বেগম জিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কামনা করে রাষ্ট্রদ্রোহমূলক কাজ করেছেন : প্রধানমন্ত্রী

গতকাল সরকারদলীয় সাংসদেরা সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সমালোচনায় মুখর ছিলেন। ওয়াশিংটন টাইমস-এ লেখা খালেদা জিয়ার নিবন্ধকে দেশের স্বার্থবিরোধী ও রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধের শামিল বলে উল্লেখ করে তাঁরা বলেন, এ জন্য খালেদা জিয়াকে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
ওয়াশিংটন টাইমস পত্রিকায় এক নিবন্ধে বিএনপির চেয়ারপারসন লিখেছেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এখন হুমকির মুখে। গোটা দেশ একটি পরিবারের হাতে জিম্মি। উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে দেশটির সামনে এগিয়ে যাওয়ার যে সম্ভাবনা ছিল, দুর্নীতির কারণে তা-ও ম্লান হতে বসেছে। নির্বাচনে যাতে ভোটারদের সুষ্ঠু মতামত প্রতিফলিত হয়, সে জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো মিত্র দেশগুলোর জোরালো ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। গণতন্ত্রের পথ থেকে বাংলাদেশের বিচ্যুতি ঠেকাতে পশ্চিমা দেশগুলোকে আরও ভূমিকা রাখার আহ্বান রয়েছে এই নিবন্ধে।
৩০ জানুয়ারি প্রকাশিত ওই নিবন্ধে বিরোধীদলীয় নেতা আরও বলেন, শেখ হাসিনা সরকারে যাঁরা গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ভ্রমণ ও অন্যান্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে পশ্চিমা শক্তিগুলো। তারা বলেছেন, বেগম জিয়া বাংলাদেশের ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কামনা করে রাষ্ট্রদ্রোহমূলক কাজ করেছেন।

বিএনপি চেয়ারপারসন যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ নিয়েছেন দাবি করে মহাজোট এমপি-মন্ত্রীরা বলেন, এজন্য তার বিচার হবে। বেগম জিয়া দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন এবং অসত্য কথা বলেছেন। বুধবার সন্ধ্যায় সংসদ পয়েন্ট অব অর্ডারে সরকারি দলের সদস্যরা বেগম জিয়ার ওই নিবন্ধের তীব্র সমালোচনা করে দীর্ঘ বক্তব্য রাখেন। এ সময় ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী অধিবেশনের সভাপতিত্ব করছিলেন।
বেগম জিয়ার ইংরেজী ভাষায় প্রকাশিত ওই নিবন্ধটির বিভিন্ন বিষয়ের উল্লেখ করে এর কড়া সমালোচনা করা হয়। একই সঙ্গে তারা খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সংসদে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণেরও দাবি করেন। তখন সংসদ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ নিয়ে অনির্ধারিত আলোচনার সূচনা করেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম। প্রায় দুই ঘণ্টা আলোচনা চলে।
শেখ সেলিম বলেন, ‘খালেদা জিয়া যুদ্ধাপরাধের বিচার নস্যাৎ করতে দেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। সরকারের বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে তিনি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বলেছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে তিনি ওবামার হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। ওবামা কে? তত্ত্বাবধায়ক সরকার যদি দরকার হয়, জনগণ দেবে। ওবামার ওখানে কি তত্ত্বাবধায়ক আছে?’
তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘সাংবিধানিক একটি পদে থেকে খালেদা জিয়া কীভাবে নিজের দেশের বিরুদ্ধে অন্য রাষ্ট্রকে ব্যবস্থা নিতে বললেন, ভেবে আমি বিস্মিত হয়েছি। খালেদা জিয়া এমন সময় লেখাটি লিখেছেন, যখন দেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার চলছে। তিনি বলতে চেয়েছেন, গোলাম আযম, নিজামী, সাঈদী, কাদের মোল্লারা যুদ্ধাপরাধী নয়। বাংলাদেশ যখন অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে চলেছে, তখন তিনি পশ্চিমা দেশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে বলেছেন। তিনি চার বছরে সংসদে মাত্র আট দিন উপস্থিত ছিলেন। তিনি জনগণের কাছে নালিশ না করে বিদেশের কাছে কেন নালিশ করতে গেলেন।’
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘আমি মনে করি, খালেদা জিয়ার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার কোনো সম্পর্ক নেই। এ বিষয়ে তাঁর কোনো আগ্রহ বা জ্ঞানও নেই। বিরোধীদলীয় নেতা নন, কোনো ব্যক্তি এমন কথা বলতে পারেন, তা আমি ভাবতেই পারি না।’
দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধা নেওয়ার জন্য আমরা যখন কাজ করছি, তখন খালেদা জিয়া জিএসপি-সুবিধা বাতিলের কথা বলেছেন। এর চেয়ে ন্যক্কারজনক কাজ আর হতে পারে না। এর মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ করেছেন। এ জন্য তাঁকে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।’
খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘আপনি চুপ থাকেন। চুপ থাকলে মানুষ আপনাকে বুদ্ধিমতী ভাববে। বেশি কথা বললে নিজের ও দলের দেউলিয়াত্ব প্রকাশ পাবে।’
রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘খালেদা জিয়ার বক্তব্য দুরভিসন্ধিমূলক। এ জন্য তাঁকে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেত্রী বিদেশি রাষ্ট্রকে কিছু করতে বলেছেন, বাংলাদেশের সংবিধান বদলে দিতে বলেছেন। বাংলাদেশের জিএসপি-সুবিধা বাতিল করতে বলেছেন। সরকারি ব্যক্তিদের ভ্রমণ-সুবিধা বাতিল করতে বলেছেন। সরাসরি বিদেশের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। দেশের মানুষের বিরুদ্ধে এমন ন্যক্কারজনক কাজ রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি করতে পারেন না।’
এ ছাড়া আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, শিরীন শারমিন চৌধুরী, মইন উদ্দীন খান বাদল, তারানা হালিম, বেবী মওদুদসহ আরও কয়েকজন সাংসদ খালেদা জিয়ার সমালোচনা করে বক্তব্য দেন।
সংসদের অধিবেশন ৩ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।
বিএনপির প্রতিক্রিয়া: যোগাযোগ করা হলে বিএনপির সমন্বয়ক তরিকুল ইসলাম বলেছেন, বিদেশি গণমাধ্যমে এ ধরনের নিবন্ধ প্রকাশ নতুন কোনো বিষয় নয়। লিখিত হোক বা সাক্ষাৎকার হোক, অতীতে অনেকেই এ ধরনের মন্তব্য করেছেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সফরে গিয়ে এ ধরনের সাক্ষাৎ দিয়েছেন।
খালেদা জিয়ার নিবন্ধ নিয়ে সরকারের মন্ত্রী-সাংসদদের সমালোচনাকে ‘নিচু মানসিকতা ও অসহিষ্ণুতার’ পরিচায়ক বলে মন্তব্য করেছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ। তিনি বলেন, দেশের ভেতরে বা বাইরে সরকারের সমালোচনা করলেই তা রাষ্ট্রদ্রোহ হয় না। এর আগে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, ইকোনমিস্ট, ওয়াশিংটন পোস্ট, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ নয়টি প্রতিষ্ঠান সরকারের বিভিন্ন বিষয়ে খালেদা জিয়ার চেয়ে আরও বেশি সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলে তিনি দাবি করেন।
লেখাটি খালেদা জিয়া বাংলাদেশের গণমাধ্যমে দিতে পারতেন কি না, এ প্রশ্নের জবাবে মওদুদ বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে এখানে বা ওখানে লেখার মধ্যে তফাতটা কী? দেশের বাইরে বাংলাদেশের শুভাকাঙ্ক্ষীদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য প্রতিবেদনটি ওয়াশিংটন টাইমসকে দেওয়া হয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।