ভারতীয় পত্রিকায় সম্পাদকীয়: শেখ হাসিনাকে কোনো একটা রফায় পৌঁছতেই হবে

‘বাংলাদেশে প্রধান বিরোধী জোট (১৮ দলের) যদি নির্বাচনে না থাকে, তা হলে সেই নির্বাচন হবে প্রহসনের নামান্তর।বিপুল সংখ্যক ভোটারদের সরিয়ে রেখে ভোট করে যে সরকার গঠিত হবে তা যে জনতার কাছে বিশেষ গ্রহণযোগ্য হবে না তা ভালো করেই বোঝেন শেখ হাসিনা৷ তাই তাকে কোনো একটা রফায় পৌঁছতেই হবে৷ তা ছাড়া প্রধান বিরোধীদের বাদ দিয়ে নির্বাচন করে সরকার গঠন করলে আওয়ামি লিগের গায়ে স্বৈরাচারী ছাপ লেগে যাবে৷ তখন সেনা ছাউনিতে জন্ম নেয়া বিএনপি-র সঙ্গে তার কোনও ফারাক থাকবে না৷’

‘গণতন্ত্রের ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে আছে ঢাকা’-এই শিরোনামে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে লেখা এক সম্পাদকীয়তে এসব কথা লিখেছে ভারতের প্রভাবশালী টাইমস অব ইন্ডিয়া গ্রুপের বাংলা দৈনিক ‘এই সময়’।

কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিকটির অনলাইন সংস্করণে আজ সম্পাদকীয়টি প্রকাশিত হয়।

সম্পাদকীয়টি এখানে হুবহু তুলে ধরা হলো:

“সব কিছু ঠিকঠাক চললে আগামী জানুয়ারি মাসেই বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা৷ কিন্ত্ত সে দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ এখন অনেকগুলো প্রশ্নের সামনে৷

প্রশ্নগুলো এই রকম: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দাবি মেনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে রাজি হবেন? না হলে সেই ভোটে বিএনপি জোট অংশগ্রহণ করবে না৷ দেশের প্রধান বিরোধী জোট (১৮ দলের) যদি নির্বাচনে না থাকে, তা হবে প্রহসনের নামান্তর৷ এই নির্বাচন-সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের কোনও পথ খুঁজে পাওয়া যাবে কি? হরতাল এবং সন্ত্রাস থেকে কবে মুক্তি আসবে? কেমন করে কার তত্ত্বাবধানে নির্বাচন হবে তাই নিয়েই মূলত গণ্ডগোল৷ তবে বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে এমন গণ্ডগোল একেবারেই নতুন নয়৷

বাকি ইতিহাস
স্বাধীনতার পরে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ গঠনের তিন বছরের মধ্যে ১৯৭৫ সালের ১৫ অগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে খুন হন৷ তার সঙ্গে সঙ্গেই ওই সংসদ তথা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসান ঘটে৷

কয়েকজন সামরিক শাসকের হাত বদলের পরে ক্ষমতায় বসেন আর এক সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান (খালেদা জিয়ার স্বামী)৷ জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে একটা সংসদ গঠন করেন৷ সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রীও আড়াই বছরের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারেননি৷ ১৯৮২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন সেনানায়ক হুসেইন মহম্মদ এরশাদ৷ কিন্ত্ত ১৯৯১ সালে গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের ক্ষমতাচ্যুতির সঙ্গে সঙ্গে সেই সংসদেরও অকালমৃত্যু হয়৷

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতে দলের সম্মতিতে একটি অরাজনৈতিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে ওই বছরই নির্বাচন হয় এবং দেশের প্রথম গণতান্ত্রিক সরকার তৈরি হয় বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টি (বিএনপি)-র নেতৃত্বে৷

