জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাতটি অভিযোগের মধ্যে ৫টি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। বৃহস্পতিবার চেয়ারম্যান বিচারক ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই রায় ঘোষণা করেন।

গত ১৬ এপ্রিল মামলার কার্যক্রম শেষে যেকোনো দিন রায় দেয়া হবে মর্মে রাখার পর গতকাল বুধবার ট্রাইব্যুনাল আজ রায়ের দিন ধার্য করেন।

কামারুজ্জামানের পক্ষে গত ৬ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত মোট ৫ জন সাফাই সাক্ষ্য দিয়েছেন। তারা হলেন- মো. আরশেদ আলী, আশকর আলী, কামারুজ্জামানের বড় ছেলে হাসান ইকবাল, বড় ভাই কফিল উদ্দিন এবং আব্দুর রহিম নামের এক ব্যক্তি।

২০১২ সালের ১৫ জুলাই থেকে চলতি বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) আব্দুর রাজ্জাক খানসহ রাষ্ট্রপক্ষের মোট ১৮ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন।

তারা হলেন- আনন্দমোহন কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি হামিদুল হক, শেরপুরের মনোয়ার হোসেন খান মোহন, জহুরুল হক মুন্সী, ফকির আব্দুল মান্নান, মোশাররফ হোসেন তালুকদার, ডা. মো. হাসানুজ্জামান, লিয়াকত আলী, জিয়াউল ইসলাম, অ্যাডভোকেট আবুল কাশেম, জালাল উদ্দিন, শেরপুর জেলার ‘বিধবাপল্লী’ খ্যাত সোহাগপুর গ্রামের তিন নারী সাক্ষী (ক্যামেরা ট্রায়াল), মুজিবুর রহমান খান পান্নু এবং দবির হোসেন ভূঁইয়া। আর জব্দ তালিকার প্রথম সাক্ষী হলেন বাংলা একাডেমীর সহকারী গ্রন্থাগারিক এজাব উদ্দিন মিয়া ও মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের তথ্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা আমেনা খাতুন।

গত বছরের ৪ জুন কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। জামায়াতের এই নেতার বিরুদ্ধে ৭টি অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়।

অভিযোগগুলো হলো-
(১) ১৯৭১ সালের ২৯ জুন সকালে কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে আল-বদররা শেরপুরের ঝিনাইগাতী থানার রামনগর গ্রামের আহম্মেদ মেম্বারের বাড়ি থেকে বদিউজ্জামানকে অপহরণ করে নির্যাতন করে পরদিন হত্যা করে।

(২) কামারুজ্জামান ও তার সহযোগীরা শেরপুর কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ আবদুল হান্নানকে প্রায় নগ্ন করে শহরের রাস্তায় হাঁটাতে হাঁটাতে চাবুকপেটা করে।

(৩) একাত্তরের ২৫ জুলাই আল-বদর ও রাজাকাররা পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে শেরপুরের সোহাগপুর গ্রামে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং নারীদের ধর্ষণ করে।

(৪) একাত্তরের ২৩ আগস্ট কামারুজ্জামানের নির্দেশে আল-বদর সদস্যরা গোলাম মোস্তফাকে ধরে সুরেন্দ্র মোহন সাহার বাড়িতে স্থাপিত আল-বদর ক্যাম্পে নিয়ে যান। সেখানে কামারুজামান ও আল-বদররা তাকে গুলি করে হত্যা করেন।

(৫) মুক্তিযুদ্ধকালে রমজান মাসের মাঝামাঝি কামারুজ্জামান ও তার সহযোগীরা শেরপুরের চকবাজার থেকে লিয়াকত আলী ও মুজিবুর রহমানকে অপহরণ করে বাঁথিয়া ভবনের রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে যান। সেখানে তাদের নির্যাতনের পর থানায় চার দিন আটকে রাখা হয়। পরে কামারুজ্জামানের নির্দেশে ওই দুজনসহ ১৩ জনকে ঝিনাইগাতীর আহম্মেদনগর সেনা ক্যাম্পে পাঠানো হয়। পরে লিয়াকত, মুজিবুরসহ ৮ জনকে উপজেলা পরিষদের কার্যালয়ের কাছে সারিতে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।

(৬) একাত্তরের নভেম্বরে কামারুজ্জামানের নির্দেশে আল-বদর সদস্যরা টুনু ও জাহাঙ্গীরকে ময়মনসিংহের জেলা পরিষদের ডাকবাংলোতে আল-বদর ক্যাম্পে নিয়ে যান। টুনুকে সেখানে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। জাহাঙ্গীরকে পরে ছেড়ে দেয়া হয়।

(৭) মুক্তিযুদ্ধকালে ২৭ রমজান কামারুজ্জামান আল-বদর সদস্যদের নিয়ে ময়মনসিংহের গোলাপজান রোডের টেপা মিয়া ও তার বড় ছেলে জহুরুল ইসলাম দারাকে ধরে জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয় আল-বদর ক্যাম্পে নিয়ে যান। সেখানে ছয়জনকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়।

উল্লেখ্য, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে দায়ের এক মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুলাই জামায়াত নেতা মুহাম্মাদ কামারুজ্জামান হাই কোর্টে জামিন নিতে গেলে তার জামিন মঞ্জুর হয়। তবে হাই কোর্ট এলাকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে ওই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে গত বছরের ৩১ জানুয়ারি ৮৪ পৃষ্ঠার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয় প্রথম ট্রাইব্যুনাল। এরপর ১৬ এপ্রিল চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুর এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কামারুজ্জামানের মামলাটি প্রথম ট্রাইব্যুনাল থেকে দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়।

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ যাবৎ কামারুজ্জামানের মামলার রায়সহ মোট তিনটি মামলার রায় ঘোষণা করলেন।

অন্যদিকে প্রথম ট্রাইব্যুনালে শুধুমাত্র আল্লামা দেলাওয়ার হোসাঈন সাঈদীর মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।