৮৪ ঘন্টার হরতাল শুরু, বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা, নিহত ১

ঢাকা: বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের ডাকে রবিবার ভোর ৬টা থেকে টানা ৮৪ ঘণ্টার হরতাল শুরু হয়েছে। হরতালে সারাদেশে ব্যাপক ভাঙচুর চালাচ্ছে পিকেটাররা। এছাড়া ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে দেশের বিভিন্ন স্থানে।
এদিকে চট্টগ্রামে পিকেটারদের ধাওয়ায় এক সিএনজি চালিত অটোরিকশা উল্টো একজন নিহত হয়েছে। অন্যদিকে রেল লাইনে আগুন দিয়ে ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন ঘটাতে চেষ্টা করছে হরতাল সমর্থকররা।
নির্দলীয় সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মুক্তির দাবিতে এ হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত টানা এই হরতাল চলবে।বিস্তারিত ঢাকাটাইমস প্রতিনিধিদের পাঠানো খবেরে বিস্তারিত-
চট্টগ্রাম: পিকেটারের ধাওয়ায় নির্মল দাস (৪০) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের হাজি নিয়ামত আলী রোড এলাকায় এ ঘটনায় ঘটে।
রবিবার সকাল সোয়া সাতটায় ওই সড়কে হরতালকারীরা পিকেটিংকালে নির্মল দাস  সিএনজিযোগে যাচ্ছিলেন। এসময় পিকেটাররা ধাওয়া দিলে সিএনজিটি দ্রুত চালাতে গিয়ে উল্টে যায়। এতে নির্মল গুরুতর আহত হলে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে সকাল সাড়ে ৮টায় তিনি মারা যান।
চমেক হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই জহিরুল ইসলাম এসব তথ্য জানিয়েছেন।নির্মলের বাড়ি হাটহাজারী উপজেলার মাদার্সা জেলেপাড়া গ্রামে।
নারায়ণগঞ্জ: হরতালের সমর্থনে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের পাচঁরুখী এলাকায় যুবদল কর্মীরা একটি মিছিল বের করে। মিছিলটি মহাসড়ক প্রদক্ষিণ করার সময় মিছিল থেকে ১৫/১৬ টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।
এসময় ককটেলের বিকট শব্দে এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে। ককটেল বিস্ফোরনের পর পরই পিকেটরা দ্রত মহাসড়ক থেকে সটকে পড়ে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল আসে। রূপগঞ্জের বরপা এলাকায়, ঢাকা-মুন্সিগঞ্জের ভোলাইল এলাকায় টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দল।
এদিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের রূপগঞ্জের বরপায় পিকেটাররা রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে। তারা হরতালের সমর্থনে মিছিল করে। তারা চলে যাওয়ার পরে পুলিশ এসে জ্বলন্ত টায়ার সড়িয়ে যানচলাচলের ব্যবস্থা করে। ঢাকা-মুন্সিগঞ্জ সড়কের ভোলাইল এলাকায় ফতুল্লা থানা স্বেচ্ছা সেবকদলের নেতাকর্মীরা রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে।
এসময় পুলিশ তাদের সড়িয়ে দিতে চাইলে পিকেটাররা কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরন ঘটায়। এসময় পুলিশ শটগানের গুলি ছুড়লে তিনজন রাবার বুলেট বিদ্ধসহ পাঁচজন আহত  হয়।
ঈশ্বরদী: বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের ডাকা ৮৪ ঘণ্টা হরতাল শুরুর আগেই রোববার ভোরে পাবনার ঈশ্বরদী বাইপাস স্টেশনের অদূরে রেললাইন উপড়ে ফেলেছে পিকেটাররা।
রবিবার ভোরে শ্রীরামগাড়ী এলাকায় ঈশ্বরদী-ঢাকা রেললাইনের একটি রেলপাত গ্যাস বার্নার দিয়ে কেটে দিলে ঈশ্বরদী-ঢাকা, রাজশাহী-ঢাকা, খুলনা-ঢাকাসহ উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার ট্রেন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
রেললাইন উপড়ে ফেলার কারণে সকালে রাজশাহী ও ঈশ্বরদী থেকে ঢাকাগামী ও ঢাকা থেকে ঈশ্বরদী হয়ে খুলনাগামী একাধিক ট্রেন বিভিন্ন স্টেশনে থামিয়ে রাখা হয়।
