১৮ দলের অবরোধ: সারাদেশে ব্যাপক সংহিংসতা, নিহত ৯

আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার প্রতিবাদে ও নির্বাচনে নির্দ্বলীয় তত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ১৮ দলীয় জোটের ডাকা ৪৮ ঘন্টার অবরোধে সারাদেশে ব্যপক সংহিসতার ঘটনা ঘটে এবং তিন জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। নিহতদের মধ্য কুমিল্লার লাকসামে এক রিকসা চালক, সিরাজগঞ্জে এক পথচারী ও সাতক্ষীরা এক যুবলীগ নেতা রয়েছে।

কুমিল্লা :  কুমিল্লার লাকসামে পুলিশের গুলিতে এক রিকসা চালকের মৃত্যু, ৬ পুলিশ সহ আহত অর্ধশতাধিক। জানা যায়, নিহত রিক্সা চালক বাবুল মিয়া (৩৫) উপজেলার অশ্বতলা গ্রামের বাসিন্দা। কিন্তু বিএনপি তাকে তাদেঁর নিজ দলের কর্মী বলে দাবি করে।

জানা যায়, মঙ্গলবার সকাল ১১ টার দিকে আঠারো দলীয় জোটের নেতা-কর্মীবৃন্দ কেন্দ্রীয় কর্মসূচীর অংশ হিসেবে উপজেলার দৌলতঞ্জ বাজারের ব্যাংক রোড ও নোয়াখালী রোডের বিএস টাওয়ারের সামনে অবরোধের  চেষ্টাকালে পুলিশ অতর্কিতভাবে গুলি চালায়। পরে পুলিশের সাথে ১৮ দলের নেতা-কর্মীদের বেশ কিছুক্ষণ ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া শেষে সংঘর্ষে রুপ নেয়। আহতদের মধ্যে জামায়াত নেতা আহসান উল্লাহ মিয়াজীসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ রয়েছে।গুলিতে দেলোয়ার হোসেন নামের এক ছাত্রদল কর্মী নিহত হয়েছেন। তাদেরকে লাকসামের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

আহত পুলিশ সদস্যরা হল- পুলিশের কনস্টেবল লেয়াকত, এএস আই জহির, রুবেল, সাইফুল, শাহাদাত, আলীহোসেন দুয়ারী।

লাকসাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়ের দাবি করেন, অবরোধকারীরা দৌলতগঞ্জ বাজারে ভাঙচুরের চেষ্টা করে এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ও গুলি ছোড়ে।

তিনি জানান, পুলিশ তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করতে ৯৫ রাউন্ড রাবার বুলেট, ৩৪ রাউন্ড চাইনিজ রাইফেলের গুলি ও ৬ রাউন্ড পিস্তলের গুলিসহ মোট ১৩৪ রাউন্ড গুলি ও তিন রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে।

সংঘর্ষে একজন নিহতের বিষয়টি স্বীকার করেছেন ওসি আবুল খায়ের।

সোমবার রাতে কুমিল্লা নগরীতে তফসিল ঘোষণার প্রতিবাদে ১৮ দলের কর্মীরা মিছিল বের করে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে গুলিতে দেলোয়ার হোসেন নামের এক ছাত্রদল কর্মী নিহত হয়েছেন। গুলিতে আরো অন্তত ২০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন কায়সার।

ছাত্রদল কর্মী লোয়ার হোসেনের জানাজাকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার বিকেলে সংঘর্ষে রিপন নামে এক বিজিবি সদস্য মারা গেছেন। কোটবাড়িস্থ বিজিবি ১০ নম্বর ব্যাটালিয়নের উপঅধিনায়ক আবুল হাসেম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

 

সিরাজগঞ্জ : সিরাজগঞ্জে অবরোধের প্রথম দিন মঙ্গলবার সকালে শহরের জগাইমোড় এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াত-শিবিরকর্মীদের সংঘর্ষে এক পথচারী নিহত হযেছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২০ জন।

নিহত সাকমান হোসেন (২৭) সদর উপজেলার মাছুয়াকান্দি গ্রামের সমেদ আলীর ছেলে ও তিনি পেশায় একজন রাজমিস্ত্রী।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল সাড়ে আটটার দিকে অবরোধকারীরা জগাইমোড় এলাকায় অবস্থান নিয়ে বেশ কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে অবরোধকারীরা পুলিশের ওপর চাড়ও হলে সংঘর্ষ বাধে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারসেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। সংঘর্ষের সময় একটি টিয়ারসেল সাকমান হোসেনের লাগলে তিনি পার্শ্ববর্তী পুকুরে পড়ে যায়। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে  চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এ সময় ঘটনাস্থল থেকে জেলা বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নূর কায়েম সবুজকে আটক করেছে পুলিশ।

এছাড়া, ভোরে শহরের মালসাপাড়া এলাকায় একটি ট্রাকে আগুন ও একটি মিনি ট্রাক ভাঙচুর করেছে অবরোধকারীরা। অপরদিকে, রেলগেট এলকায় রাস্তার গাছ কেটে অবরোধ করে রাখে অবরোধ কারীরা।

এদিকে, সকাল থেকেই খোকশাবাড়ি, বহুলী, চন্ডীদাশগাঁতী, নলকা, বাঐতারা এলাকায় রাস্তা অবরোধ করে রেখেছে অবরোধকারীরা।