তার বছর দুয়েক পর থেকেই আওয়ামি লিগের নেত্রী শেখ হাসিনা দেশজুড়ে যে অবরোধ আন্দোলন এবং হরতাল শুরু করেন তাতে খালেদাকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই প্রধানমন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়৷ প্রধানমন্ত্রী পদ ছাড়লেও ক্ষমতা ছাড়তে তার আপত্তি ছিল৷ তিনি নিজের সরকারের তত্ত্বাবধানেই নির্বাচন করেন৷ কিন্ত্ত সেই নির্বাচনে আওয়ামি লিগ ছাড়াও অনেক মুখ্য দলই অংশ নেয়নি৷ ফলে তা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে আরও একটি হাস্যকর নির্বাচন৷ সেই সরকারও এক মাসের বেশি টেকেনি৷ ওই সংসদেই তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ভোট করার আইন পাশ করান৷

পরে ১৯৯৬ সালেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যে নির্বাচন হয় তাতেই ক্ষমতায় আসেন হাসিনা৷ ২০০১ সালের নির্বাচনও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হয়৷ সেই নির্বাচনে ক্ষমতায় আসেন খালেদা জিয়া৷ ২০০৬ সালে খালেদা সরকারের মেয়াদ ফুরোলে বিধিমতো তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়৷ কিন্ত্ত নবম সংসদ নির্বাচনের মাত্র ১১ দিন আগে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ তার অনুগামীদের নিয়েও বঙ্গভবনে ঢুকে বন্দুকের সামনে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে রাষ্টপতি তথা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন৷ এর পরে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন৷ ওই দিনটি বাংলাদেশে ‘ওয়ান ইলেভেন’ নামে পরিচিত হয়েছে৷

এরপরে ফখরুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে সেনা-সমর্থিত একটি পুতুল সরকার গঠিত হয়৷ দুর্নীতি উচ্ছেদের নামে ওই সরকার দেশ থেকে রাজনীতি এবং রাজনৈতিক দল তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে৷ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত লোকেদের দুর্নীতির অভিযোগে ঢালাও গ্রেফতার করে জেলে ভরা শুরু করে৷ কিছু কাল পরে সেনাবাহিনী সংসদ নির্বাচনের অনুমতি দিলে ২০০৮ সালে নির্বাচন হয় এবং আওয়ামি লিগ বিপুল ভাবে জয়লাভ করে৷

গণতন্ত্রের যন্ত্রণা
ক্ষমতা পেয়েই হাসিনা সরকার সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন নিয়ে আইন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ভোট করার বিধি রদ করে৷ যুক্তি: সংবিধান মেনে নির্বাচিত সরকারের অধীনেই ভোট হবে৷ বেঁকে বসে বিএনপি-জামাত জোট৷ তারা নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারই চায়৷ সেই দাবিতে তারা লাগাতার ধর্মঘট চালিয়ে যেতে থাকে৷ সঙ্গে চলেছে খুন জখম এবং সরকারি সম্পত্তিতে আগুন লাগানো৷ সম্প্রতি ৬০ ঘণ্টার ধর্মঘটে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে৷ আর গ্রামে গ্রামে সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার৷ হিন্দুরা যেহেতু মূলত আওয়ামি লিগের ভোটার, তাদের ভয় দেখিয়ে ভোট থেকে বিরত করলে বিএনপি-জামাত জোটের লাভ৷ এই সবের মধ্যে আওয়ামি লিগ সরকার একটি সর্বদলীয় সরকার গঠন করে তার অধীনে নির্বাচন করানোর প্রস্তাব দেয়৷ বিরোধীরা অবশ্য পত্রপাঠ তা প্রত্যাখ্যান করে৷ এই অসহযোগিতার রাজনীতিই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের মূলধারা৷

১৯৯১ সাল থেকে দুই দশকের এই সংসদীয় ব্যবস্থায় আওয়ামি লিগ বা বিএনপি, কোনও দলই জাতীয় সংসদের বিরোধী আসনে কার্যত বসেননি বললেই চলে৷ অভিযোগ, নেহাত সাংসদ পদ বাঁচানোর জন্য যে ক’টা দিন সংসদে হাজিরা দিতে হয় তার বেশি সংসদে যান না বিরোধী সাংসদরা৷ বাংলাদেশে গণতন্ত্র এ ভাবেই চলছে৷