প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রেললাইন জোড়া লাগিয়ে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী আব্দুল করিম।
গাজীপুর: বিরোধী দল আহুত ৮৪ ঘণ্টার হরতালের প্রথম দিনে গাজীপুরে বিভিন্ন যানবাহন টায়ারে আগুন দিয়েছে হরতাল সমর্থকরা। রাস্তায় ও ব্রীজে আগুন দিয়ে মিছিল করেছে ইসলামী ছাত্র শিবির। এসব ঘটনায় সারা জেলায় ১৫ জন আটক করেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রোববার সকাল ৮টার দিকে টঙ্গীর কলেজগেট এলাকায় ইসলামী ছাত্র শিবির একটি ঝটিকা মিছিল বের করে। ভোররাত ৪টা ১৫ মিনিটে টঙ্গী- নরসিংদী সড়কের টঙ্গী এলাকায় শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার উড়াল সেতুতে টায়ার জ্বালিয়ে আগুন দেয় হরতালকারীরা। এর আগে শনিবার মধ্যরাতে সিলেট বাইপাস সড়কের নাওজোর এলাকায় একটি বাসে অগ্নিসংযোগ করে হরতাল সমর্থকরা।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সকাল ৭টার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের সালনা ও বাঘের বাজার এলাকায় বিএনপির পিকেটাররা ঢিল ছুঁড়ে কয়েকটি গাড়ির গ্লাস ভাঙচুর করে। সকাল ৮টার দিকে ঢাকা-নরসিংদী সড়কের গাজীপুর সদর থানার পূবাইল এলাকায় হরতালের পক্ষে মিছিল করার সময় পুলিশি ধাওয়ায় ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় ঝটিকা মিছিল।
গাজীপুর জেলা পুলিশ কন্ট্রোলরুম সূত্রে জানা যায়, জেলার ৬টি থানা এলাকা থেকে নাশকতা চেষ্টার অভিযোগে জামায়াত-শিবির-বিএনপির ১৪ জন পিকেটারকে আটক করা হয়েছে।
নোয়াখালী : ১৮ দলীয় জোটের ডাকা টানা ৮৪ ঘণ্টার হরতালের শুরুতে নোয়াখালীতে রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে ও গাছের গুড়ি ফেলে সড়ক অবরোধ করে হরতাল সমর্থকরা।
রবিবার ফযরের নামাজের পরই জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পিকেটিং শুরু করে ১৮ দলের নেতাকর্মীরা।
তারা নোয়াখালী-ঢাকা, নোয়াখালী-চট্টগ্রাম, নোয়াখালী-চট্টগ্রাম, নোয়াখালী-লক্ষীপুর সড়ক মহাসড়কে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে ও গাছের গুড়ি ফেলে সড়ক অবরোধ করে।
এর মধ্যে চৌমুহনিতে পত্রিকা বহনকারী গাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে। গাড়ির সুপারভাইজার রিপন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
লক্ষ্মীপুর: রবিবার ভোর থেকে লক্ষ্মীপুরে বিক্ষোভ, ককটেল বিস্ফোরণ, অগ্নিসংযোগ ও সড়ক অবরোধের মধ্যে দিয়ে ১৮ দলের ডাকা ৮৪ ঘন্টার হরতাল শুরু হয়েছে।
সকাল ৮টার দিকে শহরের উত্তর তেমুহনীতে লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপি ও জামায়াতের উদ্যোগে পৃথক পৃথক মিছিল বের হয়। এসময় মিছিল থেকে ১০-১৫টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে।
হরতাল সমর্থনকারীরা শহরের বিভিন্ন স্থানে টায়ারে অগ্নিসংযোগ ও পিকেটিং করে সড়ক অবরোধ করে। এছাড়া রায়পুর, রামগঞ্জ, রামগতি ও কমলনগরে বিভিন্ন সড়কে বিএনপি-যুবদল, ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের পিকেটাররা অবস্থান নেয়।
জয়পুরহাট: ১৮ দলের ডাকা টানা ৮৪ ঘণ্টার হরতালের প্রথম দিন জয়পুরহাটে বিক্ষোভ মিছিল পিকেটিংয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে। সকাল ৮টায় শহরের তৃপ্তির মোড়ে ফয়সাল আলীম সমর্থিত বিএনপি নেতাকর্মীরা পর পর দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটালে সালাম নামের এক পথচারী আহত হয়।
