জাতীয় সংসদে ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেট পাস, বিরোধীদলের ওয়াকআউট

২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেট বিরোধী দলের ওয়াকআউটের মধ্যদিয়ে পাস হলো । দুটি দাবি মঞ্জুরের ছাটাই প্রস্তাবে কথা বলতে না দেয়ার প্রতিবাদে বিরোধী দল ওয়াকআউট করে। এর পরপরই বিরোধী দল ছাড়াই কণ্ঠভোটে বাজেট পাস হয়। নির্দিষ্টকরণ বিলে তিন লাখ ৪৪ হাজার ৫৪৯ কোটি ৮৫ লাখ ১১ হাজার টাকা পাস করানো হয়। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের নতুন বাজেটের আকার ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। এ বাজেট ১ জুলাই থেকেই বাস্তবায়ন শুরু হবে।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন। বিরোধীদলীয় নেতা  বেগম খালেদা জিয়া না থাকলেও অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সকালে জাতীয় সংসদে চলতি অর্থবছরের এই বাজেট অধিবেশ শুরু হয়।

মোট ২ লাখা ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকার বাজেট পাস করা হয়েছে। এরমধ্যে এডিপির আকার ৬৫ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে এক লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার। ঘাটতি ৫৫ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংক থেকে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ নেবে সরকার।

গত ৬ জুন বাজেট উপস্থাপনের পর এর ওপর মোট ৫১ ঘণ্টা সাধারণ আলোচনা হয়েছে।

নির্দিষ্টকরণ বিল পাস
নতুন ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেট ব্যয়ের বাইরে সরকারের বিভিন্ন ধরনের সংযুক্ত দায় মিলিয়ে মোট তিন লাখ ৪৪ হাজার ৫৪৯ কোটি ৮৫ লাখ ১১ হাজার টাকার নির্দিষ্টকরণ বিল জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে। এর মধ্যে সংসদ সদস্যদের ভোটে গৃহীত অর্থের পরিমাণ দুই লাখ ৪ হাজার ৩১০ কোটি ৫২ লাখ ১৮ হাজার টাকা এবং সংযুক্ত তহবিলের ওপর দায় এক লাখ ৪০ হাজার ২৩৯ কোটি ৩৩ লাখ ৯৩ হাজার টাকা।

সংযুক্ত তহবিলের দায়ের মধ্যে ট্রেজারি বিলের দায় পরিশোধ, হাইকোর্টে বিচারপতি ও মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রককের বেতন ইত্যাদি দায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

মঞ্জুরি দাবি ও ছাটাই প্রস্তাব
নতুন বাজেটের ওপর সংসদে উত্থাপিত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ খাতের ৫৬টি মঞ্জুরি দাবির বিপরীতে ২০ জন সংসদ সদস্যের ১ হাজার ২৩টি ছাটাই প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। এরমধ্যে মাত্র সাতটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বিপরীতে আসা ছাটাই প্রস্তাবের ওপর আলোচনা হয়। এগুলো হচ্ছে- জনপ্রশাসন, আইন, অর্থ, স্বরাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার, বিদ্যুৎ ও সেতু বিভাগ। কিন্তু এসব ছাটাই প্রস্তাবকে অবান্তর দাবি করে এর সবগুলোই কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়।

হল মার্কের টাকা কিছুই না, পদ্মা প্রকল্পে চুরির নির্দশন নেই
বাজেট পাসের আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে আসা ছাটাই প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘বিরোধী দলের সংসদ সসদ্যরা মনে করেন এসব ছাটাই প্রস্তাব পাস হলেই সরকারের পতন হবে। অতএব প্রস্তাব প্রত্যাহার কার হোক। না হলে এগুলো সবই নাকচ হয়ে যাবে।’

তিনি বলেন, ‘হল মার্কের ঘটনা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। আমি আবারো বলছি এটা একটা চুরি, জালিয়াতি। যেখানে প্রতি বছর চার লাখ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ দেয়া হয় সেখানে এই চার হাজার কোটি টাকা কিছুই না এটা আমি আবারো বলছি।’

মন্ত্রী বলেন, আর পদ্মা সেতু প্রকল্পে চুরির কোনো নিদর্শন নেই। বিশ্ব ব্যাংক এতে দুর্নীতির কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি। প্রমাণ ছাড়া সবাই কথা বলছে।’

দেশের ব্যাংক খাত বর্তমানে যেভাবে চলছে এতো ভালো আর কখনই ছিল না বলেও মনে করেন তিনি।