বিরোধী দল মুখে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গড়ার কথা বললেও তাদের দাবি আসলে শেখ হাসিনার পদত্যাগ৷ তাকে প্রধানমন্ত্রী রেখে তারা নির্বাচন করতে দেবে না৷ বিরোধী দলও জানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আর গঠন করা সম্ভব নয়৷ কারণ আইন হয়ে যাওয়ার পরে সংবিধানে তার অনুমোদন নেই৷ কিন্ত্ত এর পরেও দুই পক্ষই আপাতত নিজ নিজ অবস্থানে অনড়৷ তবে এটা স্পষ্ট যে, বিএনপিকে বাদ দিয়ে আওয়ামি লিগ নির্বাচনে যাবে না৷ বিএনপি জোটের ভোট রয়েছে ৩৩ শতাংশ৷ এই বিপুল সংখ্যক ভোটারদের সরিয়ে রেখে ভোট করে যে সরকার গঠিত হবে তা যে জনতার কাছে বিশেষ গ্রহণযোগ্য হবে না তা ভাল করেই বোঝেন শেখ হাসিনা৷ তাই তাকে কোনও একটা রফায় পৌঁছতেই হবে৷ তা ছাড়া প্রধান বিরোধীদের বাদ দিয়ে নির্বাচন করে সরকার গঠন করলে আওয়ামি লিগের গায়ে স্বৈরাচারী ছাপ লেগে যাবে৷ তখন সেনা ছাউনিতে জন্ম নেওয়া বিএনপি-র সঙ্গে তার কোনও ফারাক থাকবে না৷
তবে আওয়ামি লিগ আর বিএনপি যে দু’টি বিপরীতমুখী ধারার রাজনীতি তা এ বারই প্রথম প্রকট হয়ে উঠেছে৷ গত দু’বছর ধরে শাহবাগ চত্বরে আন্দোলন, একের পর এক যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির আদেশ, তার প্রতিক্রিয়ায় জামাত-এ ইসলাম আর হেফাজতে ইসলামের দেশজোড়া বিক্ষোভ এবং সর্বোপরি বিএনপি প্রায় প্রকাশ্যেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা এবং ইসলামি জঙ্গিদের প্রচ্ছন্ন সমর্থনের মধ্য দিয়ে আওয়ামি লিগ এবং বিএনপি-র অবস্থান স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে৷ এরপরেও গণতন্ত্রের স্বার্থে বিএনপিকে নির্বাচনে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব হাসিনার, তিনি যদি তা পারেন মহিমান্বিত হবেন৷ রক্ষা পাবে বাংলাদেশের গণতন্ত্র৷ তিনি যদি বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নেওয়াতে ব্যর্থ হন, তা হলে গত দুই বছরের এবং আগামী কয়েক বছরের যাবতীয় অঘটনের দায় হাসিনাকেই নিতে হবে৷ শেখ হাসিনা উদ্যোগী হয়ে ফোনে খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথাও বলেছেন৷ তাতে অবশ্য লাভ হয়নি৷ তার পরেও বিএনপি ষাট ঘণ্টা এবং বাহাত্তর ঘণ্টার ধর্মঘট ডেকেছে৷ হিংসা ছড়িয়েছে, প্রাণহানি হয়েছে, আগুন জ্বলেছে৷

সামরিক শাসনে ভীত বাংলাদেশের মানুষ কিন্ত্ত এর পরেও হাসিনা কিংবা খালেদার হাত ধরেই গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে চায়৷ কঠিন এক রাজনৈতিক সঙ্কটে বাংলাদেশের মানুষ অধীর অপেক্ষায়, গণতন্ত্রের এই যন্ত্রণা কবে শেষ হবে৷”


সম্পাদনা: শামীম ইবনে মাজহার,নিউজরুম এডিটর


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।