তফসিল ঘোষণার পর পর সোমবার রাত আটটার দিকে সিরাজগঞ্জ-কাজিপুর আঞ্চলিক সড়কের  সদর উপজেলার খোকশাবাড়ী বাজার এলাকায় জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা কয়েকটি মোটরসাইকেল ও দোকানপাট ভাঙচুর করে। কিছুক্ষণ পরই শহরের রেলগেট, মৌসুসী সিনেমা হল মোড়, কালেক্টরেট চত্বরসহ কয়েকটি স্থানে ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। সাড়ে আটটার দিকে শহরের নবদ্বীপ পুল এলাকায় কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণের পর পুলিশ সেখানে পৌঁছালে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশ টিয়ারসেল  ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

এ ছাড়াও সিরাজগঞ্জ-নলকা আঞ্চলিক সড়কের দিয়ারবৈদ্যনাথ এলাকায় ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নিতে আসা বেশ কয়েকটি সিএনজিচালিত অটোরিকসা ভাঙচুর ও যাত্রীদের মারপিটের ঘটনা ঘটে। শহরের রেলগেট ও নিউ ঢাকা রোডেও একটি ট্রাক ও কয়েকটি সিএনজিচালিত অটোরিকসা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

সিরাজগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোক্তার হোসেন জানান, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। নাশকতা এড়াতে পুলিশ ও র্যা ব মোতায়েন এবং মহাসড়কগুলোতে টহল জোরদার করা হয়েছে।

সাতক্ষীরা: সাতক্ষীরার কলারোয়ায় অবরোধকারীদের হামলায় ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নিহত হয়েছেন। নিহত মাহাবুবুর রহমান বাবু (৩৫) দেয়াড়া ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে অবরোধের সমর্থনে মিছিল করছিল জামায়াত-শিবির। এ সময় বাড়ি থেকে কলারোয়া সদরে যাওয়ার পথে বাবুকে পিটিয়ে মারে অবরোধকারীরা।

সাতক্ষীরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়দেব চৌধুরী ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন।

এ ঘটনায় কলারোয়ায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

বগুড়া: বগুড়ায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে যুবদল নেতা ইউছুফ নিহত হয়েছেন। এসময় গুলিবিদ্ধসহ আরো কমপক্ষে ২০ জন আহত হয়েছেন। এ ঘটনার প্রতিবাদে বুধবার বগুড়ায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে ১৮-দলীয় জোট।

মঙ্গলবার বিকেলে বগুড়া শহরের বনানী মোড়ে সমাবেশ করা নিয়ে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। নিহত ইউছুব (২৬) বগুড়া শহরের ২১ ওয়ার্ড যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং শহরের ঢাকন্তা এলাকার মুকুল হোসেনের ছেলে।

স্থানীয়রা জানান, মঙ্গলবার বিকেলে বনানী মোড়ে যুবদল নেতাকর্মীরা সমাবেশ করার  প্রস্তুতি নেয়। এসময় পুলিশ সমাবেশ করতে নিষেধ করলে   নেতাকর্মীরা মিছিল বের করে। মিছিল থেকে কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হলে পুলিশ মিছিলে ধাওয়া করে।

এসময় পুলিশের সঙ্গে যুবদল নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষ চলাকালে যুবদলকর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ও ককটেল নিক্ষেপ শুরু করে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করতে থাকে। এক পর্যায় পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সেখানে র্যা ব ও বিজিবি সদস্যরা পৌঁছে।

বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যুবদল নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে গুলি করলে ইউছুফ ঘটনাস্থলেই মারা যায় এবং আরো বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়।

নিহত ইউছুফের লাশসহ পুলিশ আরো দুইজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। এরমধ্যে কমরেড নামের একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে তাকে তাৎক্ষনিক ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। আহতদের মধ্যে জেলা যুবদল সভাপতি সিপার আল বখতিয়ারসহ অন্যদের বিভিন্ন ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে।
বরিশাল:  বরিশালের গৌরনদীতে পিকেটারদের হামলায় রফিকুল ইসলাম (২৬) নামের এক কাঁচামাল ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। তিনি পিকআপে করে বরিশাল নগরীতে আসার সময় পিকেটারদের ছোড়া ইটের আঘাতে গুরুতর জখম হন। তাকে শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসার পর তার মৃত্যু হয়। পুলিশ এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। নিহতের বাড়ি মেহেরপুর জেলায়।

ঢাকা:  সোমবার রাত আটটার দিকে মধ্যবাড্ডার প্রগতি সরণিতে কয়েকটি হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে সবার মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে যানবাহনসহ সবাই দ্রুত ওই এলাকা ছাড়তে থাকে। এ সময় ঢাকা সিএনজি নামের একটি ফিলিং স্টেশনের সামনে একটি বাস পেছন থেকে একটি রিকশাকে ধাক্কা দেয়। ফলে ঘটনাস্থলেই রিকশা চালকের মৃত্যু হয়।

সারাদেশে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে এবং বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের ঘটনা এখনো চলছে। দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের ভিতর আতঙ্ক-উৎকন্ঠা কাজ করছে। সারাদেশ অচল হয়ে পড়েছে।

প্রসঙ্গত, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক গতকাল  সন্ধায় দশম জাতীয় সংসদের তফসিল ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন আঠারো দলীয় জোট ৪৮ ঘন্টার অবরোধের ডাক দেয়।


সম্পাদনা: শামীম ইবনে মাজহার,নিউজরুম এডিটর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।