের কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ জেলার বিভিন্ন মেডিকেলে ভর্তি করা হয়েছে। হামলার সময় শিক্ষকদের মোবাইল, হাত ঘড়িসহ প্রয়োজনীয় জিনিস লুট করা হয়েছে বলে শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন।

এদিকে, ক্লাস-পরীক্ষার দাবিতে ছাত্রলীগ ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা ৬ ঘণ্টা কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে। এতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হলে ভোগান্তিতে পড়ে হাজারো যাত্রী।

জানা যায়, শনিবার সকাল ১০টায় ছাত্রলীগ ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা চালুর দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভবনের সামনে গণঅনশন কর্মসূচি শুরু করে। একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয় মেইন গেইটের সামনে কুষ্টিয়া-খুলনা মহসড়ক অবরোধ করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও ছাত্র উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষকদের জোরপূর্বক ক্লাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহণে বাধ্য করতে শিক্ষক সমিতির অফিসে তালা দিয়ে মহাসড়ক অবরোধ অব্যাহত রাখে ছাত্রলীগ ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয় মেইন গেইট ও মহাসড়ক অবরুদ্ধ থাকায় সকল শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন।

এ অবস্থায় আন্দোলনরত শিক্ষকরা চলমান সংকট নিরসন ও ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে ভিসির সাথে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎ শেষে শিক্ষক সমিতির অফিসও তালাবদ্ধ থাকায়  শিক্ষকরা অনুষদ ভবনের দ্বিতীয় তলায় শিক্ষক লাউঞ্জে অবস্থান নেন।

পরে বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে ছাত্রলীগ সভাপতি জাহাঙ্গীর হুসাইন ও সাধারণ সম্পাদক শামছুজ্জামান তুহিনের নেতৃত্বে মহাসড়ক থেকে দুই শতাধিক নেতা-কর্মী অনুষদ ভবনের কলাপসিবল গেটের তালা ভেঙে শিক্ষক লাউঞ্জে সশস্ত্র হামলা করে।

তারা লাঠি দিয়ে শিক্ষকদের পেটাতে থাকে। হামলা থেকে রক্ষা পেতে শিক্ষকরা মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। এরপর তাদের ওপর আক্রমণ অব্যাহত থাকে। এ সময় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা শিক্ষক লাউঞ্জে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। হামলায় কমপক্ষে ৩৫ জন শিক্ষক আহত হন।

হামলার সময় মোবাইল, হাত ঘড়িসহ প্রয়োজনীয় জিনিস লুট হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা।

হামলার সময় প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ এইচ এম আক্তারুল ইসলাম জিল্লু নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেন বলেও অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা।

ভিসির সাথে সাক্ষাতের পরপরই ছাত্র উপদেষ্টা ও প্রক্টর এবং ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এ হামলার পরিকল্পনা করে বলে অভিয়োগ করেছে বঙ্গবন্ধু পরিষদ, শিক্ষক সমিতি জিয়া পরিষদসহ আন্দোলনকারী শিক্ষকরা।

তারা জানান, এসব ব্যক্তির নির্দেশেই এসপি চলে যান এবং ক্যাম্পাস থেকে সকল পুলিশ প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।

ছাত্রলীগের হামলায় ইবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. নজিবুল হক, সাধারণ সম্পাদক ড. ইকবাল হোছাইন, সাবেক সভাপতি ড. এয়াকুব আলী, সাবেক সভাপতি ও জিয়া পরিষদ সভাপতি ড. আলীনুর রহমান, ড. আ ছ ম তরিকুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধু পরিষদ সহ-সভাপতি ড. মাহবুবুর রহমান, ড. কাজী আতিকুর রহমান, ড. মাহবুবুর রহমান, ড. আহসান উল্লাহ ফয়সাল, ড. রুহুল আমিন ভুইয়া, ড. রেজওয়ানুল ইসলাম, ড. আব্দুল লতিফ, ড. মোস্তাফিজুর রহমান, তারিখ হাসান প্রমুখ আহত হয়েছেন।

হামলার এক পর্যায়ে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সামছুজ্জামান তুহিন অস্ত্রের মুখে শিক্ষক সমিতির সভাপতিকে শনিবার থেকেই ক্লাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ঘোষণা দিতে বলেন। পরে ড. নজিবুল হক শনিবার ক্লাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন।

আন্দোলনরত একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করে বলেন, ‘প্রক্টর ড. আক্তারুল ইসলাম জিল্লু ও ছাত্র উপদেষ্টা ড. টিএম লোকমান হাকিমের প্রত্যক্ষ নির্দেশে এবং তার নেতৃত্বেই ছাত্রলীগ তাদের ওপর হামলা করেছে। তাছাড়া তার নির্দেশেই কুষ্টিয়ার এসপি ক্যাম্পাস থেকে পুলিশ প্রত্যাহার করে নিয়েছে।’

বঙ্গবন্ধু পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘ছাত্রলীগ বহিরাগত সন্ত্রাসী ও কিছু সাধারণ ছাত্রের আবেগকে ব্যবহার করে শিক্ষকদের ওপর হামলা চালিয়েছে।’

তিনি ঘটনার ধিক্কার জানিয়ে বলেন, প্রক্টর এবং ছাত্র উপদেষ্টার উপস্থিতিতে শিক্ষকদের ওপর হামলা হলেও তারা নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেন, এটা দুঃখজনক।

‘শিক্ষকদের ওপর হামলার পূর্ব মুহূর্তে ক্যাম্পাস থেকে পুলিশ প্রত্যাহার করে ভিসি প্রমাণ করেছেন হামলা তার নির্দেশেই হয়েছে।’- যোগ করেন জাহাঙ্গীর হোসেন।

জিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. রুহুল আমিন ভূইয়া বলেন, যেভাবে শিক্ষকদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে, তা কল্পনাতীত।

তিনি হামালার ঘটনায় প্রশাসনের সম্পৃক্তার অভিযোগ করে হামলাকারী সন্ত্রাসীদের বিচার দাবি করেন।

শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. নজিবুল হক বলেন, ‘শিক্ষকদের ওপর যে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে, তার নিন্দা ও ধিক্কার জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। শিক্ষকদের হত্যার উদ্দেশ্যেই এই হামলা চালানো হয়েছে।’

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘প্রক্টর, ছাত্র উপদেষ্টা ও ভিসির প্রত্যক্ষ নির্দেশেই সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়েছে। প্রক্টরের নির্দেশেই কুষ্টিয়ার এসপি ও পুলিশ নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। আমরা ঘটনার তদন্তে বিচার বিভাগীয় কমিটি চায়।’

তবে পরবর্তী কর্মসূচির ব্যাপারে নজিবুল হক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।