রাজধানীর আগারগাঁও বস্তিতে আগুনে ছাই ৩০০ বস্তিঘর, ৪ হাজার গৃহহারা

রাজধানীর আগারগাঁও বস্তিতে আগুন লেগে ছাই হয়ে গেছে অন্তত তিনশ’ বসতি। বেশ কিছু দোকানপাটও পুড়েছে। প্রায় চারহাজার বস্তিবাসী এ দুর্ঘটনায় গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। প্রায় এক বর্গকিলোমিটার জুড়ে বস্তিটিতে রোববার দুপুরে আগুন লাগে। উদ্ধার তৎপরতা চলছে। দুপুর চারটায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোন হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। শেরেবাংলানগর থানা ভবনের কাছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ভবন এবং ইসলামী ফাউন্ডেশন কার্যালয়ের মাঝে বস্তি এলাকায় দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে আগুন লাগে।

দুপুর পৌনে ২টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। রাস্তায় যানজটের কারণে দুর্ঘটনা স্থলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পৌঁছাতে দেরি হয় এবং বস্তির ভেতরে যথেষ্ট চওড়া রাস্তা না থাকায় আগুন নেভাতেও বেগ পেতে হয় কর্মীদের।

প্রসঙ্গত, আগারগাঁও-এর এই এলাকায় সরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয় রয়েছে । সরকারের মাস্টার প্ল্যানের অংশ হিসেবে এখানে বেশির ভাগ সরকারি ও স্বায়ত্ত্বশাসিত সংস্থার প্রধান কার্যালয় স্থানান্তর করা হচ্ছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তেজগাঁও স্টেশন এবং শেরেবাংলা নগর থানা কর্তৃপক্ষ এখনো আগুন লাগার কোনো কারণ নির্ণয় করতে পারেননি। তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, ইসলামী ফাউন্ডেশন ভবনের সামনে একটি দোকান থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়।

এদিকে এলাকাবাসী অভিযোগ করে বলেন, ফায়ার সার্ভিস তৎক্ষণাত আগুণ নিভানোর কাজ শুরু করেনি। বস্তিতে তিনটি পানির পাম্প থাকলেও তারা সেখানকার পানি ব্যবহার করেনি। আধাঘন্টা দেরি করে তাদের গাড়ি থেকে পানি দিয়ে আগুণ নিভানোর কাজ শুরু করে।

অবশ্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আলী আহমদ খান বলেন, আমরা দ্রুতই চলে এসেছি। তবে দুর্ঘটনা কবলিত এলাকার কাছাকাছি যেতে না পারার জন্য আগুণ নিয়ন্ত্রনে আনতে দেরি হয়।

দুপুর পৌনে ২টার দিকে থানার কর্তব্যরত কর্মকর্তা ইসরাফিল হোসেন জানান, ফায়ার সার্ভিসের নয়টি ইউনিট চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছে। এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির মূল্য নিরুপণ করা হয়নি। এর আগে দুপুর একটার দিকে শেরেবাংলা নগর থানা কর্তৃপক্ষ জানান, আগুন থানার দিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

তবে ফায়ার সার্ভিসের তেজগাঁও স্টেশনের কর্তব্যরত কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, থানা ভবনটি আগুনের ঝুঁকিতে ছিল। তবে বড় ধরণের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী ও ওই নির্বাচনী এলাকার এমপি জাহাঙ্গীর কবির নানক ক্ষতিগ্রস্ত বস্তি পরিদর্শন করলেও সহযোগিতার কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি।

নানক বলেন, আগুণ লাগার পর এলাকাবাসী দলমত নির্বিশেষে আগুন নেভানোর কাজে অংশ নিয়েছে।

আগুনের ঘটনাটি নাশকতা ছিল কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে নানক বলেন, এখনও আমরা বলতে পারছি না। তবে তদন্ত করার পর জানা যাবে আগুন লাগার কারণ।

দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসী ইসলামিক ফাউন্ডেশন, অফিস এলাকা এবং আশপাশের বাড়িঘরে আশ্রয় নেয়। ক্ষতিগ্রস্তদের পরণের কাপড় ছাড়া সবই পুড়ে গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা কাশেম মিয়া বলেন, আগুণ লাগার পর প্রথমদিকের দশটি ঘর ভেঙ্গে ফেললে, আগুণ এতটা ভয়াবহ হতো না।

আগুনে সহায়সম্বল হারানে শেফালী বেগম বলেন, আমার দুই মেয়ে স্কুলে গেছে। তারা ফিরে এসে খাবার চাইবে। খাবার তো দূরের কথা, তাদেরকে বসতেও দিতে পারবো না।

বস্তির আরেক বাসিন্দা লাতুমিয়া জানান, আমার একটি মাইকের দোকান ছিল। যা দিয়ে এই বস্তির সকল খবর প্রচার করতাম। আজ তা আগুণে পুড়ে ধ্বংস হয়ে গেল।

সবকিছু হারিয়ে বিলাপরত কল্পনা রাণী বলেন, আমাদের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। আমাদের সহায় সম্বল যা কিছু ছিল আজ তা আগুণে পুড়ে শেষ হয়ে গেল।

ক্ষতিগ্রস্ত আমেনা বেগম কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, মেয়ের বিয়ে দিতে ঘরে সুদের ওপর টাকা এনে রেখেছিলাম। কিন্তু আগুনে পুড়ে তা শেষ হয়ে গেল। এখন আমি মেয়ের বিয়ে দেব কি দিয়ে?

তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ুয়া সিনথিয়া জানান, আমরা স্কুলে ক্লাস করছিলাম। এমন সময় লোকজনের আগুন আগুন বলে চিৎকার শুনতে পাই। এরপর স্যার আমাদের ক্লাস ছুটি দিয়ে দেয়। এতলোক আর আগুন দেখে আমরা ভয় পেয়ে যাই।

দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়া আরিফ কান্না জড়িত কণ্ঠে বলল, আমার বই গুলো সব পুড়ে গেল। আমি কাল আবার স্কুলে যাব কিভাবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।