নির্দলীয় সরকার ছাড়া দেশে কোনো নির্বাচন হতে দেয়া হবে না: খালেদা

বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, “তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকার ছাড়া দেশে কোনো নির্বাচন হতে দেয়া হবে না। আমরা অনেক আগে থেকেই এ ব্যাপারে আলোচনার কথা বলে আসছি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আলোচনার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। তার পরও এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাব এলে আমরা আলোচনা করতে রাজি আছি।”

রোববার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে নরসিংদীর বাসাইলে পৌর শিশুপার্ক মাঠে জনসভায় খালেদা জিয়া এসব কথা বলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে জনমত গঠন করতে দেশের আটটি জেলায় বিএনপির ঘোষিত জনসভা কর্মসূচির প্রথমটি অনুষ্ঠিত হলো নরসিংদীতে। বিকেল  সোয়া পাঁচটা থেকে বক্তৃতা শুরু করে প্রায় ৪৫ মিনিট বক্তব্য দেন বিএনপির চেয়ারপারসন।

খালেদা জিয়া বলেন, “দেশের ৯০ ভাগ মানুষ ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পক্ষে। এখন তা ৯৮ ভাগ হয়ে গেছে। তাই আগামী সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই হতে হবে।” নির্দলীয় সরকার গঠন না করলে জনসভা কর্মসূচির পর লাগাতার কর্মসূচি দেয়া হবে বলে সরকারকে হুঁশিয়ার করে দেন তিনি।

সরকারকে উদ্দেশ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “সংসদে আপনাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল সংসদে পাস করুন।”

গত ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের কথা উল্লেখ করে বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, “ওই সমাবেশে আলেম-ওলামারা এসেছিলেন নবীজির প্রতি ব্লগারদের অবমাননার প্রতিবাদ জানাতে। তাদের হাতে ছিল তসবিহ ও জায়নামাজ। আর সরকারি দলের নেতাকর্মীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সেখানে তাদের ওপর হামলা করেছিল।”

পত্রপত্রিকার বরাত দিয়ে তিনি বলেন, “ওই সমাবেশের সময় বৈদ্যুতিক বাতি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। হেফাজতের আমির আল্লামা শফীকে পরিকল্পিতভাবে আটকে রেখেছিল। সরকার বলছে সেখানে কোনো মানুষ মারা যায়নি। অথচ সমাবেশে এক লাখ ৫৫ হাজার গুলি ছোড়া হয়েছে। সেদিন গণহত্যা চালানো হয়েছিল। যারা এসব করেছে, তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।”

খালেদা জিয়া বলেন, “সরকার ক্ষমতা ছাড়লে প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না, তাই ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন দিতে চায়। এ ধরনের নির্বাচন কোনোদিন নিরপেক্ষ হতে পারে না। এ ধরনের নির্বাচন আমরা হতে দেব না। আমরা কোনো অন্যায় দাবি করছি না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার ন্যায্য দাবি মানতে হবে।”

হল-মার্ক, ডেসটিনি, পদ্মা সেতুসহ বিভিন্ন কেলেঙ্কারির কথা উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যাপক সমালোচনা করেন বিএনপির চেয়ারপারসন। তিনি বলেন, “এত বেশি দুর্নীতি, খুন ও লুটপাট করা হয়েছে, তাতে নৌকা ফুটো হয়ে গেছে। নৌকায় পানি উঠে এখন ডুবে যাওয়ার অবস্থা তৈরি হয়েছে। এই নৌকা দিয়ে পার হওয়া যাবে না।”

নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায়ে টানা হরতাল-অবরোধ দেয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।

বিএনপি ক্ষমতায় গেলে নতুন ধারা রাজনীতি সূচনা করবে জানিয়ে তিনি  বলেন, “অনেকেই বলেন, নতুন ধারা কী? একটু অপেক্ষা করেন। আরেকটু পরে আমরা পরিষ্কার করে বলব। না হলে আমাদের কথা পরে তারা (সরকার) শুরু  করে দেবেন।”

নির্বাচন কমিশনকে সরকারের আজ্ঞাবাহক আখ্যা দিয়ে খালেদা বলেন, “ইসি মেরুণ্ডহীন। তারা নিজেরা কিছু করতে পারে না। সরকারকে শুধু ‘জ্বি হুজুর, জ্বি হুজুর’ করে। প্রধানমন্ত্রী তার পদে বহাল থাকলে তাদের তা আর করতে হবে না।”

