সংলাপ-সমঝোতা: এই আলো এই আঁধার

প্রধান দুই দলের মধ্যে চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে  সংলাপ-সমঝোতা চায় গোটা দেশবাসী। কিন্তু এই আলো এই আঁধার। মাঝে মাঝে সংলাপ-সমঝোতার আভাস দেখা গেলেও একটু পরই তা হতাশায় মিইয়ে যাচ্ছে। এর আগে দুই নেত্রীর ফোনালাপ, দুই দলের সাধারণ সম্পাদক পর্যায়ে ফোনালাপ জনমনে কিছুটা আশার সঞ্চার করলেও পরে তা আবারো হতাশায় মিইয়ে গেছে। দেশ অনিবার্য সংঘাতের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে এমনটাই আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

তবে সবশেষ আবারো সংলাপ-সমঝোতার কিঞ্চিৎ আভা নজরে ভাসছে। শনিবার সন্ধ্যায় দুই দফায় বৈঠক হয়েছে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মধ্যে। তবে কোনো পক্ষই বৈঠকের কথা স্বীকার করেননি।

বনানীর ১৬ নম্বর রোডের ৭৩ নম্বরের একটি বাড়িতে সন্ধ্যা সোয়া ৭টা থেকে রাত ৮টা এবং সাড়ে ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত আশরাফ-ফখরুল বৈঠক করেন বলে বিভিন্ন সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। আনুষ্ঠানিক সংলাপের প্রস্তুতি হিসেবে ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে রাতেই গুলশান কার্যালয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে আলোচনা সম্পর্কে অবহিত করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আজ কোনো এক সময় এ ব্যাপারে আলাপ করবেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।

সূত্রমতে, রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে আপাতত আশরাফের সঙ্গে বৈঠকের কথা অস্বীকার করছে বিএনপি। দলের হাইকমান্ডের ধারণা, আলোচনা ফলপ্রসূ না হলে নির্দলীয় সরকারের দাবিতে চলমান আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অপর একটি সূত্র জানায়, বৈঠকে সৈয়দ আশরাফের কাছ থেকে নির্দলীয় সরকারের দাবিতে সরকারের ছাড় দেয়ার ব্যাপারে মির্জা ফখরুল ইতিবাচক কোনো বক্তব্য পাননি। দাবি আদায়ে দর-কষাকষি করেন তারা।

গত ঈদের পর দেশের রাজনীতিতে বেশ পরিবর্তন আসে। ঈদের পর থেকে এখন পর্যন্ত এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, তাতে কখনো জনগণ আশায় বুক বেঁধেছে, আবার কখনো হয়েছে চরম হতাশ। কখনো তারা আলো দেখেছে, কখনো দেখেছে অন্ধকার। ‘জোনাকির আলো জ্বলা আর নেভা’র মতো ঘটনার বেশ কয়েকবার মুখোমুখি হয়েছে তারা।

ঈদের দু’দিন পর ১৮ অক্টোবর জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্র্রধানমন্ত্রী। ওই ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন। এজন্য তিনি বিরোধীদলীয় নেতার কাছে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের নাম চান।  অনেকেই মনে করেছিল, হয়তো এবার দুই দলের মধ্যে কিছুটা সমঝোতার পথ খুলে যাবে। তবে পরদিনই শনিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানায়, রোববার ভোর ছয়টা থেকে ঢাকা মহানগরীতে সব ধরনের সভা, সমাবেশ, মিছিল, মিটিং, মানববন্ধন, লাঠি মিছিল, বিস্ফোরক দ্রব্য ও আগ্নেয়াস্ত্র বহন নিষিদ্ধ। তখন আবার সেই আশার আলো যেন কিছুটা কমে যায়।

২০ অক্টোবরই বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে পেশাজীবীদের সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপারসন ও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া বলেন, নির্দলীয় সরকার ছাড়া কোনো নির্বাচন নয়, তখন অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেন, দুই দলের সংলাপ আদৌ হবে কি! পরদিন ২১ অক্টোবর যখন নির্দলীয় সরকারের রূপরেখা দেন। তার রূপরেখা অনুযায়ী, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২০ জন উপদেষ্টার মধ্য থেকে বর্তমান সরকারি দল পাঁচজন এবং বিরোধী দল পাঁচজন সদস্যের নাম প্রস্তাব করবেন। তারাই আসন্ন নির্বাচনকালীন সরকারের উপদেষ্টা হবেন।   কিন্তু তার এ প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয় বলে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে আওয়ামী লীগ।

সেদিন অনেকেই মনে করেছিলেন, দুই নেত্রীর পুরোপুরি বিপরীত অবস্থানের কারণে সমঝোতা হয়তো সম্ভব নাও হতে পারে। তবে পরদিন ২২ অক্টোবর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংলাপের আয়োজন করার অনুরোধ জানিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে চিঠি দেন।

তখন অনেকেই আশায় বুক বাঁধেন, সংলাপ হয়তো এবার হচ্ছে। তবে পরের কয়েকদিনের এ ব্যাপারে অগ্রগতি না হওয়ায় ২৫ অক্টোবর সোহরাওয়ার্দীর সমাবেশে আল্টিমেটাম দেন খালেদা। তিনি বলেন, ২৬ অক্টোবরের মধ্যে সংলাপের ব্যবস্থা না করলে ২৭ অক্টোবর থেকে টানা ৬০ ঘণ্টা হরতাল।

তার এ আল্টিমেটামের পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় খালেদাকে ফোন দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেদিন সকালেই যখন দেশবাসী জানতে পারেন, প্রধানমন্ত্রী ফোন দেবেন, তারা আশায় বুক বাঁধেন। ভাবেন, এই হয়তো সমস্যার সমাধান হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ফোন দিলেন, গণভবনে আহ্বানও জানালেন। কিন্তু খালেদা হরতাল প্রত্যাহার করলেন না। তিনি বললেন, “এটা যেহেতু ১৮ দলের হরতাল, কাজেই তাদের সবার সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”

অবশ্য, জনগণ ধরে নেয়, যেহেতু দুই নেত্রীর মধ্যে কথা ‘শুরু’ হয়েছে, কাজেই সমাধানও আসবে। কিন্তু ২৯ অক্টোবর যখন সেই কথোপকথন প্রকাশ হয়ে পড়লো, তখন আবারো জনগণ হতাশ। তারা ভাবছেন, আদৌ তাদের মধ্যে সংলাপ হবে কি!

সবশেষ গত ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসে সেনাকুঞ্জের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর দু’দলের সাধারণ সম্পাদক পর্যায়ে আলোচনায় বসার আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে দলের এ দুই মুখপাত্র বৈঠক করেন। ওই দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে কুশল বিনিময়ের সময় দুই দলের মহাসচিব পর্যায়ে সংলাপে বসার আহ্বান জানান।

যেকোনো মূল্যে দুই দলের মধ্যে সংলাপ-সমঝোতা প্রত্যাশা করে জাতি। সহিংসতা ও চরম অনিশ্চয়তার দিকে দেশ এগিয়ে যাক-এটা কারো প্রত্যাশা নয়।


সম্পাদনা: শামীম ইবনে মাজহার,নিউজরুম এডিটর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।