এছাড়া শহরের বাটার মোড়ে জামায়াত শিবির আলাদাভাবে হরতালের সমর্থনে বিক্ষোভ মিছিল করেছে। পরে ১৮দলীয় জোট নেতারা শহরের প্রধান প্রধান সড়কে বিক্ষোভ মিছিল ও পিকেটিং করছে।
১৮ দলের বিক্ষোভ মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছেন- জেলা বিএনপির সভাপতি মোজাহর আলী এমপি ও জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারী শামসুল ইসলাম।
মেহেরপুর: ১৮ দলীয় জোটের ডাকা টানা ৮৪ ঘণ্টার হরতালের প্রথম দিনে মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা সড়কের রাজনগরে গাছের গুলি ফেলে ও  টায়ারে আগুন দিয়ে সড়ক অবরোধ করে একটি ট্রাক ভাঙচুর করেছে হরতাল সমর্থকরা।
নিদর্লীয় নিরপেক্ষ তত্বাবধায়ক সরকারের দাবি ও কেন্দ্রীয় নেতাদের গ্রেপ্তাররের প্রতিবাদে দেশব্যাপী ডাকা হরতালের প্রথম দিন আজ রবিবার সকাল থেকেই জামায়ত শিবিরের নেতাকর্মীরা মেহেরপুর চুয়াডাঙ্গা সড়কের রাজনগরে জড়ো হয়ে সড়ক অবরোধ করে।
খাগড়াছড়ি: টানা ৮৪ ঘন্টা হরতালের প্রথম দিন খাগড়াছড়িতে শান্তিপূর্ণ ও সর্বাত্মকভাবে পালিত হচ্ছে।
হরতালে খাগড়াছড়ি শহরে দোকানপাট ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। দূরপাল্লা ও অভ্যন্তরীণ সকল সড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। শহরে রিক্সা-সাইকেলও চলছে না।
এদিকে জেলার অপর ৮টি উপজেলায়ও শান্তিপূর্ণ হরতাল পালনের খবর পাওয়া গেছে। নশকতা এড়াতে বিপুল সংখ্যক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
ভোলা: ১৮ দলীয় জোট আহুত ৮৪ ঘণ্টার হরতালের প্রথম দিন ভোলায় ব্যাপক পিকেটিং এর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে। ভোর থেকেই পিকেটাররা ভোলা মোস্তফা কামাল বাসস্ট্যাণ্ড, সদর রোড, খেয়াঘাট রোড, মহাজনপট্রি, উকিলপাড়া সহ প্রায় ২০টি স্পটে পিকেটিং করে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়।
এসময় পিকেটাররা ৩টি অটোরিকশা ভাঙচুর করে। এতে ভোলা-চরফ্যাশন সড়ক ও আভ্যন্তরীন রুটে ২/১টি টেম্পু চলাচল করলেও বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
ভোলা সদরসহ জেলার গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোর অধিকাংশ দোকান-পাট বন্ধ রয়েছে। ভোর থেকে বরিশালগামী লঞ্চ ছেড়ে গেলেও যাত্রী সংখ্যা ছিল খুবই কম। শহরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
নাটোর: ১৮ দলীয় জোটের ডাকা ৮৪ ঘন্টা হরতালের প্রথম দিনে নাটোর জেলার শ্রীরাম গাড়ি এলাকায় সকাল ৬টার দিকে রেল লাইন উপড়ে ফেলে হরতাল সমর্থকরা। এরফলে ঢাকার সাথে উত্তরাঞ্চলের ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। নাটোর স্টেশনসহ বিভিন্ন স্টেশনে আটকা পড়েছে যাত্রী বাহী ট্রেন।
এছাড়া সকালে নাটোর-ঢাকা মহাসড়কের হয়বিয়তপুর এলাকায় ৬টি বাস ও ট্রাক ভাংচুর করা হয়। এছাড়া গতরাতে জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে ১৮ দলীয় জোটের ১১ জন নেতাকর্মীকে আটক করছে পুলিশ।
প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার বিকালে ১৮ দলের মহাসচিব পর্যায়ের বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তৃতীয় দফায় ১০, ১১, ও ১২ নভেম্বর টানা ৭২ ঘণ্টার হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
কিন্তু শুক্রবার রাতে বিএনপির শীর্ষ ৫ নেতাকে গ্রেফতারের ঘটনায় শনিবার দুপুরে বিএনপির নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ পূর্বঘোষিত ৭২ ঘণ্টার হরতালকে ১২ ঘণ্টা বাড়িয়ে ৮৪ ঘণ্টার হরতাল পালনে আহ্বান করা হয়।


সম্পাদনা: শামীম ইবনে মাজহার,নিউজরুম এডিটর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।