খাতওয়ারি বরাদ্দের পূর্ণাঙ্গ তালিকা
জাতীয় সংসদে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অনুকূলে ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেট থেকে সবচেয়ে বেশি ৪৫ হাজার ১৭৫ কোটি ৭৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে অর্থবিভাগ খাতে। আর খাতওয়ারি সবচেয়ে কম ১০ কোটি পাঁচ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সুপ্রিম কোর্ট খাতে।

মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম বরাদ্দ পেয়েছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এই মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২৩৫ কোটি ৪১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।

জাতীয় সংসদ খাতে ৩৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় খাতে ৬২৪ কোটি ৬০ লাখ ২৩ হাজার টাকা, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ খাতে অনধিক ৩২ কোটি টাকা, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় খাতে ৪৬১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় খাতে এক হাজার ১৬৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা, অর্থ বিভাগ খাতে ৪৫ হাজার ১৭৫ কোটি ৭৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ খাতে এক হাজার ৩৮৬ কোটি ছয় লাখ টাকা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ খাতে ৫৯৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ খাতে ১৬১ কোটি ১৪ লাখ ৮১ হাজার টাকা, পরিকল্পনা বিভাগ খাতে ৫৪৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা, বাস্তবায়ন, পরীবিক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ খাতে ১২১ কোটি ৫১ লাখ টাকা, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ খাতে ২৪২ কোটি ৪২ লাখ টাকা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় খাতে ১৭৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় খাতে ৭২৭ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় খাতে ১৪ হাজার ৫৪১ কোটি ৭২ লাখ টাকা, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ খাতে ১৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, আইন ও বিচার বিভাগ খাতে ৮০০ কোটি ৩০ লাখ ৯৫ হাজার টাকা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় খাতে নয় হাজার ৫৮৮ কোটি ৬২ লাখ ৯৮ হজার টাকা, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ খাতে ২১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় খাতে ১১ হাজার ৯৩৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, শিক্ষা মন্ত্রণালয় খাতে ১৩ হাজার ১৭৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় খাতে ৩৬৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকা, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় খাতে নয় হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় খাতে ৬৩২ কোটি ৭০ লাখ ৬২ হাজার টাকা, সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় খাতে দুই হাজার ২১৩ কোটি ৪০ লাখ ২৮ হাজার টাকা, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় খাতে এক হাজার ৪৪৯ কোটি ৩৮ লাখ ১৩ হাজার টাকা, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় খাতে ১৮৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় খাতে এক হাজার ৭৮১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, তথ্য মন্ত্রণালয় খাতে ৫১১ কোটি ৯৭ লাখ ৫৮ হাজার টাকা, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় খাতে ২৩৫ কোটি ৪১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় খাতে ২৯১ কোটি ২৫ লাখ টাকা, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় খাতে ৭০৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকা, স্থানীয় সরকার বিভাগ খাতে ১২ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ খাতে এক হাজার ৮৫ কোটি ৩১ লাখ ২৩ হাজার টাকা, শিল্প মন্ত্রণালয় খাতে দুই হাজার ২৮৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় খাতে ১৯৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ খাতে দুই হাজার ২৯১ কোটি টাকা, কৃষি মন্ত্রণালয় খাতে ১২ হাজার ২৭৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় খাতে এক হাজার ৬২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় খাতে ৭৯৮ কোটি ৪৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকা, ভূমি মন্ত্রণালয় খাতে ৭৫৩ কোটি ১৬ লাখ ৬৩ হাজার টাকা, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় খাতে দুই হাজার ৫৯২ কোটি ৬৪ লাখ ৮৬ হাজার টাকা, খাদ্য মন্ত্রণালয় খাতে ১০ হাজার ৩৮৭ কোটি ৮৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় খাতে ছয় হাজার ৫২৪ কোটি চার লাখ ৮৬ হাজার  টাকা, সড়ক বিভাগ খাতে পাঁচ হাজার ৫৫১ কোটি ৮৯ লাখ টাকা, রেলপথ মন্ত্রণালয় খাতে পাঁচ হাজার ৬৮০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, নৌ-পরিবহণ মন্ত্রণালয় খাতে ৮১২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় খাতে ৩০৭ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার টাকা, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় খাতে এক হাজার ৩৩৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় খাতে ৭৫৪ কোটি ৬৪ লাখ ৫৫ হাজার টাকা, বিদ্যুৎ বিভাগ  খাতে নয় হাজার ৬০ কোটি ২০ লাখ টাকা, সুপ্রিম কোর্ট খাতে ১০ কোটি পাঁচ লাখ টাকা, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় খাতে ৭৬৭ কোটি ১০ লাখ টাকা, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় খাতে ৩৫৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা, দুর্নীতি দমন কমিশন খাতে ৩৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, সেতু বিভাগ খাতে সাত হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।


সম্পাদনা: শামীম ইবনে মাজহার,নিউজরুম এডিটর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।