তিনি বলেন,“কমিশন অসহায়। তাদের বলব, অসহায় হলে পদত্যাগ করুন।তাদের মতো ‘জ্বি হুজুর মার্কা কমিশনের অধীনে আমরা নির্বাচনে যাব না। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় না থাকলে তাদের বিশেষ বাহিনী ছাত্রলীগ, যুবলীগ,গুণ্ডালীগও পালিয়ে যাবে।”

নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রয়োজন উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন,“ফুটবল খেলার জন্য সুন্দর মাঠের দরকার। নির্বাচনও একটা খেলা সুতরাং মাঠ সমান হতে হবে। তবেই খেলা সুন্দর হবে। তারা যদি মনে করে ভালো কাজ করেছে, তাহলে জনগণ ভোট দেবে। তারা আবারো ক্ষমতায় আসবে। এতে আমাদের কোনো আপত্তি থাকবে না।”

বক্তৃতায় সময়ে খালেদা জিয়া বারবার নানা পত্রিকার প্রকাশিত প্রতিবেদন জনতাকে দেখান।

খালেদা জিয়া বলেন,“এ সরকারের আমলে ২৩ হাজার মানুষ খুন হয়েছে।  শেয়ারবাজারে ৩৩ লাখ মানুষ পথে বসেছে। ডেসটিনি ও হলমার্কের টাকা কোথায় গেল?”

সমাবেশে আগত তরুণদের উদ্দেশে বলেন, “আওয়ামী লীগ বলেছিল, ঘরে ঘরে চাকরি দেবে। দিয়েছে?” সবাই বলে,“দেয়নি”। খালেদা বলেন, “তাহলে কি প্রধানমন্ত্রীকে আমরা মিথ্যাবাদী বলতে পারি না? সরকার নতুন কোন কর্মসংস্থান করতে তো পারেনি, বরং প্রবাস থেকে শ্রমিকরা খালি হাতে দেশে ফিরে আসছে।”

খালেদা বলেন, “নরসিংদীর পৌর মেয়র খুন হয়েছেন। তার খুনিকে এ সরকারকে ধরেনি। ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতে খুনিদের ধরা হবে। সিলেটে ১০ মিনিটে স্বর্ণের দোকান লুট করেছে। কিন্তু ধরেনি। কারণে ধরলে যদি বেরিয়ে পড়ে তারা আওয়ামী লীগের লোক।”

বিএনপি চেয়ারপারসন নরসিংদীর জনগণের উদ্দেশে বলেন, “আপনারা কী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায়ে আন্দোলনে প্রস্তুত আছেন?” জনতার উত্তর, “হ্যাঁ।” খালেদা বলেন, “এরপর আমার রংপুর, দিনাজপুরে মিটিং আছে। আমি এ বার্তা পৌছে দেব। বলব, নরসিংদীর জনগণ প্রস্তুত আছে।”

খালেদা জিয়া বলেন, “সামনে সংসদ অধিবেশন। সংবিধান সংশোধন করে দাবি মেনে নিন। না হয় দাবি আদায়ে টানা হরতাল, অবরোধসহ সব কর্মসূচি আসবে। রাস্তাঘাট বন্ধ করে বসে থাকব। তখন জনগণ বলবে, হয় তত্ত্ববধায়ক  সরকার দাও। না নয় হাসিনা তুমি বিদায় হও।”

তিনি বলেন, “আমরা ন্যায়ের সঙ্গে আছি, গণতন্ত্রের পক্ষে আছে, মানুষের পক্ষে আছি। বিজয় আমাদের হবেই। তাই সরকারকে শেষবারের মতো বলতে চাই, কি তত্ত্বাবধায়ক মানবেন নাকি পালানোর পথ খুঁজবেন।”

বিএনপির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল কবির খোকনের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, মির্জা আব্বাস, আ স ম হান্নান শাহ, ভাইস-চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, সেলিমা রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, যুবদলের মোয়াজ্জেম হোসেন  আলাল, ছাত্রদলন সভাপতি আবদুল কাদের ভূইয়া জুয়েল ও মহিলা দলের শিরিন সুলতানা।

 


সম্পাদনা: শামীম ইবনে মাজহার,নিউজরুম এডিটর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।