আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রায় দুই হাজার ৯০০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারী সংস্থা মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে ছয় শতাধিক অভিযোগ পেয়েছে। এসব অভিযোগ যাচাই বাছাই করে গুরুত্বের ভিত্তিতে  তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সিনিয়র কর্মকর্তা এম সানাউল হক  বলেন, “প্রায় দুই হাজার ৯০০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে।”

নতুন করে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের বিষয়ে সংস্থার কর্মকর্তা সানাউল হকের সঙ্গে যোগযোগ করা হলে তিনি জানান, তারা হবিগঞ্জে সৈয়দ কাওসারের বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য সেখানে অবস্থান করছেন।

সানাউল হক নতুন বার্তাকে বলেন, “হবিগঞ্জ অধিবাসী কাওসার নামকরা টেক্সটাইল মিলের মালিক। প্রচুর সম্পদের অধিকারী। ট্রাইব্যুনালের বিচারকে বাধাগ্রস্ত করতে তিনি অঢেল টাকা খরচ করে দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।”

তিনি বলেন, “মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ ওঠার পর থেকে তিনি পালাতক রয়েছেন। তবে তার বিরুদ্ধে গত দেড় বছর ধরে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। আমরা আরো কিছু তথ্য, উপাত্ত সংগ্রহ ও তদন্তের স্বার্থে হবিগঞ্জ এসেছি। হবিগঞ্জ থেকে ফিরে আসার পরে কাওসারসহ আরো কিছু মামলার বিষযে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া।”

তিনি বলেন, “১২ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের প্রস্তুতির কাজ চলছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন হবিগঞ্জের সৈয়দ কাওসার, ফরিদপুরের নগরকান্দার মেয়র খোকন, জামায়াত নেতা আব্দুস সুবহান, এটিএম আজহারুল ইসলাম, যশোরের মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন।”

সানাউল হক বলেন, “১২ জনের মধ্যে আব্দুস সুবহান, এটিএম আজহারুল ইসলামকে তদন্তের স্বার্থে এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনালের আদেশে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধেও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।”

তিনি বলেন, “তদন্ত সংস্থায় আসা দুটি মামলা ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছে। মামলা দুটির আসামি হচ্ছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হাজী মোবারক ও পটুয়াখালীর রুস্তম আলী। এছাড়া তদন্তকারী সংস্থা গত ১৩ অক্টোবর মো. আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মাঈনুদ্দীনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে। এ মামলায় আরো অধিকতর তদন্ত চলছে।” শিগগিরই তা দাখিল করে ফরমাল চার্জ প্রস্তুত করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন এ কর্মকর্তা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, “অভিযোগ আমলে নেয়ার পর তারা হাজির না হলে তাদের অনুপস্থিতিতেই আনুষ্ঠানিক বিচার কার্যক্রম শুরু হবে।”

আশরাফুজ্জামান ও মাঈনুদ্দীন একাত্তরে  ইসলামী ছাত্রসংঘের (জামায়াতের তৎকালীন ছাত্র সংগঠন) সদস্য ছিলেন। বর্তমানে আশরাফুজ্জামান খান আমেরিকা এবং চৌধুরী মাঈনুদ্দীন লন্ডন প্রবাসী বলে জানায় তদন্তকারী সংস্থা।

দুই হাজার ৯০০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত সংস্থার প্রধান আব্দুল হান্নান খান  বলেন, “তদন্তে অনেকের নাম পাওয়া গেলেও তাদের মধ্যে অনেকে বেঁচে নেই, আর সবকিছু যাচাই-বাছাই করে গুরুত্ব বিবেচনায় পর্যায়ক্রমে আসামি নির্বাচন করে ট্রাইব্যুনালে উত্থাপন করা হবে।”

মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পালাতক জামায়াতের সাবেক রোকন আবুল কালাম আযাদ ও জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার মামলা বিচারিক কার্যক্রম শেষে রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছে ট্রাইব্যুনাল।

অন্য দিকে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলা পুনরায় যুক্তিতর্ক শুরু করতে আদেশ দিয়েছে। যুক্তিতর্ক শেষে রায়ের তারিখ ধার্য হবে।

এছাড়া জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযমের মামলায় সাফাই সাক্ষ্যগ্রহণ, বিএনপি নেতা ও সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চোধুরী ও আব্দুল আলীম, জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচারে গঠিত দুটি  ট্রাইব্যুনালে এ বিচার কার্যক্রম চলছে।

ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু বলেন, “সব ধরনের আইনি সুযোগ-সুবিধা এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় বিচার কার্যক্রম চলছে। প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষ এ সংক্রান্ত বিদ্যমান আইন ও বিধি অনুযায়ী মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া পরিচালনা করছেন।” সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিক সহযোগিতায় এ বিচার কার্যক্রম সফল হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচারের লক্ষে ২০১০ সালের ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, তদন্তকারী সংস্থা ও আইনজীবী প্যানেল (প্রসিকিউশন) গঠন করা হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রমকে আরো তরান্বিত করতে চলতি বছরের ২২ মার্চ আরো একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।”

টিপু বলেন, “আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন-১৯৭৩ ও এর অধীনে প্রণীত রুলস অনুযায়ী এ বিচার কার্যক্রম চলছে। এ বিচার কার্যক্রমে  প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষ সব ধরনের আইনি সুবিধার মধ্যদিয়ে নিজ নিজ পক্ষে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।”

তিনি বলেন, “গণমাধ্যম , বিভিন্ন পর্যবেক্ষকরা এ বিচারিক কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করছে এবং বিচার সম্পর্কে  যেন কোনো ধরনের প্রশ্ন না ওঠে সেদিকে খেয়াল রেখে বিচারিক কাজ চলছে।”

প্রধান প্রসিকিউটর বলেন, “বিশ্বের অন্যান্যদেশে এ সংক্রান্ত বিচারে আপিলের বিধান না থাকলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন-১৯৭৩ এ আপিলের বিধান রাখা রয়েছে। ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সংক্ষুদ্ধরা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিলের সুযোগ পাবেন।”

তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত তথা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা। এ লক্ষ্যে বর্তমান জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই এ বিচার অনুষ্ঠানের সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হয়।”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।