কক্সবাজারে আল্লামা সাঈদী মুক্তি পরিষদের মিছিলে পুলিশের নৃশংস হামলা ॥ নারীসহ নিহত ০৭

# জুমার নামাজের মোনাজাত শেষ না হতেই পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ
# শর্টগান, রাবার বুলেট ও টিয়ার সেল নিক্ষেপ
# নারী ও শিশুসহ আহত শতাধিক:আটক ২৫০
# শহর জুড়ে পরিস্থিতি থমথমে
# প্রতিবাদে আজ ও কাল ৪৮ ঘন্টা সকাল-সন্ধ্যা হরতাল
# অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা
কারাগারে আটক জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তির দাবীতে কক্সবাজারে জুমার নামাজের পর আল্লামা সাঈদী মুক্তি পরিষদের ব্যানারে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিলে নৃশংস হামলা চালিয়েছে পুলিশ। গুলিতে এক নারীসহ ৭ জন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। দেখা গেছে, হাশেমিয়া আলিয়া মাদ্রাসা জামে মসজিদের জুমার নামাজ শেষ হতে না হতেই মোনাজাতরত অবস্থায় মুসল্লিদের উপর পুলিশ বৃষ্টিরমত এলোপাতাড়ি গুলি বর্ষণ করে। গুলিবিদ্ধ হয়েছে বহু নেতাকর্মী, আহত হয়েছে আল্লামা সাইদী মুক্তি পরিষদের নেতাকর্মী, পথচারী, নারী ও শিশুসহ ২ শতাধিক লোকজন। এতেই সাধারণ মুসল্লিরা ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশের উপর ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে। ফলে পরিস্থিতি থমথমে হয়ে ওঠে। গণমাধ্যম কর্মীদেরও ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে দৌড়া দৌড়ি করতে দেখা যায়। পুলিশের উপর্যুপরি গুলি বর্ষণের কারণে অনেক সংবাদকর্মী ঘটনাস্থলে যেতে পারেননি। পুলিশের রাবার বুলেট গায়ে লেগে স্থানীয় পত্রিকার এক সংবাদকর্মী আহত হয়। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেসামাল হয়ে পড়ে প্রশাসন। পরে অতিরিক্ত পুলিশ, দাঙ্গা পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়। জারি করা হয়েছে অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ধারা। গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর পর মোনাজাত শেষ হতে না হতেই এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে পুলিশ। এতেই আল্লামা সাঈদী মুক্তি পরিষদের সমর্থকদের সাথে পুলিশের মাঝে ব্যাপক সংঘর্ষের এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীমতে, শুক্রবার জুমার নামাজ আদায় করে আল্লামা সাঈদী মুক্তি পরিষদের ব্যানারে কক্সবাজার শহরের হাসেমিয়া আলিয়া মাদ্রাসা থেকে শান্তিপূর্ণ মিছিলের চেষ্টা করলে পুলিশ নির্বিচারে বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ করে সাঈদী সমর্থিত জনসাধারণের ওপর। এতে বিক্ষুব্ধ জনতা ও পুলিশের মাঝে তুমুল সংঘর্ষ বেধে যায়। এসময় পুলিশের গুলিতে নিহত হয় ১০জন। নিহতদের মধ্যে নারী, মাদ্রাসা ছাত্র ও সাইদী মুক্তি পরিষদের কর্মী রয়েছে বলে জানা গেছে। এরা হলেন- কক্সবাজার শহরের গোদারপাড়া এলাকার কলিম উল্লাহর ছেলে তোফায়েল আহমদ (২৫), সদর উপজেলার পিএমখালী ইউনিয়নের নয়াপাড়া এলাকার মোকতার আহমদের ছেলে আবদুল্লাহ (২২) ও রাবেতা ইসলামি আবাসিক মাদ্রাসার শিক নুরুল আলম (৪০), মো. ফারুক (২০), নুরুল আলম (২৩), আহমেদ সালেহ(২৮), আহমদুল হক, নুরুল হক (৩২)। রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বাকীদের পরিচয় পাওয়া যায়নি। চোখে গুলিবিদ্ধ হয়ে চোখ উপড়ে গেছে বেশ কয়েক জন ও রক্তাক্ত গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ২৫ জনকে হাসপাতালের দিকে যেতে দেখা গেছে। এ ঘটনায় ২ শতাধিক নেতা-কর্মী আহত