শীর্ষ নেতাদের মুক্তি না দেওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকার ঘোষনা জামায়াতের

বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী করাবন্দি শীর্ষ নেতাদের মুক্তি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার পূনর্বহাল দাবী মেনে নেওয়া পযন্ত সরকারের সাথে কোন সমঝোতা করবেনা। আর এই দুটি দাবী সরকার মেনে না নেওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকার ঘোষনা দিয়েছে দলটি।
দলটির নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, শীর্ষ নেতাদের কারাগারে রেখে এবং ১৮ দলের প্রধান শরিক দল বিএনপি ব্যতিত কোনো নির্বাচনে জামায়াত অংশ নিবে না। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের চেষ্টা যেকোনো মূল্যে প্রতিহত করা ঘোষনাও দেন তারা। গতকাল মঙ্গলবার জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। রায় দেয়ার পর জামায়াতের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একাধিক নেতা খবর তরঙ্গ ডটকম- কে তাদের দলীয় এই অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। সূত্র জানায়, গত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত কারাগারের বাইরে থাকা শীর্ষ নেতারা মাঠ পর্যায়ের জামায়াত-ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেন। এসব আলোচনায় মূল দুটি ইস্যুতে শীর্ষ নেতৃত্ব সামনে নিয়ে আসেন। এর একটি কারাবন্দি শীর্ষ নেতাদের মুক্তি এবং অন্যটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে পুনর্বহাল করে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

এ সময় মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা দুই ইস্যুতে আন্দোলন আরও তীব্র করার দাবি জানান। তাদের মধ্যে তরুণ নেতা-কর্মীরা আন্দোলনে মাঠে থাকার ব্যাপার বেশি উত্সাহ প্রকাশ করে।

এরপর কর্মীদের মনোভাব এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয় জামায়াত। গত নভেম্বরে কারাবন্দি শীর্ষ নেতারা কারাগার থেকে বার্তা পাঠিয়ে বাইরের নেতাদের সিদ্ধান্তের প্রতি তাদের সমর্থনের কথা জানান। তাদের বার্তা পাওয়ার পরে দলের অবস্থান চূড়ান্ত করে জামায়াতের বতর্মান নেতৃত্ব।

দলীয় অবস্থানকে সামনে রেখে একক এবং জোটগত- আন্দোলনের দুই স্তরের কৌশল নির্ধারণ করে জামায়াত। এর মধ্যে রয়েছে- কারাবন্দি শীর্ষ নেতাদের মুক্তির দাবিতে দলগত একক আন্দোলন। অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল ইস্যুতে বিএনপির সঙ্গে ১৮ দলীয় জোটের ব্যানারে আন্দোলন।

জোটগত আন্দোলনের সময়ও দলীয় ব্যানারে কারাবন্দি শীর্ষ নেতাদের মুক্তির দাবি জানানোর সিদ্ধান্ত রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

আরেকটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, জামায়াত সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে সরকারি দলের কয়েকজন নেতার ‘সুসম্পর্ক’ থাকায় বিভিন্ন সময়ে জামায়াতের সঙ্গে সরকারের গোপন সমঝোতার কথা আলোচনায় এসেছে। কিন্তু দলটির সঙ্গে রাজনৈতিক ইস্যুতে সরকারের কোনো যোগাযোগ এখন পর্যন্ত হয়নি বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।

কারাবন্দি শীর্ষ নেতাদের মুক্তি বা কম সাজার বিনিময়ে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার কোনো প্রস্তাবও সরকারের পক্ষ থেকে জামায়াতকে দেয়া হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে, জামায়াতের নীতিনির্ধারকরা নিশ্চিত হয়েছেন- সরকার কারাবন্দি শীর্ষ নেতাদের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাদের দোষী সাব্যস্ত করবেন। সরকার বিরোধী আন্দোলনের দায়ে কারাগারে বন্দি থাকা ও বাইরে থাকা অন্য শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার প্রস্তাব দেবে।

সরকার যুদ্ধাপরাধের ব্যাপারে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতাকে সামনে রেখে নিষিদ্ধ করার ভয় দেখিয়ে দলটিকে নির্বাচনে যাওয়ার ব্যাপারে চাপ দেবে। জামায়াত নেতারা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে রাজি না হলে দলটি নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি দলের একটি অংশকে নতুন দল করে নির্বাচনে নেয়ার চেষ্টা করবে।

সূত্র জানায়, সরকারের এই কৌশলের ব্যাপারে সচেতন থেকেই জামায়াত আন্দোলনের ব্যাপারে অনঢ় অবস্থান নিয়েছে। দলটির বর্তমান নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, দুর্নীতি, লুটপাট ও মানবাধিকার লংঘনের কারণে মহাজোট সরকার দেশে-বিদেশে বিতর্কিত হয়ে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। এ অবস্থায় একটি গণতান্ত্রিক ইসলামী দল হিসেবে জামায়াত ভুল করলে বিতর্কিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাবে, যা দলটির দিনে দিনে প্রভাবশালী হয়ে উঠাকে বাধাগ্রস্ত ও অনিশ্চিত করে তুলবে।

দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, মহাজোট সরকারের বিগত চার বছরে শীর্ষ নেতারাসহ জামায়াত-শিবিরের ৩০ হাজার নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার ও পাঁচ হাজার নির্যাতিত হলেও দুর্বল হয়নি বরং বিগত চার বছরে জামায়াত-শিবিরের তরুণ পাঁচ লাখ কর্মী যোগ হয়েছে। যারা মানবতা বিরোধী অপরাধের প্রচারণা ও সরকারি নির্যাতন উপেক্ষা করে জামায়াতের আদর্শকে বেছে নিয়েছে। অন্যদিকে সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের সাংগঠনিক মানোন্নয়ন ও মনোবল দৃঢ় হয়েছে।

কারাবন্দি শীর্ষ নেতাদের জন্য দলগত একক ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল ইস্যুতে আন্দোলন করলে জামায়াতের জনসমর্থন বাড়বে বলে মনে করেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। গত নভেম্বর থেকে জামায়াত একের পর এক হরতাল ও বিক্ষোভ কর্মসূচি দিয়ে ব্যাপক জনসমর্থন ও রাজনৈতিক গুরুত্ব অর্জন করে নীতি নির্ধারকরা এর প্রমাণ পেয়েছেন বলে দাবি করেছে সূত্রটি।

প্রসঙ্গত, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে কারাবন্দি আছেন- জামায়াতের সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম, বর্তমান আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, নায়েবে আমীর মাওলানা আব্দুস সোবহান, সহকারী  সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা ও এটিএম আজহারুল ইসলাম।

এছাড়া সরকারবিরোধী আন্দোলন করার অভিযোগে কারাবন্দি আছেন- জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মুজিবর রহমান, ডা. শফিকুর রহমান ও মিয়া মোহাম্মদ গোলাম পরওয়ার, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরসহ কেন্দ্রীয় পর্যায়ের অনেক নেতৃবৃন্দ ও প্রায় সব জেলার আমীর ও সেক্রেটারিরা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।