ও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে সুত্রে জানা গেছে। এদের মধ্যে অন্তত ৩৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদিকে গতকাল সকাল থেকেই জামায়াত শিবির সন্দেহে প্রায় ২শ’ সাধারণ মানুষ আটক করেছে বলে জানা যায়। গাড়ি থামিয়ে, হেটে যাওয়া দাড়ি টুপিওয়ালা লোক বা যুবক বয়সের কাউকে দেখলেই সাথে সাথে কোন কথা ছাড়াই গ্রেফতার করে প্রিজন ভ্যানে তুলে নিতে দেখা যায়। এছাড়াও সংঘর্ষে কক্সবাজার পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বাবুল আকতারসহ ৩০ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এর আগে পুলিশ ১১৭ জন জামায়াত ও ছাত্রশিবির নেতা-কর্মীকে আটক করেছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. রুহুল আমিন সাংবাদিকদের জানান, বিকাল ৪টা থেকে শহরের সংঘর্ষ সংশ্লিষ্ট এলাকায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছ।
প্রত্যদর্শীরা জানিয়েছেন, জুমার নামাজের পর হাশেমিয়া আলিয়া মাদ্রাসা থেকে ‘আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী মুক্তি পরিষদ’র ব্যানারে স্বতঃস্ফূর্ত জনতা বিােভ মিছিল বের করার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এ সময় পুলিশের সাথে সংঘর্ষ বেধে যায়। সংঘর্ষ শুরু হলে পুলিশ রাবার বুলেট ও গুলিবর্ষণ শুরু করে। কক্সবাজার সদর হাসপাতালে দায়িত্বরত সূত্র জানিয়েছে, এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ পুলিশের ২ সদস্যসহ ৬ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। সংঘর্ষে পুলিশের ১০ সদস্য আহত হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বাবুল আকতার জানান, জুমার নামাজের পর ‘আল্লামা সাঈদী মুক্তি পরিষদের’ ব্যানারে ব্যাপক সংখ্যক লোক জমায়েত হয় শহরে।
আল্লামা সাইদী মুক্তি পরিষদের মিছিল ঠেকাতে কয়েকশ রাউন্ড ফাকা গুলি ও টিয়ার গ্যাস ছুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সরেজমিনে দেখা যায়, মিছিলের তীব্রতায় পুলিশ চৌধুরী ভবন পয়েন্ট থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ রুহুল আমিন জানিয়েছেন, শহরের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনতে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে নিরাপদ স্থানে থাকার পরামর্শও দিয়েছেন জেলা প্রশাসক। সুত্র মতে, পূর্ব নির্ধারিত ঘোষণার আলোকে জেলা উলামা মাশায়েখ পরিষদ নেতা কর্মীরা শহরের হাশেমিয়া মাদরাসা মসজিদে জুমা আদায় করতে জড়ো হতে থাকে। এ সময় দায়িত্বরত পুলিশ সাধারণ মুসল্লিসহ সকলকে ব্যাপক তল্লাসী চালায়। তারা নামাজ শেষ না হতেই ফাঁকা গুলি ছুঁড়তে থাকলে পুরো এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।
বর্তমানে ১৪৪ ধারা চলছে। পুলিশ জামায়াত-শিবির কর্মী সন্দেহে দুই শতাধিক লোকজন আটক করেছে। সংঘর্ষ চলাকালীন সময়ে কৃষক লীগ এর আতিক ও যুবলীগের বাচ্চুর নেতেৃত্বে ৫০/৬০ জন স্বসস্ত্র যুবক ঘুরা ফেরা করতে দেখা যায়।
কক্সবাজার শহরে সাঈদীর মুক্তি পরিষদ ও ইসলাম নির্মূল প্রতিরোধ কমিটির পক্ষ থেকে গতকাল জুমাবার পুলিশের বর্বর ও সহিংস আচরণের প্রতিবাদে আগামী শনিবার-রবিবার ৪৮ ঘন্টার হরতাল আহ্বান করেছে। অন্যদিকে শহীদদের স্ব স্ব এলাকায় নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হবে। কক্সবাজার জেলা আমীর শাহজাহান, নায়েবে আমীর মোস্তাফিজুর রহমান, সেক্রেটারী জি.এম রহিমুল্লাহ, শহর আমীর আবু তাহের চৌধুরী ঘটনার তীব্র নিন্দা ও শোক প্রকাশ করেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।